রবীন্দ্রনাথ। আমার-তোমার প্রতিদিনের ভোরবেলার সূর্য। আঁধার থেকে জেগে ওঠা যেন এক প্রভাত। তাঁর প্রতিভা ছিল হিরের মতো। তুমি এক খণ্ড হিরেকে যেদিকে ঘোরাবে দেখবে আলো সেই দিকে ঠিকরে পড়ছে। সাহিত্যের এমন কোনো দিক নেই যে দিকে ঠিকরে পড়েনি তাঁর প্রতিভার আলো। তাঁর জাদুময় আলোর ছোঁয়ায় আমাদের মনে শান্তি জোগায়, প্রাণে আনে আরাম; অনাবিল আনন্দ। ভুবনজয়ী তিনি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য তাঁর সৃষ্টিতে ভরপুর। সাহিত্যের বটবৃক্ষ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তবে বটবৃক্ষ একদিনে হননি। সাধনা ছিল; তাই তিনি একদিন চাড়াগাছ থেকে মহীরুহ হয়ে উঠেছিলেন। অথচ একদিন তিনিও ছিলেন ছোট, ঠিক তেমাদের মতো। ছোটবেলায় তিনি কি জানতেন, এত বড় হবেন? যদি জানতেনই তবে কি বলতেন ‘কবিতা তো ছাপার অক্ষরে হয়ে থাকে। সে আবার লেখে কীভাবে?’ আমাদের অনেকেরও কিন্তু তা-ই মনে হয়েছে। অথচ কী কাণ্ড তিনিই কিনা জগত্খ্যাত কবি। কেমন করে হলেন? তার একটা ইতিহাস আছে। জ্যোতি প্রকাশ বলে তাঁর ভাগ্নে কিভাবে কবিতা লিখতে হয়; তার একটা পাঠ তাঁকে দিলেন। রবীন্দ্রনাথও নীল মলাটের এক খাতা নিয়ে বসে গেলেন। তারপর বহু চেষ্টায় দু-চার লাইনের কবিতা লিখে ফেললেন। বাড়িসুদ্ধ হৈচৈ। সেই জানাজানি স্কুল পর্যন্ত গড়াল। তাঁর মাস্টার মশাই সাতকড়ি দত্ত তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘রবি তুমি নাকি কবিতা লিখ?’ রবির তো লজ্জায় মাথা হেঁট। সাতকড়ি দত্ত বললেন, ‘রবি করে জ্বালাতন আছিল সবাই/ বরষা ভরসা দিল আর ভয় নাই।’ পরদিন রবীন্দ্রনাথ দু ছত্র মিলিয়ে আনলেন—‘মীনগণ হীন হয়ে ছিল সরোবরে/ এখন তাহারা সুখে জলক্রীড়া করে।’ অবাক সাতকড়ি দত্ত, ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, ‘বড় হয়ে তুমি অনেক বড় কবি হবে।’ গুরুবাক্য মিথ্যা হয়নি। তাই বলে, গুরু আশীর্বাদ করলেন আর অমনি আলাদিনের দৈত্যের জাদুর মতো হয়ে গেল—ব্যাপরটা এমন নয়। পড়াশোনা এবং পরিশ্রম দুটোই করেছেন তিনি। কেমন পটু ছিলেন, কেমন সাধনা ছিল? তার একটি দৃশ্য চোখে পড়ে তাঁর কবিতায়—‘ঘড়িতে বেজেছে সাড়ে পাঁচ/ বৈকালী ছায়ার নাচ/ মেঝেতে হয়েছে শুরু/ বাতাসে পর্দায় লাগে দোলা/ খাতাখানি আছে খোলা’
সেই খোলা খাতা ৮১ বছর পর্যন্ত বন্ধ হয়নি কখনো। ঘরে বসে অমলের মতো বন্দিজীবনে তিনি তো লিখেছেনই, বেড়াতে গিয়েও লিখেছেন। বিদেশ বিলেতে টর্কি নগরে গিয়ে তাঁর স্বদেশকেই মনে পড়ল। তিনি দীর্ঘ কবিতা লিখলেন। তখনো তিনি কিশোর। তিনি লিখলেন—‘...তারকা উঠিছে ফুটিয়া ফুটিয়া/ আকাশে উঠিছে শশী/ উছলি উছলি উঠিছে সাগর/ জোছনা পড়িছে খসি।’
বিলেত থেকে ফিরে সোজা জমিদারি। বাংলাদেশের শিলাইদহে। সেখানে বোটের ওপর বসে কত কবিতা, কত গান, কত ছোটগল্প লিখলেন। অনেক লেখাই লিখে চললেন তিনি। জমিদারিতে এসে নিজেকে বিলাসিতায় হারিয়ে ফেলেননি। সেই যে ছেলেবেলায় যখন তিনি নরমাল স্কুলের ছাত্র, তখন লিখলেন—‘আমসত্ত্ব দুধে ফেলি/ তাহাতে কদলি দলি।/ সন্দেশ মাখিয়া দিয়া তাতে—/ হাপুস হুপুস শব্দ / চারিদিক নিস্তব্ধ,/ পিঁপিড়া কাঁদিয়া যায় পাতে।’
কিংবা ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ এমন কবিতার বাক্যই বলে দিয়েছে—তিনি মহীরুহ হবেন।
তাঁর—‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।’ কিংবা তাঁর ‘হাট ছড়াটি’—‘কুমোর-পাড়ার গোরুর গাড়ি—/ বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি।/ গাড়ি চালায় বংশী বদন,/ সঙ্গে যে যায় ভাগ্নে মদন।/ হাট বসেছে শুক্রবারে/ বক্সী গঞ্জে পদ্মা পাড়ে।’
এমন অনেক কবিতা আছে, যা তোমরা বারবার আবৃত্তি করো। করো নিশ্চয়ই। যেমন—‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে/ সব গাছ ছাড়িয়ে/ উঁকি মারে আকাশে/ মনে সাধ কালো মেঘ ফুঁড়ে যায়—/ একেবারে উড়ে যায়; কোথা পাবে পাখা সে?’
তালগাছের মতো এমন স্বপ্ন সবসময় ছিল কবির মনে। তাঁর কল্পবৃক্ষে ডালপালা ফুলে-ফলে ভরে গিয়েছিল। যেখানে হাত লাগিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলেছে। তোমাদের জন্য তিনি যে কত কি লিখেছেন, তা তোমরা বড় হতে হতেই জানবে। শুধু জানবে না পড়বেও। শুধু পড়বে না তাঁর মতো বড় হবার ইচ্ছাও পোষণ করবে। তুমি যখন খুব ছোট, তখন তোমার জন্য কবি বর্ণপরিচয় শিখিয়েছেন। একেবারে সহজ-সরল ছন্দময়। ছড়ার ঢঙে। মনে মনে ভাবছ তা আবার কী? ধরো না স্বরবর্ণের পরিচয়। কবি লিখেছেন—‘দুই বাবু অ আ— বসে হাওয়া খাওয়া/ দুই মেয়ে ই ঈ— শীতে কাঁপে হিহি/ দুই ভাই এ ঐ— হেঁকে বলে দে দই/ গুটিসুটি ও ঔ— বসে আছে দুই বৌ।’
ব্যঞ্জনবর্ণ নিয়েও রস-রসিকতায় মিলিয়েছেন—‘চ ছ জ ঝ দলে দলে/ বোঝা নিয়ে হাটে চলে।/ ত থ দ ধ বলে ভাই/ আম পাড়ি চল যাই।/ বলে মূর্ধন্য ণ/ চুপ করে কথা শোনো।/ রেগে বলে দন্ত্য ন/ যাব না তো কক্ষ নো।’
এমন কত কি? এর মাঝে কি বোঝা গেল? ‘যে পারে-সে পারে।’ ছেলেবেলায় যিনি বলেছিলেন ‘কবিতা তো ছাপার অক্ষরে থাকে, সে আবার লিখে কীভাবে? তিনিই বিশ্বকবি। তাঁর কবিতার বই ‘গীতাঞ্জলি’ নোবেল পুরস্কার পেলো। তিনি আমাদের বাঙালিদের মুকুটমণি। তিনি বেঁচে আছেন; থাকবেন সারাজীবন আমাদের মাঝে। রবি মানে প্রতিদিনের সূর্য। প্রতিদিন আলোকিত প্রভাতে তিনি আমাদের দেখা দেন নীল আকাশে। রাতের আঁধারে ডুবে গেলেও সকাল হয়ে ফোটেন তিনি। তিনি আমাদের মনের বীণার তারে বাজতে থাকেন; বাজতেই থাকবেন—রবি, রবি, কবি রবীন্দ্রনাথ।
অঙ্কন :আমজাদ হোসেন
