আত্মশুদ্ধি ও পাপ মোচনের পাশা-পাশি দুনিয়া, আখেরাতের শান্তি লাভের আশায় মহান আল্লাহ্র দরবারে দুই হাত তুলে অশ্রুসিক্ত নয়নে ক্ষমা প্রার্থনার মধ্যদিয়ে শেষ হলো ৪৭তম বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব। লাখ লাখ মুসল্লির অংশগ্রহণে বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ এ মোনাজাতে দেশের কল্যাণ কামনার পাশাপাশি বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনা করা হয়। এ সময় টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে লাখ লাখ কণ্ঠে আমিন আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠে। অনেকেই এ সময় চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
এবারও তাবলীগ জামাতের মারকাজের শুরার সদস্য দিল্লীর হযরত মাওলানা জোবায়েরুল হাসান আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন। মোনাজাতে আত্মশুদ্ধি ও নিজ নিজ গুনাহ মাফের জন্য মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে রহমত প্রার্থনা করা হয়। এ সময় ইজতেমা ময়দান এলাকায় সমবেত বিশাল জনসমুদ্রে এক অভূতপর্ব ভাবাবেগের সৃষ্টি হয়। সর্বত্র এক পুণ্যময় পরিবেশ বিরাজ করতে থাকে। বেলা ১২টা ৪৬ মিনিট থেকে শুরু হয়ে ১টা ৬ মিনিট পর্যন্ত এ মোনাজাত চলে।
ইজতেমার ২য় পর্বের আখেরি মোনাজাতে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, মহাসচিব এবিএম রুহুল আমীন হাওলাদার এমপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবর্গ ও বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের কুটনৈতিকবৃন্দ শরিক হন। এ ছাড়া পদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাসহ দলমত-শ্রেণী-পেশা নির্বিশেষে সর্বস্তরের ধর্মপ্রাণ মুসলমান আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন। আখেরি মোনাজাতের পূর্বে তাবলিগ জামাতের শীর্ষ মুরুব্বিরা হেদায়ী ও সংক্ষিপ্ত বয়ানে প্রত্যেক মুসলমানকে দিনের বেলায় মেহনত রাতের বেলায় ইবাদত-বন্দেগী করার আহ্বান জানান।
আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে গতকাল ভোর থেকে উত্তরা বিমানবন্দর, আব্দুল্লাপুর, টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়কে আশুলিয়া-সাভার সড়কে ও ঢাকা-ময়মসসিংহ সড়ক পথে ধনী, দরিদ্র, যুবক, বৃদ্ধ নির্বিশেষে মানুষের ঢল নামে। ইজতেমাস্থলে স্থান সংকুলান না হওয়ায় অগণিত মানুষ ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়ক, আশুলিয়া-সাভার সড়ক এবং উত্তরা মডেল টাউনসহ আশেপাশের এলাকা, বেড়িবাঁধ, বিভিন্ন যানবাহনে উঠে এবং নৌকায় বসে মোনাজাতে শরিক হন। অনেকেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মোনাজাত ধরেন। ইজতেমা ময়দানের বাইরে পর্যাপ্ত মাইক না থাকায় বহু ধর্মপ্রাণ মুসলমান সময়মতো আখেরি মোনাজাতে শামিল হতে গিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েন। শনিবার রাতে ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে ও টঙ্গি-আশুলিয়া সড়কে যানবাহন চলাচলে বিধি নিষেধ থাকায় ওই সড়কে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষ ও মুসুল্লীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। গতকাল রবিবার ফজরের পর বাংলাদেশের মাওলানা রবিউল হক বয়ান করেন। আখেরি মোনাজাতের পূর্বে ভারতের মাওলানা মোহাম্মদ শা’দ উর্দু ও আরবীতে হেদায়েতি ও দিক নির্দেশনামূলক বয়ান করেন।
দ্বিতীয় পর্বে ১৫ হাজার বিদেশি মেহমান : ৪৭তম বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের তাবলীগ জামায়াতের প্রায় ১৫ হাজার বিদেশি মেহমান ইজতেমায় অংশগ্রহণ করেন।
ইজতেমায় যেসব দেশ অংশ নেয় : দুই পর্বের বিশ্ব ইজতেমায় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব-আমিরাত, কাতার, অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনাই, কানাডা, মিসর, ওমান, কম্বোডিয়া, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, ইরান, জাপান, মাদাগাস্কার, মালি, মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া, পানামা, সেনাগাল, দঃ আফ্রিকা, তানজানিয়া, ত্রিনিদাদ, রাশিয়া, আমেরিকা, জিম্বাবুয়ে, বেলজিয়াম, চীন, কমোরেস, ফিজি, ফ্রান্স, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, কেনিয়া, মালয়শিয়া, মায়ানমার, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, সুইডেন, থাইল্যান্ড, তার্কি, যুক্তরাজ্য, জাম্বিয়া, কোরিয়া, আলজিরিয়া, কাতার, সোমালিয়া, সিরিয়া, তিউনিসিয়া, ইয়েমেন, পাকিস্তান, বাহরাইন, ইরিত্রিয়া, জর্দান, মৌরিতানিয়া, ভারত, সুদান, দুবাই, ডিজিবুতি, ইথিওপিয়া, ইরাক, ফিলিস্তিন, কুয়েত, মরক্কোসহ বিভিন্ন দেশের মুসল্লিরা অংশ নেয়।
আরো এক মুসুল্লীর মৃত্যু : গতকাল রবিবার সকালে টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে আসা আরো একজন মুসুল্লী ইন্তেকাল করেছেন। তার নাম হোসন আলী (৭০)। গতকাল সাতটার দিকে তিনি ইজতমা ময়দানে হঠাত্ অসুস্থ হয়ে পড়েন। টঙ্গী হাসপাতালে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহতের বাড়ি ময়মনসিংহের কোতয়ালী থানার উজান ঘাগড়া গ্রামে। এ নিয়ে দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমায় মোট মৃতের সংখ্যা ১১ জন। গত প্রথম পর্বের ইজতেমায় ১৩ জন মুসুল্লী ইন্তেকাল করেছিলেন।
১৮৬ জন মুসুল্লী টঙ্গী হাসপাতালে ভর্তি : দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমায় অসুস্থ হয়ে পড়ায় মোট ১৮৬ জন মুসল্লিকে টঙ্গী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডাঃ সৈয়দ হাবিবুল্লাহ গতকাল রবিবার ইত্তেফাককে জানান, সকাল ৮টা পর্যন্ত ইজতেমায় আগত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত মোট ৩১ হাজার ২৫৫ জন রোগী টঙ্গী হাসপাতালসহ স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন চিকিত্সা ক্যাম্পে এসেছেন। এদের মধ্যে ১৮৬ জনকে রোগী টঙ্গী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া ১২০ জন রোগীকে উন্নত চিকিত্সার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়েছে।
আরো ১১ পকেটমার আটক : ইজতেমা মাঠ ও আশপাশের এলাকা থেকে আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা চুরি, ছিনতাই, পকেটমারসহ বিভিন্ন অপরাধে গতকাল রবিবার বিকাল পর্যন্ত আরো ১১ জনকে আটক করেছে। এ ছাড়া গত শনিবার ইজতেমায় আগত মুসুল্লীদের অপচিকিত্সা প্রদানের অভিযোগে ৩০ জন ভুয়া চিকিত্সককে আটক করে র্যাব সদস্যরা।
ট্রাক চাপায় মুসুল্লী নিহত : ইজতেমার আখেরী মোনাজাত শেষে বাড়ি ফেরার পথে টঙ্গীর বাস্তুহারা এলাকায় ট্রাক চাপায় এক মুসুল্লী নিহত হয়েছেন। তার নাম আ. মান্নাফ ওরফে মজিবর (৪৫)। বাড়ি নেত্রকোনা জেলার কালিয়াজুড়ি থানার ইছাপুরা গ্রামে। আখেরি মোনাজাত শেষ হওয়ার পরপরই বিভিন্ন স্থান থেকে আশা মানুষজন নিজ গন্তব্যে পৌঁছার চেষ্টা করে। আগে যাওয়ার জন্য মুসুল্লীরা তাড়াহুড়া করতে শুরু করেন। এতে টঙ্গীর আশপাশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ জনজট ও যানজট। আর পায়ে হাঁটা মুসুল্লীদের চাপে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মুসুল্লীদের যানবাহনগুলো এলোপাতাড়ি রবিবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত থেমে থাকে ইজতেমা মাঠের আশেপাশে এলাকায়। যানবাহনের স্বল্পতার কারণে বহু মুসুল্লীকে বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ও রেলস্টেশনে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।
