চৌগাছায় অসহায় মহিলাদের দিন কাটে হিমাগারে আলু বাছাই করে

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫২
ওরা কেউ বিধবা, কেউবা তালাকপ্রাপ্তা আবার কারো স্বামী থেকেও নেই। আর ওদের দিন কাটে যশোরের চৌগাছার ডিভাইন হিমাগারে আলু বাছাই করে। দিন পেরিয়ে সন্ধ্যার পর বেশ কিছুটা রাত হলে ওদের ছুটি হয়। মজুরি পায় কোনদিন ৬০ টাকা, কোনদিন ১০০ টাকা, আবার কোনদিন হয় ১৮০ টাকা। মজুরি যাই হোক প্রতিদিন তারা যে কাজ করতে পারছে এতেই তারা খুশি। সংখ্যায় ওরা ৪৫জন, তবে প্রতিদিন কোন না কোন কারণে ৮/১০জন অনুপস্থিত থাকে। ওদের কারো বয়স ২৫,কারো ৪০,আবার কারো বা ৬০ বছর। কিন্তু বয়স তাদের বন্ধুত্বে কোন বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বন্ধুর মত হাতে হাত মিলিয়ে বছরের পর বছর ধরে ওরা কাজ করে যাচ্ছে একই ছাউনির নিচে। কারো সুখের খবরে ওরা হাসে, আবার কারো দুঃখের খবরে ওরা চোখের লোনা জলে বুক ভাসায়। ওদের সাথে কথা হয় বুধবার ডিভাইন হিমাগারের আলু বাছাইয়ের শেডে। কাগজ-কলম আর ক্যামেরা দেখে প্রথমে ওরা খুব খুশি হয়েছিল এই ভেবে যে, নিশ্চয় কোন সরকারি দপ্তরের লোক এসেছে। আর তাদের অবস্থার কথা লিখলে হয়তো ওদের এই দুর্ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হবে। কিন্তু ওরা যখন শুনল আমি পত্রিকার লোক তখন ওরা বলল, ভাই পত্রিকায় লিখলে কি আমাদের কোন লাভ হবে? ওরা জীবনের অনেক গল্প শোনালো। উপজেলার মসিয়ুরনগর গ্রামের রোকেয়া বেগম জানালো, সে প্রতিদিন ৬ কি.মি. দূর থেকে এখানে আসে কাজ করতে। তার সংসারে ৩ মেয়ে আর ১ ছেলে। তিন বছর পূর্বে যখন তার স্বামী গাছ থেকে পড়ে মারা যায় তখন তার সংসারে নেমে আসে অমাবশ্যার অন্ধকার। তারপর সন্ধান পেয়ে পেটের তাগিদে যোগ দেয় এ কাজে। এখন যা পায় তাই দিয়ে খেয়ে না খেয়ে কোনরকমে দিন চলে যায়। চাঁদপুরের মৃত আয়ুব আলীর বিধবা স্ত্রী ফাতেমা বেগম জানান, তার ভিটেটুকু ছাড়া তার কোন ফসলি জমি নেই। আলু বাছাই করে যা পায় তাই দিয়ে ৩ মেয়ে আর ১ ছেলে নিয়ে ৫ জনের সংসার কোনরকমে চলে যায়। চৌগাছার বানু জানায়, তার বয়স এখন ৫০ বছর। যখন তার কোলে ১ ছেলে আসে তখন তার স্বামী তাকে তালাক দেয়। মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে তার সংসার। আজ ৬ বছর ধরে আলু বাছাই করে কোনরকমে জীবন চালাচ্ছে বানু। চৌগাছার হিন্দুপাড়ার ৬৫ বছরের শেফালি রানির কপালের ঘাম আর মাথার সিঁদুর মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। সে জানাল ২ বছর পূর্বে তার স্বামী বংশী যখন স্ট্রোক করে পঙ্গু হয়ে যায় তখন সংসারের সকল সদস্যের খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। কোন উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত রাহীন সাহেবের কোল্ড স্টোরে আলু বাছাই করার কাজ নিই। দিন শেষে যা পাই তাই দিয়ে চাল-ডাল আর স্বামীর জন্য ওষুধ কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরি। হিমাগারের পাশেই বাড়ি হোসনেআরার। তার সংসারে ১ ছেলে, ১ মেয়ে। স্বামীর আয়ে সংসার চলে না তাই স্বামীকে সাহায্য করতে সে বেছে নিয়েছে আলু বাছাইয়ের কাজ। উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের আম্বিয়া বেগমের বয়স ৫৭ বছর। স্বামী মারা গেছে অনেকদিন আগে। তার স্বামী কোন জায়গা-জমি রেখে যায়নি। ২ ছেলে-মেয়ে রেখে মারা গেছে তার বড় ছেলে। আলু বাছাই করে যে টাকা পান তাই দিয়ে নাতি তাহাজ্জেল আর নার্গিসের মুখে দু’মুঠো খাবার তুলে দেন। চাঁদপুর গ্রামের ৫৩ বছরের হামিদা বেগম ৩ ছেলে-মেয়ের সংসার চালান আলু বাছাই করে। ইছাপুর গ্রামের ৫৪ বছর বয়সের ফাতেমা বেগমের স্বামী মারা গেছে অনেকদিন আগে। ১ মেয়ে আর নিজের খাওয়া-দাওয়া চলে এই টাকায়। মৃত জাকির হোসেনের বিধবা স্ত্রী রাফেজা বেগমের ৩ ছেলে-মেয়ের সংসারের একমাত্র সম্বল আলু বাছাইয়ের টাকা। কয়ারপাড়া গ্রামের মঞ্জুয়ারা, আলেয়া, মাজেদা, মনোয়ারা ও ফাহিমা ওদের কেউ তালাকপ্রাপ্তা আবার কারো বা স্বামী থেকেও নেই। ওরা সবাই বলল ভাই বাপের বাড়ি পড়ে আছি বছরের পর বছর ধরে, শেষ পর্যন্ত কোন উপায় না পেয়ে ডিভাইন হিমাগারে আলু বাছাইয়ের কাজ করে নিজে আর ছেলে-মেয়েরা কোনরকমে খেয়ে-পরে বেঁচে আছি। হিমাগারে আলু বাছাই করেই ওরা খুশি। কৃতজ্ঞ ডিভাইন হিমাগারের মালিক হাসানুজ্জামান রাহীনের কাছে। কারো কাছে হাত না পেতে দিন শেষে শ্রমের মূল্য নিয়ে বাড়ি ফেরার অনন্য গর্বে গর্বিত ওরা।