বছর জুড়ে শাড়িতে

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:১৬
বাঙালি নারীর জন্য শাড়ি মানেই হচ্ছে এক সৌন্দর্যের ব্যাকরণ। বাঙালি নারী আর শাড়ি যেন একই মুদ্রার এ-পিঠ আর ও-পিঠ। তাই যুগ পরিবর্তনের হাওয়াতে সবকিছু বদলে গেলেও বাঙালি নারীদের সৌন্দর্য প্রকাশের জায়গায় এখনও চিরায়ত বাংলার শাড়ি দখল করে আছে অদ্বিতীয় মাত্রায়। বরং বিয়ে, কর্পোরেট, পার্টি, জন্মদিন, পিকনিক, ঈদ, পূজা, পহেলা বৈশাখ, অফিস এবং ঘরেও বাঙালি নারী এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শাড়ির উপর নির্ভরশীল। বিয়েতে বেনারসি; অফিস ও পার্টিতে সিল্ক, জর্জেট, শিফন, কাতান, মসলিন এবং ঘরে যেকোনো সুতির শাড়ি নারীর প্রথম পছন্দ। আমাদের এবারের আয়োজনে বছরজুড়ে নারীর এই শাড়ির প্রতি ভালোবাসা ও শাড়িতে ভিন্ন মাত্রায় নিজেকে উপস্থাপন করার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা থাকছে, লিখেছেন মোর্শেদ নাসের পোশাকের ক্ষেত্রে মেয়েরা বর্তমানে অনেক বেশি সালোয়ার-কামিজ কিংবা পশ্চিমা ধাঁচের পোশাকের সাথে সম্পৃক্ত হলেও নিজেকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে শাড়ির বৈচিত্র্যকেও প্রাধান্য দিচ্ছে। নারীর জীবনে নানা ধরনকে কেন্দ্র করে শাড়িতে এসেছে নানা বৈচিত্র্য। ঘরে পরার শাড়ি জন্মদিনের পার্টি বা অন্যকোনো অনুষ্ঠানে পরার উপযোগী নয় বলে এখন বুটিক হাউসগুলো বা ডিজাইনার সেকশন তৈরি করছে এমন শাড়ি যা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে। তাই পহেলা বৈশাখে কিংবা ফাল্গুনের প্রথমদিনে শাড়ি আসে এক রূপে, আবার ঈদে বা পূজায় তা দেখা যায় অন্যরূপে। উত্সবের সঙ্গে বদলে যায় শাড়ির নামও। নানা রঙের সেই শাড়ির কাপড়ের ধরন এবং তার ডিজাইনারের উপর নির্ভর করে কোথাও কোথাও নাম হয়েছে সিল্ক, শিফন, প্রিন্টেড শিফন, জর্জেট, গ্রেগ জর্জেট, নাইলন জর্জেট, ঢাকাই জামদানি, সিল্ক, টাঙ্গাইল সিল্ক, রাজশাহী সিল্ক, সাউথ ইন্ডিয়ান সিল্ক, কাশ্মিরি সিল্ক, কাতান, ব্যাঙ্গালুর শাড়ি, বেনারসি, টিস্যু বেনারসি, চোশা শাড়ি, ব্লক প্রিন্টেড শাড়ি, এমব্রয়ডারি শাড়ি, কোটারি শাড়ি, মনিপুরী শাড়ি, গরদের শাড়ি ইত্যাদি নানা নাম। এখন যে বিষয়টি নারীদের সবচেয়ে পছন্দের বিষয় সেটি হচ্ছে ডিজাইনার শাড়ি। ঠাকুরবাড়ির ঐতিহ্য মনে রাখতে হবে বাঙালি নারীর কাছে শাড়ির আজকের যে জনপ্রিয়তা তার পেছনে কিন্তু জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির অন্দর মহলের অনেক বেশি ভূমিকা রয়েছে। শুধু শাড়ির ক্ষেত্রে নয়, ফ্যাশন, পড়াশোনা, নারীমুক্তি সবকিছুতেই এ বাড়ি যেন এক প্রকার ছায়া রেখে গেছে। যার ছায়া আধুনিক বাঙালি সমাজ আজও ধারণ করে। তাই বাঙালি ফ্যাশনের জন্মস্থান জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ি—এ কথা বললে খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে না। বরং সেই সময় তাদের ফ্যাশন পোশাকআশাক বা গয়নাতে সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়, বরং এ বাড়ির মেয়েরা ফ্যাশনের সঙ্গে পড়াশোনা, সাহিত্য, সংস্কৃতি চর্চারও সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। তাই বাঙালি মেয়েরা আজ যখন কোনো উত্সব আয়োজনে নিজের সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটাতে চায়, চায় আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটাতে তখন ঠাকুরবাড়ির নারীদের সাজেই তাদের শাড়ি পরতে দেখা যায়। তাই ঠাকুরবাড়ির নারীদের সাজের আদলে বর্তমান বাঙালি নারীদের সাজসজ্জাকে সব সময়ই প্রাধান্য দেওয়া হয়। অবশ্য লক্ষণীয় বিষয় হলো ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা একপ্যাঁচে শাড়ি পরতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য ছিলেন। কিন্তু শাড়ির ভাঁজগুলো তারা বেশ পরিপাটি করে কাঁধের কাছে আটকে দিতেন। আবার শাড়ির সঙ্গে অন্যান্য অনুষঙ্গ ব্যবহারেও তারা খুব মনোযোগী ছিলেন। তাই শাড়ি লেহাঙ্গার আদলে ঘুরিয়ে সামনে বা পেছনে আঁচল নিয়ে একটি মাথা কোমরে গুঁজে দিতেন। আর এতে শাড়ি সব সময়ই হয়ে উঠত অনেক আধুনিক, কারণ তখন পোশাকটি হয়ে উঠত শাড়ি লেহাঙ্গার একটি মিলিত রূপের প্রতিফলন। চুলে উঁচু করে খোঁপা বোনা কিংবা চুল ছেড়ে দেওয়াও একধরনের স্টাইল দাঁড়াত ঠাকুরবাড়ির নারীদের শাড়ি পরার ঢঙের সঙ্গে। ঠাকুরবাড়ির সেই শাড়ির সাজ আজ আধুনিকার শাড়ির সাজেও রূপান্তরিত হয়েছে। তাই বছরজুড়ে এখন নিজের ঐতিহ্য প্রকাশে শাড়ি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপে নারীর কাছে এসে জায়গা দখল করেছে। কখনও পহেলা ফাল্গুনে কখনও একুশে কিংবা বৈশাখে, ঈদ উত্সবে, পূজার আনন্দে, বিজয় দিবসে, বিয়ের আয়োজনে, গ্রাম্য সাজে, কিংবা গ্রাম বধূ ও শহুরে আধুনিকার রূপে ভিন্ন মাত্রা আনতে শাড়ি হয়ে উঠেছে নারীর জন্য এক অন্যতম বড় মাধ্যম। আর এসব অনুষ্ঠানে শাড়ি পরার ঢঙে যেমন একেক ক্ষেত্রে একেক ধরনের বৈচিত্র্য এসেছে, তেমনি শাড়ির রঙে, ধরনে, টেকচার কিংবা ডিজাইনেও বহুমাত্রিকতা এসেছে। যেমনটি দেখা যায় বসন্ত কিংবা পহেলা ফাল্গুনে। খুব উজ্জ্বল হলুদ রং, তার সঙ্গে কমলার বিন্যাস কিংবা লালের প্রাধান্য—এগুলো যেন বসন্তকে অনেকবেশি প্রাণবন্ত করে তুলে। আবার সবুজের নানা শেড কিংবা সবুজের নানা বিন্যাস বসন্ত কিংবা পহেলা ফাল্গুনের শাড়িতে প্রাধান্য পায় অনেক বেশি। অন্যদিকে ঠিক কাছাকাছি সময় ভালোবাসা দিবসের শাড়িতেও সেই প্রাধান্যই দেখা যায়। ভালোবাসা দিবসের শাড়িতে লাল রঙের প্রাধান্য এখন বেশি নজরে আসে। কারণ লাল রংকে মনে করা হয় ভালোবাসার রং। অন্যদিকে একুশের শাড়িতে প্রাধান্য পাচ্ছে সাদা আর কালোর বিন্যাস। সাদাকালোর সঙ্গে বাংলা অক্ষরের ডিজাইন কিংবা শহীদ মিনার, সেই সময়ের আত্মত্যাগের কথা সহজে তুলে আনে শাড়িতে। একুশ বা পুরো ফেব্রুয়ারিজুড়ে এধরনের শাড়ি পরার চল কিংবা অনুষ্ঠানগুলোতে সেই শাড়ির প্রতিনিধিত্ব করা নারীদের কাছে এক স্বেচ্ছা উপস্থাপন। পরবর্তীতে সেই বৈশাখ বা এপ্রিল এলেই নারীরা লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরতে অনেক বেশি অভ্যস্ততা তৈরি করে নিয়েছে। কখনও কখনও এ ক্ষেত্রে গাঢ় রঙের শাড়ির জমিন আর তার সঙ্গে গাঢ় লাল রঙের পাড় অনেক বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। বৈশাখ মানেই লাল। বাঙালি ঐতিহ্যের সঙ্গে এটি যেমন দীর্ঘদিন ধরে লালিত হয়ে আসছে, তেমনি বৈশাখের শাড়ি মানেই লালের প্রাধান্য। তবে এই সময়ের শাড়ির রঙে কোথাও কোথাও হলুদের বিন্যাস আবার সবুজের ছোপ ছোপ ভাব গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে ঈদ উত্সবে বিভিন্ন রঙের শাড়ি প্রাধান্য পায়। আসলে যে যার পছন্দের রং বিবেচনা করে এ উত্সবে নিজের রুচির প্রকাশ ঘটাতে চায়। একই কথা বলা যায় পূজার ক্ষেত্রেও। তবে পূজার ঢঙে কিছুটা দেশীয় ঐতিহ্যের শাড়ি প্রাধান্য পায়। আবার ঈদ উত্সবের ক্ষেত্রে বিদেশি শাড়িও অনেক বেশি প্রাধান্য পায়। অন্যদিকে বিজয় দিবসে শাড়ি সবুজ জমিন আর লাল পাড়ে রঙিন হয়। সবুজ রঙের ক্ষেত্রে কখনও কখনও গাঢ় সবুজ কিংবা হালকা সবুজ যেমন প্রাধান্য পায় তেমনি জলপাই রঙের সবুজও শাড়ির চাহিদায় নারীর কাছে বিবেচিত হচ্ছে। শাড়ির সবচেয়ে বেশি আভিজাত্যের প্রকাশ ঘটে বিয়ের আয়োজনে। শাড়ি যদি ভারী কিংবা অনেক বেশি কাজের হয় তবেই তা বিয়ে উত্সবের জন্য বিবেচিত হয়। এর পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে নিজেকে গ্রামীণ সাজে কিংবা গ্রামীণ বধূররূপে উপস্থাপন করতে চাইলে শাড়ি ধরনেও কিছু পরিবর্তন আসে। সে ক্ষেত্রে দামি তাঁতের শাড়ি, যা দেখতে খুব উজ্জ্বল হয় সেই শাড়িগুলো গ্রামীণ সাজের পরিচয় হিসেবে বিবেচিত হয়। সবশেষ, যে শাড়িগুলো অনেক বেশি রুচিশীল এবং ডিজাইনার চয়েজ বলে বিবেচিত হয়, সেগুলো আধুনিক কর্পোরেট ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। যেমন—শাড়ির ধরন রূপ বৈচিত্র্যকে প্রকাশ করার জন্য যে টেকচার ব্যবহার করা হয়, সেটা যদি একটু স্বচ্ছ টাইপের হয় তবেই তা আধুনিক নারীর কর্পোরেট কালচারের শাড়ি বলে গৃহীত হয়। বাজারে নানা ধরনের নানা ডিজাইনের শাড়ি কিনতে পাওয়া যায়। বুটিক হাউসগুলো প্রতিনিয়ত শাড়ি নিয়ে নতুন নতুন পরিকল্পনা করে, ফলে প্রতিদিনই বুটিক হাউজগুলোতে নতুন নতুন ডিজাইন সন্নিবেশিত হয়। দেশীয় শাড়ির পাশাপাশি বিদেশি তথা ভারত বিভিন্ন এলাকার শাড়িও পাওয়া যায় দামি শোরুমগুলোতে। আমাদের দেশে সাধারণত শীত মৌসুমে বিয়ের অনুষ্ঠান বেশি হয়ে থাকে। এ সময় শাড়ি পড়ার প্রচলনটা একটু বেশি। এ সময়ের পছন্দের শাড়ির তালিকাতে বেনারসি, কাতান, মসলিন শাড়িগুলোই প্রাধান্য পায়। এ ছাড়া ঢাকা শহরে কিছু অভিজাত এলাকায় গড়ে উঠেছে শাড়ির ব্র্যান্ড শো-রুম, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, উত্তরা এবং এলিফেন্ট রোডে নিজস্ব বা অভিজাত শপিং মলে এসব ব্র্যান্ডের শোরুম রয়েছে। এখন ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে গেছে এই বুটিক এবং বিভিন্ন ডিজাইনের শাড়ি। অভিজাত শপিংমলগুলো স্বতন্ত্র শাড়ির দোকানে দেশীয় শাড়ির পাশাপাশি সিল্ক, জর্জেট, সুতি, কাতান পাওয়া যায়। এ ছাড়া ঢাকার ইসলামপুরে শাড়ি বাজার বসে। এর বাইরে নরসিংদীর বাবুরহাটে সুতির শাড়ি, টাঙ্গাইলের বাজিতপুরে, সিরাজগঞ্জের সাহজাদপুরে তাঁতের শাড়ি এবং নারায়ণগঞ্জের ভুলতায় জামদানি শাড়ির বাজার বসে। এসব বাজারেও শাড়ির এক বিশাল বেচাকেনা হয়। বিভিন্ন উত্সব আয়োজন উপলক্ষে ব্র্যান্ডের দোকানগুলোতে বিভিন্ন রং এবং ডিজাইনের শাড়ি কেনার ব্যবস্থা রয়েছে। শাড়িতে নারীর সৌন্দর্য যতটা প্রকাশ পায় অন্য পোশাকে ততটা সম্ভব নয়। তাই শুধু প্রতিদিনের শাড়ি পরায় নয় বরং প্রিয়জনের জন্মদিনে, নতুন বৌয়ের মান ভাঙ্গাতে শাড়ি যেমন হতে পারে একটি দারুণ উপহার তেমনি নিজেকে উপস্থান করতে পহেলা ফাল্গুনে কিংবা বৈশাখে, পূজা পার্বনে কিংবা ঈদ উত্সবে শাড়ি হতে পারে এক অনন্য ফ্যাশন ট্রেন্ড। চারদিকে রং বদলালেও বদলায়নি নারীর শাড়ির ঐতিহ্য। বদলে যাওয়ার নিয়ম ভেঙে শাড়ি এখনও অমলিন, অদ্বিতীয় এবং অতুলনীয় নারীর ফ্যাশন-ভুবনে। আগের দিনের সেলাইবিহীন এক টুকরো কাপড়ই ছিল নারীর রূপ সৌন্দর্য প্রকাশের একটি উত্কৃষ্ট মাধ্যম। এই কাপড়েই নিজেকে অন্যের সামনে উপস্থাপন করতে এবং একই সঙ্গে নিজের অস্তিত্ব ঢেকে রাখতে পছন্দ করতেন নারী। পরিবর্তনের ধারায় ধীরে ধীরে বাঙালি সমাজে শাড়ি পরা ও ব্যবহারে নানা পরিবর্তন এসেছে। বাঙালি নারীর পোশাকের ব্যাকরণেও ঘটেছে ব্যাপক পরিবর্তন। তাই সেখানে উত্কৃষ্ট মানের শাড়ি যেমন অনেক বেশি সময় ধরে জায়গা করে নিয়েছে, তেমনি শাড়ি পরার ক্ষেত্রেও এসেছে বৈচিত্র্য। একসময় শুধু দৈনন্দিন ব্যবহারের ক্ষেত্রেই প্রাধান্য পেত শাড়ি। কিন্তু আজ শাড়ি শুধু প্রতিদিনের আয়োজনেই নয়, বরং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিজের সৌন্দর্যকে ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করতেও নারী অনেক বেশি শাড়ির উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। নারীর আধুনিকতা প্রকাশের স্বার্থে অন্যান্য পোশাকের সাথে সমান তালে পাল্লা দিয়ে এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বাংলার আবহমান কালের বারো হাতের শাড়ি। বাংলার এই শাড়ির ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব কিন্তু বাঙালি নারীদেরই। নারীর প্রথম শাড়ি পরা শেখা মায়ের কাছ থেকে। তারপর তার পরিচর্যা বড় বোন, আত্মীয় বা বান্ধবীদের কাছে থেকে। আর একসময় সেই শাড়িকেই নিজের প্রয়োজনে নারী করে তুলে তার ভালোবাসার মাধ্যম। নিজেকে সে ভাবতে শেখায় শাড়ির আদলে। বাঙালি নারীর জীবনে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে এই শাড়ির প্রভাব। শুরুর গল্প মোগল সাম্রাজ্য শুরু হওয়ার পর মোগল সংস্কৃতির প্রভাবে বাঙালি মেয়েদের পোশাকের ক্ষেত্রেও বিস্তর পরিবর্তন ঘটে। তখনই প্রচলন হতে থাকে রং-বেরংয়ের শাড়ির। শাড়ি পরার ধরনেও অনেক পরিবর্তনের সূচনা হয় তখন থেকেই। শাড়ি পরার ধরনের বৈচিত্র্য বাড়ানো মেয়েদের সৌন্দর্য প্রকাশের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। মোগল সাম্রাজ্যের প্রভাবে সেই সময় শাড়ির সাথে সালোয়ার-কামিজেরও ব্যাপক কদর বাড়তে থেকে। কিন্তু সময়ের ধারাবাহিকতায় এত পরিবর্তনের পরেও মেয়েদের সৌন্দর্যের ধারক হয়ে রইল সেই শাড়ি। বিবর্তনের নানা পথ বেয়ে শাড়ি আজ প্রতিদিনের অবিচ্ছেদ্য পোশাক হিসেবে ঠাঁই করে নিয়েছে বাঙালি নারীর ঘরে বাইরে। শুধু প্রতিদিনের ব্যবহারে নয়, বরং উত্সবে পার্বণে অনুষ্ঠানে প্রাত্যহিক জীবনে শাড়িবিহীন একটি দিনের কথাও ভাবতে পারেন না সৌন্দর্য পিয়াসী বাঙালি নারীরা। শাড়ির ধরনের ক্ষেত্রে একধরনের ব্যাপক পরিবর্তন শুরু হয়েছে স্বাধীনতার পরবর্তী পর্যায়ে। তাঁতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আশির দশকের শেষ ভাগে আমাদের দেশে চালু হয়েছে বুটিকের শাড়ি। বিভিন্ন বুটক হাউস নতুন নতুন কিছু মাধ্যম ব্যবহার করে শাড়ির এই বিশেষ ধারাকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। বুটিকের শাড়ির মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে ব্লক প্রিন্ট শাড়ি, স্ক্রিন প্রিন্ট শাড়ি। এ ছাড়া টাইডাই, বুটিক, এমব্রয়ডারি, হ্যান্ড প্রিন্ট ইত্যাদি নানা ধারার শাড়ি রয়েছে বর্তমানে। স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে ছোট ছোট বাচ্চা মেয়েরা লাল ডুরের শাড়ি পরে ছোটাছুটি করেছে। তখন কেউ কেউ ফ্রক পরত কিন্তু তার ছোঁয়া বাঙালি সমাজে খুব বড় আকারে পড়েনি। আবার কিছু কিছু মেয়ে সালোয়ার-কামিজ বা ওড়না পরতেন। আর কলেজে উঠে গেলে বেশির ভাগ মেয়েই শাড়ি পরতেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা এর পরবর্তী পর্যায়ে শাড়ি ছিল তাদের প্রধান পোশাক। হিন্দু মেয়েদের ক্ষেত্রে সিঁদুর দেখলে যেমন বোঝা যেত বিবাহিত কিনা, তেমনি বাঙালি মুসলমান মেয়েদের ক্ষেত্রে শাড়ি পড়লে বুঝা যেত তার বিয়ে হয়েছে। আজ পুরো পৃথিবীজুড়েই খাদ্য, পোশাক, ফ্যাশন, সাহিত্য, সংস্কৃতির অঙ্গনে পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। আর ফ্যাশনের সেই স্পর্শ পড়েছে শাড়িতেও। অর্থাত্ শাড়ি প্রতিদিনের চর্চা থেকে কিছুটা সরে গেলেও হয়ে উঠেছে অনুষ্ঠান আর আয়োজনে নিজের সৌন্দর্য উপস্থাপনের অনন্য মাধ্যম। যখন থেকেই বুটিক শিল্প জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে তখন থেকেই একঝাঁক তরুণ ডিজাইনারের চেষ্টায় শাড়ি ভিন্ন আঙ্গিকে নারীদের কাছে ধরা দিয়েছে। সত্তরের দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশে নারীদের মাঝে ছাপা শাড়ি জনপ্রিয় হয়ে উঠে। সুতির পাশাপাশি সিল্কের শাড়িও জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে। এ সময় শাড়ির সাথে কন্ট্রাস্ট এবং গোল গলা আর লম্বা হাতের ব্লাউজের ফ্যাশনটিও চালু হয় এ সময়। সুপ্রাচীন কাল থেকে টাঙ্গাইলের দক্ষ কারিগররা তাদের বংশ পরম্পরায় তৈরি করছেন তাঁতের নানা জাতের কাপড়। তাঁত শিল্পের বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে টাঙ্গাইলের সফট সিল্ক ও কটন শাড়ি। এই শাড়ির বুনন ও ডিজাইন দৃষ্টি কাড়ে। টাঙ্গাইলের শাড়ির বৈশিষ্ট্য হলো পাড় বা কিনারের কারুকাজ। তবে সুষ্ঠু তত্ত্বাবধানের অভাবে তাঁতিরা একে একে চলে যেতে থাকেন ভারতে, অনেকে বংশ পরম্পরায় গড়ে উঠা কাজ বন্ধ করে দিয়ে অন্য পেশায় নিয়োজিত হন। বাঙালি নারীর কাছে বৈচিত্র্য নিয়ে যে শাড়িটি এখনও নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে তা হচ্ছে বেনারসি শাড়ি। যদিও ভারতের বেনারস থেকে এই শাড়ির উত্পত্তি কিন্তু আমাদের দেশের মিরপুরের বেনারসি পল্লীর বেনারসি বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশেরই কনের পোশাক। তাই হিন্দু নারীর সঙ্গে বেনারসির সম্পর্ক যেন সাতপাঁকে বাঁধা। বেনারসি সব নারীর জীবনে সম্পর্কের স্বাক্ষর বহন করে। নারী সারাজীবন সযত্নে আগলে রাখে এই বেনারসি। কনের পোশাক ছাড়াও এ শাড়ি সাধারণ পার্টিতেও পরার উপযোগী করে বানানো হয়ে থাকে। পোশাক ডিজাইন ফ্যাশন ডিজাইনার বিপ্লব সাহা স্টাইলিং ও কোরিওগ্রাফি বিপ্লব সাহা মডেল [ ভিট চ্যানেল আই টপ মডেল প্রতিযোগিতা ২০১২-তে অংশগ্রহণকারীরা ] শর্মা, নওশীন, জেনেট, তিথি, কেয়া, প্রকৃতি, ফারিহা, পিয়া, দোলা, ফারিয়া, ঝুমুর, আশা, তানিয়া, সোনিয়া, প্রিয়াংকা, শাভ্রি সেট পরিকল্পনা এস কে, বিপ্লব সাহা ফটোগ্রাফার সাফাওয়াত খান সাফু মেকআপ আর্টিস্ট পলাশ বিশেষ কৃতজ্ঞতা রঙ ও চ্যানেল আই