সুন্দরবনে এক সময় বাঘের চেয়েও হিংস্র বলে পরিচিত বনদস্যুদল জুলফিকার বাহিনীর প্রধান জুলফিকার ওরফে জুলফি এবং রাজু বাহিনীর প্রধান রাজু এখন আর বেঁচে নেই। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে তারা নিহত হলেও তাদের গড়ে তোলা দস্যুদলকে নিশ্চিহ্ন করা যায়নি। ওই দুই দস্যুদলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ডরা পরে দল ভেঙ্গে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আকারের পাঁচটি দল তৈরি করে। এই পাঁচ দস্যুদলই বর্তমানে গোটা সুন্দরবন নিয়ন্ত্রণ করছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ওই পাঁচ দস্যুদলের দুই শতাধিক ক্যাডার গোটা সুন্দরবনের বনজ ও জলজসম্পদ খুবলে খাচ্ছে। তাদের হাতে সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া ৩০ হাজারেরও বেশি জেলে এবং বাওয়ালী, মৌয়াল, বহদ্দারসহ বননির্ভর বিভিন্ন পেশাজীবী লোকজন জিম্মি হয়ে পড়েছেন। বন ও সাগরের ভিন্ন ভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে তাদের একের পর এক সশস্ত্র হামলার কারণে সুন্দরবন জুড়ে এখন ‘মৃত্যু আতংক’ বিরাজ করছে।
একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র এসব তথ্যের সত্যতা স্বীকার করে জানায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ সারাদেশের সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল সুন্দরবন। যে কোন ধরনের অপরাধ সংঘটিত করে তারা আশ্রয় নেয় সুন্দরবনে। যে কারণে এ বনাঞ্চল জুড়ে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা। বছরের পর বছর ধরে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে নিরীহ পেশাজীবীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ ও চাঁদাবাজিসহ লুটপাটের রামরাজত্ব চালাচ্ছে বনদস্যুরা। তারা ক্রমেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। ফলে এখানকার পেশাজীবীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে সুন্দরবনে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত এক ডজন বনদস্যু বাহিনী সক্রিয় থাকলেও সুন্দরবনের অধিকাংশ অংশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে পাঁচটি বাহিনী। এ পাঁচটি দলের সদস্য সংখ্যা দুই শতাধিক। জুলফিকার বাহিনী প্রধানের মৃত্যুর পর তার সেকেন্ড-ইন-কমান্ড এবং কথিত ভাই মোর্তজা ও রেজাউল পৃথক হয়ে আলাদা দুইটি দস্যু বাহিনী গঠন করে নিজেরাই সেই বাহিনীর প্রধান বনে যায়। এর মধ্যে মোর্তজা নিজ নামেই বাহিনীর নামকরণ করেছে ‘মোর্তজা বাহিনী’। এ বাহিনীই এখন সুন্দরবনে বহদ্দার ও জেলে-বাওয়ালীদের কাছে মূর্তিমান এক আতঙ্ক। এরা জেলেদের কাছ থেকে ডাকাতি করা তিনটি ট্রলারে অবস্থান করে। এ ট্রলারগুলোতে ৩০ জন করে মোট ৯০ জন বনদস্যু রয়েছে। যাদের হাতে আধুনিক সব অস্ত্র এবং ডাকাতির সরঞ্জাম আছে। এরা সুন্দরবনের ভদ্রেরচর ও চরাপুটিয়া এলাকায় অবস্থান নিয়ে একের পর এক ডাকাতি করছে। গত ১৮ জানুয়ারি এ বাহিনীর গুলিতেই সুন্দরবনের জেলে-বাওয়ালী ও বহদ্দারদের ‘নিরাপত্তাদানকারী’ হিসাবে খ্যাত দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের চেয়ারম্যান মেজর (অব.) জিয়া উদ্দিন আহমেদ আহত হন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে সুন্দরবন ও সন্নিহিত এলাকার মানুষের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে।
অন্যদিকে রেজাউল ‘শীর্ষ’ বাহিনী নামে ২০ সদস্যের ক্ষুদ্র দল গঠন করে। গত বছর থেকে এ দলটি সুন্দরবনে ডাকাতিতে নেমেছে। এরা অধিকাংশ সময় দুবলা টহল ফাঁড়ির সামনে নীলবাড়িয়ার ভেতর এবং দুবলা সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করে। আকারে ক্ষুদ্র হলেও এ বাহিনীটি অত্যন্ত ‘হিংস্র’ বলে জেলেরা জানিয়েছে। এদের সামনে দিয়ে জেলেদের কোন নৌকাই বিনা বাধায় যেতে পারে না। এরা যা পায় তাই লুট করে নেয়। যে কারণে জেলেদের কাছে এ বনদস্যুদলটি ‘ছেচড়া বাহিনী’ নামে পরিচিত। চলতি শুঁটকি মৌসুমে এ বাহিনীর সদস্যরা অসংখ্যবার জেলেদের উপর হামলা এবং গুলিবর্ষণ করেছে। বর্তমানেও এদের কাছে লুটকৃত ৩/৪টি জেলে বোট এবং ৮/১০ জন অপহূত জেলে জিম্মি অবস্থায় আছে। ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ না পেলে তাদের ছাড়া হবে না বলে দলের প্রধান রেজাউল জেলেদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছে। এভাবে তারা গত তিন মাস ধরে ডাকাতি ও লুটপাট চালিয়ে আসছে।
এছাড়া রাজু বাহিনীর প্রধান রাজুর মৃত্যুর পর এক মাসের মতো সময় এ বাহিনীটি নীরব ছিল। এরপরই দলের তিন সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ক্ষুদ্র আকারে পৃথক তিনটি দল গঠন করে। এগুলো হচ্ছে-‘শহীদুল বাহিনী’, ‘ফরহাদ বাহিনী’ এবং ‘আল-আমিন বাহিনী’। এ দল তিনটি হিরণ পয়েন্টের পশ্চিম পাড়ে শিবসা নদীতে ডাকাতি করে। এ বাহিনী তিনটিতেও প্রায় একশ’ সদস্য রয়েছে। বর্তমানে দুবলা, আলোরকোল, মেহের আলীরচর, অফিস কেল্লা ও মাঝের কেল্লায় অবস্থানরত ব্যবসায়ী, বহদ্দার ও জেলেরা এদের কাছে জিম্মি রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অপর একটি সূত্র জানায়, গত প্রায় তিন মাসে সুন্দরবন ও সাগর উপকূলে ৫ শতাধিক নৌকা ও ট্রলারে দস্যুরা হামলা ও লুটপাট চালিয়েছে। জেলেদের মাছ লুট, মারধর, অপহরণ ও জিম্মি করে এরা হাতিয়ে নিয়েছে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ। আর এসব দস্যু বাহিনীর কাছে রয়েছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের ভাণ্ডার। যে কারণে সুন্দরবনে মাছ শিকার করতে যাওয়া জেলে এবং মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে মৌয়ালরা অপহূত হচ্ছেন।
এদিকে সুন্দরবনের বনজ ও জলজসম্পদের উপর নির্ভরশীলদের দাবি, বন বিভাগ ও প্রশাসনের এক শ্রেণীর কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় বনদস্যুরা অপরাধ অব্যাহত রেখেছে। তাদের কথা, প্রশাসনের কোন ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা বা সহায়তা না পেলে দস্যুদলগুলো এত বেপরোয়া আচরণ করতে পারতো না।
