তেল-বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মান বারবার ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধির ফলে তার প্রভাব পড়ছে সমস্ত সেক্টরে। দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে বিভিন্ন উত্পাদিত পণ্যের। সেই ঝাঁজ গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর। এ কারণে দিশেহারা হয়ে পড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ।
বর্তমান সরকারের আমলে এ পর্যন্ত পাঁচ দফায় জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। বিদ্যুতের দাম বেড়েছে কয়েক দফায়। সর্বশেষ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট ৬ জানুয়ারি সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করেছে। অবশ্য জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির এই ইস্যুতে তারা সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে। পরোক্ষভাবে বিএনপি তাদের আটককৃত নেতাকর্মীদের মুক্তি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুর্নবহালসহ তাদের পুরনো দাবিগুলো তুলে ধরেছে। বাম দলগুলোও ১৬ জানুয়ারি অর্ধদিবস হরতাল পালন করেছে।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দাম বৃদ্ধির আগেও জ্বালানি তেলে কোনো ধরনের ভর্তুকি ছিল না। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য স্থিতিশীল রয়েছে। তবে নতুন করে তেলের দাম বাড়ানোর কারণ হলো বড় ধরনের অর্থ লোপাট হবে— এটি বিশিষ্টজনদের ধারণা। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে নানা ধরনের সংকট তৈরি হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে পরিবহন সেক্টরে। জ্বালানির মূল্য যা বৃদ্ধি হয়েছে তার চেয়ে তিনগুণ বৃদ্ধি পাবে গাড়িভাড়া। আর বাড়তি ভাড়া গুনতে গিয়ে গাড়ির কর্মচারীদের সঙ্গে যাত্রীদের সৃষ্টি হবে নানারকম ঝামেলা। এ চিত্র দীর্ঘদিনের।
অতীতে দেখা গেছে বিশৃংখলা সৃষ্টির এক পর্যায়ে পরিবহন মালিকদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সেটা কার্যকর হয়েছে খুবই কম । ট্রাক, মাইক্রোবাস, পিকআপ ও প্রাইভেট কারসহ অন্য যানবাহনের ভাড়া নির্ধারণ করতে কর্তৃপক্ষ এখনো অক্ষম। ফলে তারা তাদের ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করে থাকে। উপায়ন্তর না পেয়ে গলাকাটা ভাড়া দিয়ে জনসাধারণকে সেগুলোই ব্যবহার করতে হচ্ছে।
জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। আবার কাঁচা তরকারির উত্পাদন খরচ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উত্পাদিত পণ্যের পাইকারি, খুচরা উভয় মূল্য আকাশচুম্বি। কাঁচাপণ্যের দাম বৃদ্ধিতে ব্যবসায়ীদের যুক্তি হলো জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করতে হয়।
অন্যদিকে বিদ্যুতের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকবার। যেভাবে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, বর্তমানে গ্রাহকদের বিল দিতে হচ্ছে তার চেয়ে বেশি। ‘ভুতুড়ে বিলে’ অতিষ্ঠ জনগণ। যে বাড়িতে তিনটি এনার্জি বাল্ব, একটি টেলিভিশন— এই শীতের মধ্যেও ঐ গ্রাহককে ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ শত টাকার বিল। কেন এই পরিমাণ বিদ্যুত্ বিল তার কোনো সদুত্তর কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। আবার অতি সম্প্রতি বিদ্যুত্ বিভাগ থেকে বলা হচ্ছে প্রত্যেক গ্রাহককে মিটার ভাড়া হিসেবে জামানত দিতে হবে। এভাবে নানা ছলচাতুরির মধ্য দিয়ে গ্রাহকদের আর্থিকভাবে পদপিষ্ট করা হচ্ছে।
এককথায় জ্বালানি আর বিদ্যুতের ভেলকিবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে দেশের সাধারণ মানুষ। যার প্রভাব পড়বে ক্ষমতাসীন দলের ওপর। কারণ সাধারণ মানুষ সরকারের লাভ-লোকসান বোঝে না। এমনকি বুঝতে চেষ্টা পর্যন্ত করে না । সাধারণ মানুষ শুধু চায় দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি মূল্য ও বিদ্যুত্ মূল্যের ঊর্ধ্বগতি থেকে রক্ষা পেতে।
এ কারণে দেশের অভ্যন্তরের দরিদ্র মানুষের আয় বিবেচনা করে সবকিছুর মূল্য বৃদ্ধি করা উচিত। বিষয়টি সরকারকে ভেবে দেখতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
