ইত্তেফাকে মত বিনিময় সভা

কম দামে বই দিতে কাগজ আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার দাবি লেখক-প্রকাশকদের

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:১৫
পাঠকের কাছে কম দামে সৃজনশীল বই পৌঁছে দিতে সরকারের কাছে কাগজ আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন প্রকাশকরা। সে সঙ্গে দেশের প্রকাশনাকে মানসম্পন্ন করে তুলতে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে বাংলা একাডেমীর সঙ্গে যুক্ত করবারও প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে সর্বাঙ্গীন সুন্দর করে তুলতে বছরব্যাপী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলা একাডেমীর একটি সেল গঠনেরও সুপারিশ করা হয়েছে। গতকাল রবিবার কাওরান বাজারে দৈনিক ইত্তেফাক কার্যালয়ে আয়োজিত ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৩: প্রকাশক-লেখক ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রকাশক-লেখকরা এসব প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। সভায় মানসম্পন্ন বই প্রকাশ ও বইয়ের সম্পাদনাকে সুচারুভাবে সম্পন্ন করার আহ্বান জানানো হয়। এবারের বইমেলা উপলক্ষে দৈনিক ইত্তেফাকে বিশেষ ছাড়ে বইয়ের বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হবে বলে সভায় জানানো হয়। মতবিনিময় সভায় বলা হয়, রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনগুলোর সীমাহীন চাপের মুখেও দেশের সৃজনশীল প্রকাশনাকে উত্সাহিত করতে এবং তা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে এবারের বইমেলা কঠোর নিয়মের আওতায় আনা হয়েছে। এবারের বইমেলা হবে শুধুই প্রকাশকদের বইমেলা। কোন ধরনের সংগঠন সেসঙ্গে আমদানি করা বিদেশি লেখকদের বই মেলায় বিক্রি হবে না। পাশাপাশি বইমেলাকে পাইরেটেড, নেট বইয়ের আওতামুক্ত রাখতে প্রকাশক ও বাংলা একাডেমী আলাদাভাবে মেলায় অভিযান পরিচালনা করবে। এছাড়াও পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া গ্রন্থমেলায় স্টল বরাদ্দ দেয়া হবে না কোন বেসরকারি সংস্থা, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে। পাশাপাশি মেলা শুধু বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণেই অনুষ্ঠিত হবে। রাস্তায় থাকছে না কোন স্টল। দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী পরিচালক ও পাক্ষিক অনন্যা সম্পাদক তাসমিমা হোসেনের সভাপতিত্বে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। আলোচনায় অংশ নেন কবি অসীম সাহা, জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশনা সমিতির সভাপতি ও আগামী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ওসমান গনি, সমিতির নির্বাহী পরিচালক ও সময় প্রকাশনীর প্রকাশক ফরিদ আহমেদ, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের কনসাল্টিং এডিটর বদিউদ্দিন নাজির, অবসর প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী আলমগীর রহমান, অনন্যার প্রকাশক মনিরুল হক, অন্যপ্রকাশের অন্যতম স্বত্বাধিকারী মাজহারুল ইসলাম, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি আলমগীর সিকদার লোটন, পার্ল পাবলিকেশন্সের হাসান জায়েদী, শ্রাবণ প্রকাশনীর রবীন আহসান, তাম্রলিপির একেএম তারিকুল ইসলাম রনি, শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদুর রশিদ টুটুল, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশের জহিরুল আবেদীন জুয়েল, অন্বেষার প্রকাশক শাহাদত্ হোসেন, পলল প্রকাশনীর খান মাহমুদ, কথাপ্রকাশের মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন, সংহতি প্রকাশনীর ফিরোজ আহমেদ, জয়তী প্রকাশনীর মাজেদুল হাসান। লেখকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আন্দালিব রাশদী, মাসুদুজ্জামান, সৈকত হাবীব প্রমুখ। মতবিনিময় সভা সঞ্চালনা করেন দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক মিনার মনসুর। আরো উপস্থিত ছিলেন ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত, সহকারী সম্পাদক ফাইজুস সালেহীন। বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, এবারের বইমেলা আয়োজন আমাদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। প্রকাশকদের সহযোগিতায় আমরা নিশ্চয়ই মেলাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারবো। তিনি বলেন, মেলায় একটি স্টল বরাদ্দ পেতে রাজনৈতিক মহলের চাপ প্রয়োগ করে চলেছে। মন্ত্রী, সংসদ সদস্যরা তো সুপারিশ করছেনই ছাত্র সংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্য সামাল দেয়াও খুবই কঠিন। কিন্তু আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি মেলা থেকে প্রকাশকদের বাইরের কোন প্রতিষ্ঠানকে যাতে স্টল বরাদ্দ না দেয়া হয়। এবার যদি আমরা সুষ্ঠুভাবে মেলা পরিচালনা করতে পারি তবে একটা মানদণ্ড নির্ধারণ করতে পারবো, যা আগামীর জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, এবারের মেলায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছে। প্রকাশকদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির সুপারিশ ছাড়া কাউকেই স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়নি। শামসুজ্জামান খান আরো বলেন, প্রতিবছর বইমেলায় ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকার বই বিক্রি হচ্ছে। এখন প্রকাশকদের মানসম্পন্ন বই প্রকাশের দিকে নজর দিতে হবে। তিনি বলেন, খুব কম প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানই মানের বিষয়ে যত্নশীল। এটা বাংলা সাহিত্যের প্রকাশনাকে পিছিয়ে দিচ্ছে। দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী পরিচালক তাসমিমা হোসেন অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, আশা করছি এবারের বইমেলা পাঠকবান্ধব ও প্রকাশকদের মেলা হবে। যেখানে পাঠকরা বাংলা সাহিত্যের নতুন নতুন চিন্তা ও প্রকাশনার সঙ্গে পরিচিত হবেন। ধীরে হলেও বইমেলা যে একটি নিয়ন্ত্রণের আওতায় আসছে এটা খুবই ভালো লক্ষণ। তিনি বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলা একাডেমী সুন্দরভাবে মেলা আয়োজনের উদ্যোগ নিচ্ছে। মহাপরিচালক তার মিষ্টি ব্যবহার দিয়ে সবদিক সামলাচ্ছেন। তবে বইমেলায় মাইকে গান-বাজনার শব্দমুক্ত রেখে ছিমছাম পরিবেশ সৃষ্টির আহ্বান জানান তিনি। তিনি জানান, এবারের বইমেলার সময়ে পাক্ষিক অনন্যা নারী লেখকদের নিয়ে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করবে। কবি অসীম সাহা বইমেলাকে প্রকাশকদের মেলার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো মেলায় চড়াও হচ্ছে; একে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। এছাড়া প্রকাশনার মান বৃদ্ধি, প্রকাশকদের সমস্যা সমাধানে সংস্কৃতি মন্ত্রীর ঔদাসীন্যের সমালোচনা করেন তিনি। মাসুদুজ্জামান বলেন, বইমেলা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের অধীনে চলে যাচ্ছে। যে আবেগ ও অঙ্গীকার এ মেলা আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তার সঙ্গে এটা মেলে না। বইমেলায় যেন জাতির সেই আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের প্রতিফলন ঘটে তা আয়োজকদের সবসময় মনে রাখা প্রয়োজন। আন্দালিব রাশদী বলেন, বইমেলার আয়োজন বাংলা একাডেমীর কাজ না হলেও দীর্ঘদিন ধরে এটি পরিচালনা করায় এখন এটা বাংলা একাডেমীর দায়িত্ব। তাই তা এড়িয়ে যাবার কোন উপায় নেই। সে কারণে মানসম্পন্ন প্রকাশকদের স্থান দেয়া ও দেশের পাঠকদের নির্বিঘ্নে বই কেনার ব্যবস্থা করে দেয়ার দায়িত্ব তাদেরই। ওসমান গনি স্টল বরাদ্দে এবং ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৪ ইউনিটের স্টল বরাদ্দ না দেয়ার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, নতুন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ১টির বদলে ২টি, কারোর ক্ষেত্রে ২টির বদলে ৩টি স্টল বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। অথচ যারা তিন বা চার দশক ধরে মানসম্পন্ন বই প্রকাশ করে আসছে তাদের ৪ ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে না। তিনি বাংলা একাডেমীকে এ প্রস্তাবনা বিবেচনা করার আহ্বান জানান। ফরিদ আহমেদ বলেন, এবারের বইমেলায় আমদানি করা বিদেশি লেখকের বই বিক্রি নিষিদ্ধ। তবে ক্লাসিক সাহিত্য বিক্রিতে বাধা নেই। আলমগীর সিকদার লোটন বলেন, এবারের বইমেলা পাইরেটেড ও নেট বইয়ের আওতামুক্ত থাকবে। যারা এসব বই স্টলে তুলবেন তাদের স্টল বরাদ্দ বাতিলসহ কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে। আলমগীর রহমান বলেন, বইমেলা এলেই সবাই প্রকাশকদের দোষ দেয়। কিন্তু মেলায় প্রকাশকদের স্টল বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে কেউ কথা বলেন না। একজন প্রকাশক বইমেলাকে কেন্দ করে বই প্রকাশ করেন। মেলাকে পাঠকবান্ধব করতে হলে মানসম্পন্ন প্রকাশককে উপযুক্তভাবে বই প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে দেবার প্রতিও কর্তৃপক্ষের নজর দেয়া প্রয়োজন। বদিউদ্দিন নাজির বলেন, যে স্বপ্ন নিয়ে বইমেলা শুরু হয়েছিল সে বইমেলা আজো প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। শুরুর দিকে প্রকাশকদের যে সমস্যা ছিল সে সমস্যাও আজ পর্যন্ত কাটেনি। তিনি একটি আধুনিক বইমেলা করার পাশাপাশি আধুনিক গ্রন্থনীতি প্রণয়ন ও বই বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। মনিরুল হক প্রসার বাড়াতে দৈনিক পত্রিকাগুলোকে সারাবছর বিশেষ ছাড়ে বইয়ের বিজ্ঞাপন প্রকাশের আহ্বান জানান। মাজহারুল ইসলাম বলেন, বইমেলাকে সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে হলে বাংলা একাডেমীর বছরব্যাপী কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তখন বইমেলা শুরুর আগে মতবিনিময় সভা করে প্রস্তাবনা না দিয়ে আগে থেকেই এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে মেলাকে সুন্দর করার পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে। রবীন আহসান বলেন, বইমেলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চ সরিয়ে দিয়ে সেখানে বইয়ের স্টল করা হোক। আর আলোচনা ও অনুষ্ঠান অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হোক। ফিরোজ আহমেদ বলেন, সৃজনশীল বইয়ের বাজার বিস্তারে নীতিমালা প্রয়োজন। বইমেলার বাইরে বই বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রাসঙ্গিকতাও তুলে ধরেন তিনি। সৈকত হাবীব মানসম্পন্ন লেখকদের তুলে ধরতে প্রকাশকদের প্রতি আহ্বান জানান। আশিস সৈকত বইয়ের প্রসার বাড়াতে দৈনিক ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে বিশেষ ছাড়ে বইয়ের বিজ্ঞাপন প্রকাশের সিদ্ধান্ত জানান।