থরে থরে ছয় ঋতু দিয়ে সাজানো বাঙালির বারো মাস। প্রথম ঋতু গ্রীষ্ম প্রচণ্ড তপ্ত। বৈশাখী রোদ খনখনে চোখ ধাঁধানো দুপুরে পথচারী আর কর্মজীবী মানুষ এসময় খুব কষ্ট পায়। এরই মাঝে গ্রামের দামাল-দস্যি ছেলেরা মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঘুড়ি নিয়ে চলে যায় খোলা মাঠে। এই গ্রীষ্ম ফলের মাস। আম পাকতে শুরু করে। কাঁচা-পাকা আমের গন্ধে বাগান মউ মউ করে ওঠে। জাম, জামরুল, কাঁঠাল, লিচুও এ মৌসুমে বাজারে আসতে শুরু করে। এদিক দিয়ে গ্রীষ্ম ভালো-মন্দে মেশানো একটা ঋতু। এই গ্রীষ্মের পর আরো তিনটি ঋতু গিয়ে তারপর আসে থরথর গা-কাঁপা শীত। পৌষ আর মাঘ এই দু’টি বাংলা মাস নিয়ে শীত মৌসুম। অবশ্য শীত কিন্তু শুরু হয় আরো আগে। শরত্ শেষে নবান্নের ঋতু হেমন্ত প্রকৃতিতে নেমে এলেই শীতের একটা আমেজ পাওয়া যায়।
শিশির ভেজা ঘাস-মাটি। শিউলির বোঁটা আর রবিশস্যের মাঠে সবজি-সরিষা, মটর-মশুরের পাতা ভিজে জবজব নিশির শিশিরে—এমন দৃশ্য বলে দেয় শীত আসছে। রাত যত বাড়ে কুয়াশায় ঢেকে যায় চারদিক। আকাশের গোল চাঁদ কুয়াশায় কেমন ধোয়াশা-আবছা হয়ে আসে, হেমন্তের এমন রূপ-শীতের আগমনী অবয়ব। গ্রীষ্মে গরম আর শীতে হিমেল হাওয়া। শীতে হিমালয় ছুঁয়ে হিমেল বাতাস ধেয়ে আসে বাঙালির শরীরে প্রকৃতিতে। এই শীতে গ্রামের মানুষ বেশি কষ্ট পায়। জীবনের তাগিদে কৃষক, দিনমজুর, আড়তের শ্রমিকের কাজে যেতে হয়। বিশেষ করে মা, শিশু এবং বয়স্ক মানুষজনের কষ্ট হয় বেশি। তারা একটু উষ্ণতার জন্য পূর্বদিগন্তের সূর্যের জন্য অপেক্ষা করে। সূর্য উঁকি দিতেই সেদিকে মুখ ফিরে রোদের ওম পোহাতে গুটিসুটি বসে পড়ে। এমন দৃশ্য গ্রামে গেলে দেখা যায়। শহরে সারি সারি দালানকোঠা, কল-কারখানা,যন্ত্রযানের চলাচল—শীতের হিম ভাবকে অনেকটাই ঠেকিয়ে রাখে। তবে, কুয়াশা আর শৈত্যপ্রবাহের থাবা উত্তর থেকে শহরেও হানা দেয়। তখন বিদ্যালয়গামী ছোট ছেলেমেয়েরা বিপাকে পড়ে। বিশেষ করে পথের ঘরহারা মানুষগুলোর দুর্দশা চোখে সহ্য হয় না। একটুকরো গরম কাপড়ও তাদের জোটে না। অবস্থাপন্ন দয়ালু মানুষজন এবং সরকারি লোকজন তাদের সহায়তায় এগিয়ে এলেও তা যথেষ্ট নয়।
আগেই বলেছি, শীতে কষ্ট আছে যেমন, তেমনি সুখ-দুঃখ অনুভব মানুষের মন স্পর্শ করে। গ্রামে যেমন নাড়া-দুর্বায় আগুন জ্বেলে গরিবের তাপ পোহাবার আনন্দ আছে, তেমন খেজুর গুড় দিয়ে মুড়ি বা পিঠে খাওয়ার স্বাদও ওরা এক-আধটু চেখে দেখে। শহরের মানুষও পিঠা আর খেজুর গুড়ের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয় না। গ্রাম থেকে আসা মানুষজন পথের পাশে পিঠার দোকান খুলে বসে। সেখানে লাইন দেয় শহুরে পিঠাপ্রিয় ক্রেতারা। শীতের সবচেয়ে বড় উপহার- টাটকা নতুন নতুন শাক-সবজি। এসময় বাজারে ওঠে পালং, সর্ষে, কলাই, মূলো শাক, ধনের পাতা, পিঁয়াজকলি, আরো নানা ধরনের শাক। ওঠে নতুন বেগুন, নতুন আলুর সঙ্গে ফুলকপি, বাঁধাকপি, মূলো, ওলকপি, লাউ, বরবটি, টমেটো, মটরশুটি, সিম, শালগমসহ আরো অনেক সবজি। গ্রামের ক্ষেত থেকে তুলে আনা নতুন শাক-সবজির স্বাদ অন্যরকম।
আর শীত মানেই অতিথি পাখিদের আনন্দ ঋতু। এসময় শহর গ্রামের বিলে-ঝিলে ঝাঁকে-ঝাঁকে উড়ে আসে বিদেশি পাখিরা। তাদের কলকাকলিতে মেতে ওঠে প্রকৃতি। আমাদের দেশে শীতের আমেজ পূর্ণভাবে অনুভূত হয়। তবে কোনো কোনো বছর শীতের প্রকোপ অসহনীয় হয়ে ওঠে। এবছর অর্থাত্ এই ২০১৩’র শুরুতেই শীতের রেকর্ড গত ৪৫ বছরের প্রচণ্ডতা ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে উত্তর জনপদে এবার শীত ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এসেছে। রাজধানী ঢাকা শহরকেও কাঁপিয়ে তুলেছে শীতের থাবা। গা থরথর হাড়কাঁপানি শীতেও কিন্তু জনজীবন থেমে থাকে না। সাধ্যমতো গায়ে শীতবস্ত্র চাপিয়ে লোকজন কর্মক্ষেত্রে ছোটে। শিশুরা জীবনের পাঠ নিতে স্কুলে যায়। একটু ঢিমেতালে হলেও জীবনের স্পন্দন থেমে থাকে না। তবে সবচেয়ে বড় কষ্ট যাদের— খোলাপথের সেই মানুষেরা, শিশুরা, বয়সের ভারে নুয়ে-পড়া বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা; তাদের জন্য আমাদের অনেক কিছু করার আছে। বলল, এসো আমরা সবাই মিলে সেইসব মানুষের জন্য কিছু কিছু করি। আর সচ্ছল মানুষদের প্রতি আহ্বান জানাই-
যারা খুবই কষ্টে আছে, কষ্ট যে পায় শীতে,
তাদের জন্য পারি যদি আমরা কিছু দিতে।
একটুখানি উষ্ণতা দিই, একটু ভালোবাসা-
একটুকরো শীতের কাপড় তাদের বাঁচার আশা।
এসো এসো বন্ধু সুহূদ যাই মানুষের কাছে;
তাদের জন্য অনেক কিছু করার আরো আছে।
অলঙ্করণ :শওকাতুজ্জামান
