হরিণ ও বিনয়ী বাঘ

আপডেট : ০২ মে ২০১৯, ১৮:৫১

হরিণের বাড়িতে এক বাঘ অতিথি হয়ে এল। অতিথি বাঘ হরিণকে বলল, আমি তো তোমার বাড়ির অতিথি, তুমি আমার জন্য কী কী করতে পারবে? হরিণ বলল, অতিথির সেবা করা ধর্ম, আমি সাধ্যমতো করব। বাঘ বলল, ধর্ম যখন বলছ তাহলে তো করতেই হবে। আচ্ছা তোমার বাড়িতে কে কে আছে? হরিণ ভয়ে ভয়ে বলে, আমার সঙ্গী আর আমার ছয়টি ছেলেমেয়ে। বাঘ মনে মনে ভারি খুশি—বিনা খাটুনিতে বেশ ক দিনের খাবার জোগাড় হলো ভেবে। লেজ দিয়ে কান চুলকে গোঁফ বাঁকিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, তোমার তো বেশ বড় পরিবার। বড় পরিবার আমার ভালো লাগে। তা তোমার সন্তানদের কাউকে তো দেখতে পাচ্ছি না? কোথায় তারা? হরিণ বলল, ওরা সবাই মামাবাড়িতে বেড়াতে গেছে। আসবে কবে? এই ক দিন বাদে। বাঘ একটু মন খারাপ করে বলল, আহারে সবার সঙ্গে দেখা করতে পারলাম না। আর মনে মনে বলল, মজা করে ক দিন খাব ভেবেছিলাম, সেটা মাঠে মারা গেল। যা হোক, অল্পেই খুশি থাকতে হবে। বাঘ ঘরের দুয়ারে আয়েশ করে বসে বলল, অনেক পথ হেঁটে এসে খিদায় পেট চোঁ-চোঁ করছে। কিছু খেতে দিতে পারবে? হরিণ বলল, অতিথির সেবা আমার পরমধর্ম, এখনই জোগাড় করছি। হরিণ বাঘের জন্য ফলমূল এনে দিল। মাংসলোভী বাঘের মুখে কি আর ফলমূল রোচে। সে আড়মোড়া ভেঙে বলল, এতে কি আর খিদে মেটে, আমার পেটের এক কোনাও ভরেনি। হরিণ বলল, ব্যবস্থা করছি। এবার সে বনের মধ্যে গাছ থেকে বড় একটা পাকা কাঁঠাল এনে দিল। কাঁঠাল খেয়ে তো বাঘের নাস্তানাবুদ অবস্থা। কাঁঠালের আঠায় তার গোঁফ মুখের লোমের সঙ্গে লেগে গেল। মনে মনে সে ভীষণ রেগে গেল। কিন্তু মুখে হাসি এনে বলল, তুমি তো জানো আমি মাংস খেতে খুব ভালোবাসি, তোমার থেকে কিছু মাংস আমায় খেতে দাও। হরিণটি তা-ই করল। এবার বাঘটি আরো লোভী হয়ে উঠল। সে বলল, তোমার মাংস খেতে বেশ মজা। অল্প খেয়ে কি আর মন ভরে? আমি তোমার অতিথি। অতিথিকে অভুক্ত রাখা ঠিক নয়। এবার গোটা তোমাকেই খেতে দাও আমায়। হরিণটি একটু ভেবে বলল, ঠিক আছে তা-ই হবে; কিন্তু তার আগে আমার কিছু কাজ আছে। আমার ছেলেমেয়ে আছে, তাদের জন্য একটা ব্যবস্থা তো আগে করতে হবে। বাঘ বলল, তা করো। তা করো। তখন বাঘটিকে হরিণ বলল, আমার সঙ্গে একটা জায়গায় যেতে পারবে তুমি? তা আবার পারব না, তুমি আমার জন্য এত করছ, আর আমি তোমার এটুকু আবদার রাখতে পারব না। তাহলে চলো। পা থেকে মাংস খেতে দেওয়ায় হরিণটা বেশ অসুস্থ ছিল, তার হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল। পথের মধ্যে একটা বানরের সঙ্গে দেখা হলে সে জানতে চাইল, কী ব্যপার, অসুস্থ শরীরে কোথায় যাও? হরিণটি বলল, বিনয় শেখাতে। বানরটি কী বুঝল কে জানে, তবে বাঘের দিকে তাকিয়ে সে ভেংচি কাটল। বাঘের গুহার দিকের পথে যাওয়া দেখে বাঘ জানতে চাইল, এদিকে কেন? তখন হরিণটি বলল, এদিকেই আমার কাজ। অবশেষে হরিণটি বাঘের গুহার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বাঘ বলল, আমার বাড়ির সামনে দাঁড়ালে যে? এখানে তোমার কী কাজ? হরিণ ক্লান্ত শরীরে বাঘের গুহার সামনে বসতে বসতে বলল, ভাবছি তোমার বাসার অতিথি হব।

মানে কী?

মানে হলো, আমি তো খুব অসুস্থ তাই আমি এখন তোমার বাসার অতিথি হব।

বলো কী? কিন্তু আমায় তোমায় খেতে দেবে কখন?

আগে আমায় সেবা-যত্ন করে সুস্থ করে তোলো। তারপর আমায় খেয়ো। এখন তো আমি তোমার অতিথি। তোমার কি এখন উচিত নয় আমার সেবা করা। বিরক্ত হয়ে বাঘটি মাথা নেড়ে বলে, আচ্ছা তা-ই হবে। হরিণটি বলল, প্রথমে তুমি আমার জন্য খাবার নিয়ে এস। তারপর আমার চিকিত্সার জন্য লতাপাতা নিয়ে এসে লাগিয়ে দাও। তারপর আমার বাচ্চাদের খাবার দিয়ে এস আমার বাড়িতে। অতিথি সেবা করতে করতে বাঘ হাঁপিয়ে ওঠে। ক্লান্ত শরীরে সে হরিণকে বলে, এবার আমায় মুক্তি দাও। আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। কাউকে প্রয়োজনের বেশি ব্যবহার করতে নেই। বিনয় মানেই দুর্বলতা নয়। আমি সুযোগ পেয়ে তোমায় খেয়ে ফেলতে চেয়েছিলাম, আর তুমি সেটা কত ভালো করে আমায় বুঝিয়ে দিলে। আজ থেকে তুমি আমার বন্ধু। আমি কখনো তোমায় খাবার কথা ভাবব না। আমায় ভুল বুঝো না। চলো আমরা বনের সব পশুপাখিকে ডাকি। আজ আমাদের বনভোজন হবে। এখন থেকে আমরা মিলেমিশে থাকব। প্রয়োজনের বেশি কেউ আমরা নেব না।

বনজুড়ে উত্সব। সবাই সেই উত্সবে আনন্দ করছে। বাঘ সবাইকে ডেকে ডেকে হরিণের আতিথেয়তার গল্প বলে। তারপর কিভাবে তাদের বন্ধুত্ব হলো সেই গল্প করে।