ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট কাটছে না। ফলে নগদ অর্থ সঙ্কটে পড়ে কলমানি মার্কেট (২৪ ঘন্টার জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ নেয়ার পদ্ধতি) থেকে প্রতিদিনই বড় অঙ্কের ঋণ করে চলছে কয়েকটি ব্যাংক। এরমধ্যে কোন কোন ব্যাংকের নেয়া ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিক ভাবে বেড়েছে। কেন্দ ীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি কেন্দ ীয় ব্যাংকের গোচরীভূত হয়নি। অথচ একই কারণে এর আগে অপরাপর ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল।
দেড় মাসে দেখা গেছে যে, কয়েকটি ব্যাংক নগদ টাকার সংকুলান সামাল দিতে কলমানি মার্কেট নির্ভর হয়ে পড়েছে। প্রাইম ব্যাংকই ঋণ করছে সবচেয়ে বেশি। গত প্রায় তিন মাসের মধ্যে প্রাপ্ত ১৩ দিনের তথ্যে দেখা গেছে, ব্যাংকটি ১৭ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা ঋণ করেছে। যেখানে অন্য সব বেসরকারি ব্যাংক মিলে এই সময়ে ঋণ করেছে ৬৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাত্ বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের প্রায় ২৮ শতাংশ নিয়েছে প্রাইম ব্যাংক একাই। এছাড়া ইস্টার্ন ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংককেও অনেক ঋণ করতে হচ্ছে। ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত ঋণের চাপে কলমানি মার্কেটের ঋণের সুদ হারও কিছুটা বেড়ে গেছে।
কেন্দ ীয় ব্যাংক সূত্র বলছে, আমানতের ঋণের সুদ হার বেশি হলেও কলমানি মার্কেটে সুদ হার তার তুলনায় কম। ফলে ব্যাংকগুলো কলমানি মার্কেট থেকে ঋণ করতে আগ্রহী হচ্ছে। গত এক সপ্তাহ আগেও কলমানি রেট ছিল ৭ থেকে ৮ শতাংশ। এখন তা ১২ শতাংশেরও বেশি। যেখানে আমানতের সুদ হার সর্বনিম্ন সাড়ে ১২ শতাংশ। তাই ব্যাংকগুলো উচ্চ হারের আমানতগুলো না নিয়ে কলমানি মার্কেট থেকে বড় অঙ্কের ঋণ করে নগদ টাকার চাহিদা মেটাচ্ছে।
ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কলমানি মার্কেট থেকে ঋণ করা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে যখন কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত পরিমাণে ঋণ করতে থাকে তখন প্রতিষ্ঠানটির তারল্য সঙ্কটকে নির্দেশ করে। কয়েকটি ব্যাংক এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কলমানি মার্কেট থেকে বড় অঙ্কের ঋণ করায় এ ব্যাংকগুলোতে তারল্য সঙ্কট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কেন্দ ীয় ব্যাংকের নির্দেশিত ঋণ-আমানত হার না মেনে অতিরিক্ত ঋণ দেয়ার ফলে ব্যাংকগুলোর তারল্য সঙ্কট প্রকট হয়ে উঠেছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যে কোনো ব্যাংক স্বল্প সময়ের প্রয়োজনে কলমানি মার্কেট থেকে ঋণ করতে পারে। তবে দেড় দু্ই মাস ধরে বড় অঙ্কের ঋণ করা ইতিবাচক নয়। এভাবে অব্যাহতভাবে ঋণ নিতে থাকলে ব্যাংকগুলোর সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কথা বলতে হবে। তিনি আরও বলেন, কলমানি মার্কেট থেকে অতিরিক্ত পরিমাণে ঋণ করায় এর আগেও কয়েকটি ব্যাংককে সতর্ক করা হয়েছে। এক্ষেত্রেও প্রয়োজনে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করা হবে এবং তারল্য চাপের কারণ বিশ্লেষণ করা হবে।
গত ২৫ অক্টোবর থেকে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে প্রাপ্ত ১৩ দিনের কলমানি মার্কেটের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সময়ে ইস্টার্ন ব্যাংক কলমানি মার্কেট থেকে ঋণ করেছে ১০ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা, উত্তরা ব্যাংক করেছে ৮ হাজার ৫২ কোটি টাকা আর মার্কেন্টাইল ব্যাংক ঋণ করেছে ১১ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা। প্রাইম ব্যাংকসহ এ তিনটি ব্যাংক কলমানি মার্কেট থেকে যে ঋণ করেছে তা সব বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের প্রায় ৭৪ শতাংশ।
ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত দুই বছর ধরে গোটা ব্যাংকিং সেক্টরে তারল্য সঙ্কট দেখা যাচ্ছে। সঙ্কটের তীব্রতায় গত বছরের শুরুর দিকে কলমানি রেট ২০ শতাংশের উপরে উঠে যায়। তবে গত কয়েক মাস ধরে কলমানি রেট স্থিতিশীল রয়েছে। কলমানি মার্কেটের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরেই কয়েকটি ব্যাংক কলমানি মার্কেট থেকে ব্যাপক পরিমাণে ঋণ করছে। এতে গত সপ্তাহে কলমানি রেট কিছুটা বেড়ে ১৩ শতাংশে পৌঁছায়।
কলমানি মার্কেট থেকে বড় অঙ্কের ঋণ করা এসব ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে যে ডলার কিনছে তা নগদ পরিশোধের পরিবর্তে বিলের মাধ্যমে কেনায় ব্যাংকগুলোর নগদ তহবিলে চাপ পড়ছে। এছাড়া কেন্দ ীয় ব্যাংক যে নগদ সহায়তা দেয় তার সময়সীমা ১৫ দিন কমিয়ে আনায়ও এ চাপ অনুভূত হচ্ছে।
কেন্দ ীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, চলতি বছর সরকারের নির্বাচনের বছর হওয়ায় এ বছর সরকারের বেশি খরচ করার প্রবণতা থাকবে। ফলে ব্যাংক থেকে সরকার বেশি ঋণ করতে চাইবে। এতে ব্যাংকগুলোর তারল্যে চাপ বাড়তে পারে। এছাড়া নতুন ব্যাংকগুলো কার্যক্রম শুরু করলে আমানত সংগ্রহে ব্যাংকগুলোর মধ্যে অসম প্রতিযোগিতা দেখা দিতে পারে। তাই ব্যাংক তহবিল কমে ব্যাংকিং সেক্টরে তারল্য সঙ্কট তীব্র হয়ে উঠতে পারে। এক্ষেত্রে প্রথম জেনারেশন ও দ্বিতীয় জেনারেশনের ব্যাংকগুলোকে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে।
