রাজধানীর মিরপুর বাঙলা কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগে অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন সুব্রত বৈদ্য শুভ্র। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। পড়াশুনার পাশাপাশি কোচিং সেন্টার ও একটি চার্চে শিশুদের পড়াতেন। এক পর্যায়ে চার্চ গুরুর মেয়ের সঙ্গে প্রেমে পড়েন। আর এই প্রেমে পড়াই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। প্রেমিকার স্বজনরা কৌশলে ডেকে নিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। পরে বিষযটি অপমৃত্যু বলে চালাবার চেস্টা করে। গত বৃহস্পতিবার আদালতে মামলার প্রধান আসামি প্রেমিকার ভাই রিপন দাস হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত জানিয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। আর ঘটনার ষোলমাস পর উদঘাটিত হল মৃত্যুর রহস্য। এদিকে মামলার বাদী নিহত শুভ্রর বড় বোন সুবর্ণা বৈদ্য মামলাটি মনিটরিং সেলে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়েছেন।
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার মশুরিয়া গ্রামের সুমায়েল বৈদ্যের চার মেয়ে এবং একমাত্র ছেলে শুভ্র। সবার ছোট। থাকতেন মাজার রোডের তৃতীয় কলোনির ২৭০/৭ নম্বর বোনের বাসায়। একটি কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতার পাশাপাশি মিরপুর দারুস সালামের ‘ম্যাথডিস্ট চার্চ’ নামে একটি বাইবেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছায় শিশুদের ক্লাস নিতেন। আর ম্যাথডিস্ট চার্চটির চারতলা ভবনের উপর তলায় পরিবার নিয়ে থাকতেন ধর্মীয় গুরু বিশপ নিবারণ দাস। চার্চটিতে যাতায়াতের একপর্যায়ে ঘটনার দুই বছর আগে নিবারণের মেয়ে নিপা দাসের সঙ্গে শুভ্রর প্রেমের সম্পর্ক হয়। কিন্তু তাদের এ সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি নিপার পরিবার। ২০১১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দারুস সালাম থানা পুলিশ ২৫০/১, দারুস সালাম চারতলা ভবন থেকে গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় শুভ্রর লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
নিহত শুভ্রর বোন সুবর্ণা বৈদ্য বলেন, লাশের শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকার পরও থানা পুলিশ অপমৃত্যু মামলা করে। কিন্তু থানা পুলিশকে বার বার বলার পরও তারা বিষয়টি আমলে নেয়নি। এ অবস্থায় ২০১১ সালের ২৬ নভেম্বর আদালতে মামলা করেন। মামলায় আসামি করেন রিপন দাস, তার বোন নিপা দাস, মা লিনদা দাস, বাবা নিবারণ দাস, খালাতো ভাই প্রভুধন বাড়ৈ ও শিমন শিকদার। আদালতের নির্দেশে দারুস সালাম পুলিশ মামলাটি নিয়মিত মামলা হিসেবে এজাহারভুক্ত করেন। পরবর্তীতে মামলার তদন্ত ন্যস্ত হয় মহানগর গোয়েন্দা দফতরে। তদন্ত দেয়া হয় ডিবির সাব-ইন্সপেক্টর শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহর ওপর। ডিবি পুলিশ নিপা দাস ও শিমন শিকদারকে গ্রেফতার করে। পরে তারা নিম্ন আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান। অপর আসামিরা আগাম জামিন নেন উচ্চ আদালত থেকে।
মামলার সুপারভাইজিং কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সহকারী কমিশনার তৌহিদুল ইসলাম জানান, মামলায় প্রথম ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন শিমন শিকদার। কিন্তু তিনি জবানবন্দিতে কোন আসামির নাম উল্লেখ করেননি। তবে তিনি বলেছেন, শুভ্রকে হত্যা করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৩ জানয়ারি রিপন দাস আদালতে হাজির হয়। এ সময় জামিন বাতিল ও রিমান্ডের আবেদন জানানো হয়। আদালত জামিন বাতিল করে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ডিবির জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গত বৃহস্পতিবার রিপন দাস হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
রাজধানীর উত্তরার একটি মন্দিরের ধর্মীয় গুরু রিপন দাস বলেন, ঘটনার দিন চার্চে ছাত্র-ছাত্রী পড়াচ্ছিল শুভ্র। পড়া শেষ হবার তার বোন নিপা তাকে ভবনের চতুর্থ তলায় ডেকে নেয়। সেখানে যাওয়ার পর শুভ্র ড্রাম বাজিয়ে নিপাকে গান শোনাচ্ছিল। এ সময় তিনি সেখানে উপস্থিত। এ সময় তিনি শুভ্রকে চাপ দেন যাতে সে নিপার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। শুভ্র অস্বীকার করলে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে তিনি ও তার আত্মীয় প্রভুধন বাড়ৈ তার (শুভ্র) গলায় ওড়না পেঁচিয়ে দুইদিক থেকে টান দেয়। নিপা এ ঘটনায় বাধা দিলেও আমরা তা কর্ণপাত করিনি। এক পর্যায়ে শুভ্র অজ্ঞান হয়ে পড়ে। প্রথমে তাকে সুস্থ করতে নিজেরাই চেষ্টা করি। কিন্তু জ্ঞান না ফেরায় আমরা ধরে নেই শুভ্র মারা গেছে। এ অবস্থায় ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য শুভ্রর গলায় ওড়না পেঁচিয়ে বড় একটি মইয়ের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখি। এরই মধ্যে খবর পেয়ে আমার বাবা-মা সেখানে উপস্থিত হন। পরে শুভ্রকে মিরপুর হার্ট ফাউন্ডেশনে নেয়া হলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বিক্ষোভ ঃ শুভ্রর লাশের শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকার পরও দারুস সালাম পুলিশ অপমৃত্যু মামলা করে। এ নিয়ে ঐ দারুস সালাম বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তারা ঐদিন রাতে প্রায় দুই শতাধিক নারী-পুরুষ থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন। অপরদিকে হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোকজন অবস্থান ধর্মঘট ও বিক্ষোভ মিছিল করে।
