রূপগঞ্জ থানার নাওরা গ্রামের ইয়াছিন আলী পাঁচ সন্তানকে নিয়ে পৈত্রিক বাড়িতেই বসবাস করছিলেন। দুই ছেলেকে বিয়েও দিয়েছেন। আরেক ছেলে ইদ্রিসকে বিয়ে দেবেন। নতুন ছেলেবৌয়ের থাকার ঘর দরকার। নতুন ঘর তুলতে গিয়েই বিপাকে পড়লেন ইয়াছিন আলী। রাজউক থেকে বলা হলো ওই জমিতে ঘর তোলা যাবে না। কোনো নকশারও অনুমোদন দেয়া যাবে না। কারণ ড্যাপে ওই জায়গাকে ফ্লাড ফ্লো জোন (বন্যাপ্রবাহ এলাকা) হিসেবে দেখানো হয়েছে।
ইয়াছিন আলী জানান, পৈত্রিকভিটার সাথে লাগোয়া ওই জমিতে সারা বছর কৃষি কাজ চলে। খুব বর্ষা হলে কখনো কখনো পানি জমে। ওই জায়গাকে কিভাবে জলাশয় হিসেবে দেখানো হলো, সেটা তার মাথায় ঢোকে না। নিজের জমিতে বাড়ি করতে গেলে রাজউকের সমস্যা কোথায়। এ নিয়ে রাজউকে অনেক দেনদরবার করেও বাড়ি তৈরির অনুমতি পাননি ইয়াছিন আলী।
কেবল ইয়াছিন আলীই নন, এই সমস্যায় এখন হিমশিম খাচ্ছেন ১৫৯০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের রাজধানীর সব এলাকার বাসিন্দারা। ঢাকার পূর্বে শীতলক্ষ্যা ও মেঘনা, পশ্চিমে সাভারের বংশী নদী, দক্ষিণ-পশ্চিমে ধলেশ্বরী ও উত্তরে গাজীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ড্যাপ এলাকার মানুষ এখন একই সমস্যায় জর্জরিত। ত্রুটিপূর্ণ ড্যাপে জমির প্রকৃতি আমূল পাল্টে ফেলায় সৃষ্টি হয়েছে নানা সমস্যা। ড্যাপ আওতাধীন এলাকায় বংশপরম্পরায় বসবাসরত জনগণ নিজেদের ইচ্ছামতো নিজের জমিতে চাষাবাদ বা বাড়ি-ঘর তৈরি করে দীর্ঘদিন যাবত্ বসবাস করে আসছেন। কখনো জমি ব্যবহারের ব্যাপারে সরকারি বিধি-নিষেধের সম্মুখীন হননি। অথচ ড্যাপের কারণে পড়েছেন নানা সমস্যায়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাছে গিয়েও তারা সমাধান পাচ্ছেন না। ইতিমধ্যে রূপগঞ্জ থানার নাওরা, সনি, গজারিয়া, বাঘবের, মশুরী মৌজা, সাভার থানার বড় কাকর, বিরুলিয়া, সারুলিয়া, উত্তর উলুমোরা, দ্বিগুন, উত্তর কাউন্দিয়া, ছোট ওয়ালিয়া মৌজা, কেরানীগঞ্জের নাইয়াটোলা, আইন্তা, বেয়ারা, দোলেশ্বর, হাজারীবাগ, আড়াকুলসহ বিভিন্ন এলাকার ভুক্তভোগীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে ড্যাপের ত্রুটিগুলো সংশোধন করে জমি ব্যবহারের অনুমতি প্রার্থনা করেছেন। কিন্তু কাজ হয়নি।
তাদের অভিযোগ, পরিবার বড় হলে ঘর তৈরি করতে হয়। সে ক্ষেত্রে নাল বা নিচু জমিকে সামান্য উঁচু করতে হয়। অথচ ড্যাপে জমির প্রকৃত অবস্থা বিবেচনা না করে একতরফাভাবে সকল জমিকে ফ্লাড ফ্লো জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এমনকি যেসব জমিতে আজ থেকে ১০ বছর আগে ঘর-বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলোকেও ফ্লাড ফ্লো জোন হিসেবে দেখানো হয়েছে। আবার সাব ফ্লাড ফ্লো জোন ও ফ্লাড ফ্লো জোনকে ড্যাপে এক করে ফেলা হয়েছে।
খিলক্ষেতের বরুয়া, তলনা, ঢেলনা, সানঘাটা মৌজার বাসিন্দারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেয়া অভিযোগে বলেছেন, জমির মালিকরা তাদের জমিতে ঘর-বাড়ি তুলতে না পেরে বা বিক্রি করতে না পেরে ভেতরে ভেতরে ক্ষোভে ফুসছে। ফলে যেকোনো মুহূর্তে তাদের চাপা ক্ষোভ জনবিস্ফোরণে রূপ নিতে পারে।
বাড্ডা থানার ডুমনী, বড়বেরাইদ, পাতিরা, সাতারকুল ও ভাটারা এলাকার ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেয়া লিখিত আবেদনে উল্লেখ করেছেন, তারা নিজের জমিতে বাড়ি করতে পারছে না। ভিটি জমিকেও ড্যাপে ফ্লাড ফ্লো জোন হিসেবে দেখানো হয়েছে। অবিলম্বে ড্যাপ সংশোধন করে প্রকৃত ফ্লাড ফ্লো জোন ও সাব ফ্লাড ফ্লো জোন আলাদা করা হোক। আর মানুষ যাতে ঘরবাড়ি নির্মাণ করতে পারে সে ব্যাপারে ড্যাপ সংশোধন করা হোক।
ড্যাপ নিয়ে সবচেয়ে জোরালো যে অভিযোগ তা হলো, ড্যাপ পরিকল্পনায় বসতভিটা বা ফসলি জমিকে বন্যাপ্রবাহ এলাকা (ফ্লাড ফ্লো জোন) এবং বসতভিটাকে ওয়াটার পন্ড বা জলাশয় বানিয়ে দেয়া হয়েছে। কেবল স্থপতি, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এবং পরিবেশবাদীদের অন্তর্ভুক্তিতে গঠিত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ড্যাপ প্রণীত হয়েছে। ওই কমিটিতে হাইড্রোগ্রাফিক ইঞ্জিনিয়ার, ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনার, জিওলজিস্ট, পানি বিশেষজ্ঞ, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং জনপ্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সকল সেক্টরের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় অসম্পূর্ণ কমিটি অসংখ্য ত্রুটিতে ভরা নামসর্বস্ব ড্যাপ প্রণয়ন করেছে। আর সেই ত্রুটির খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে। অথচ ২০৫০ সালের পরিবেশগত অবস্থানকে বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সকল খাতের ব্যক্তি তথা স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণে যুক্তিযুক্ত ও সর্বজনগ্রাহ্য ড্যাপ প্রণয়ন করলে আজ এ অবস্থার সৃষ্টি হতো না।
সবজি ক্ষেত হয়ে যাচ্ছে ফ্লাড ফ্লো জোন: ড্যাপের নকশা থেকে দেখা গেছে, গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে রূপগঞ্জ পর্যন্ত বিশাল এলাকাকে ফ্লাড ফ্লো জোন হিসেবে দেখানো হয়েছে। বলা হয়েছে, উত্তর থেকে নেমে আসা পানি এই পথ দিয়ে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু কালীগঞ্জে এসে এই পানি বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। সেখানে পূর্বাচল প্রকল্প হওয়ায় পানি বের হওয়ার কোনো পথ নেই। অথচ এই পানি বের করতে হলে এখানে আন্ডারপাসের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে পানি রূপগঞ্জের ওপর দিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে গিয়ে পড়তে পারবে।
আবার একইভাবে রূপগঞ্জ, গাজীপুরের কালীগঞ্জ ও জয়দেবপুরের বিস্তীর্ণ এলাকাকে ফ্লাড ফ্লো জোন হিসেবে দেখানো হয়েছে। অথচ এসব জমি বছরের আট মাস থাকে পানির ওপরে। সেখানে বছরে দুটি ফসলও হয়। এসব জমি বড় জোর সাব ফ্লাড ফ্লো জোন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু ড্যাপ রিভিউ কমিটি বাস্তবতাকে বাদ দিয়ে একতরফাভাবে দেদারসে সকল জমিকে ফ্লাড ফ্লো জোন বানিয়ে ফেলেছে। একইভাবে কালিয়াকৈর থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাকে ফ্লাড ফ্লো জোন বানিয়ে দিয়েছে। এসব জায়গায় কেউ বৈধভাবে কোনো উন্নয়ন কাজ করতে পারছেন না। এ জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার অনুমোদন পাচ্ছে না।
অন্যদিকে কিছু সাব ফ্লাড ফ্লো জোনকে ড্যাপে রিটেইনার পন্ড হিসেবে দেখানো হয়েছে। উত্তরার পূর্বে বেরাইদ, ডুমনি, পাতিরা, বনশ্রীর পূর্বে ত্রিমোহনী এলাকাসহ বেশ কিছু এলাকার বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ না করে ওইসব জায়গাকে জলাশয় হিসেবে দেখানো হয়েছে। অনেক উঁচু এলাকাকেও জলাশয় হিসেবে দেখানোর ফলে ওইসব এলাকায় কোনো উন্নয়ন কাজ করা যাচ্ছে না।
আবার মিরপুরের আশুলিয়ায় রিটেইনার পন্ড বা ফ্লাড ফ্লো জোন হিসেবে যে জায়গাকে ড্যাপে দেখানো হয়েছে, ওইসব জায়গায় রয়েছে সবজি ক্ষেত। নিচু জলাশয়ে সবজি হওয়ার কথা না। এসব জমিতে মালিকরা ইচ্ছামতো কোনো উন্নয়ন কাজ করতে না পারায় ক্ষোভ দানা বাঁধছে।
অভিযোগ আছে, যেসব এলাকায় ছয়-সাততলা ভবন তৈরি হয়েছে, সেসবের ওপর দিয়ে রাস্তা দেখিয়ে দেয়া হয়েছে। দেখা গেছে ৬০ ফুট রাস্তাকে ড্যাপে ৮০ ফুট হিসেবে দেখানো হয়েছে। আবার হাইড্রলজিক্যাল সার্ভে না করায় উপযুক্ত নিচু জায়গাও শনাক্ত করা হয়নি। ফলে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, কবরস্থান, কারখানা ইত্যাদি এলাকাকে জলাশয় হিসেবে দেখানো হয়েছে। দেখা গেছে, চারপাশে রাজউক অনুমোদিত বহুতল ভবনের মাঝখানে হঠাত্ করে একটি প্লটকে জলাশয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ নিয়ে রাজউকে অনেক অভিযোগও জমা পড়েছে।
