বিতর্কিত ড্যাপ বাস্তবায়ন হলে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ঢাকার ২৯ আসনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের আশঙ্কা প্রার্থী ও নেতাদের মধ্যে বাড়ছে। দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আপত্তি, গণবিক্ষোভ ও রিহাবের মতামতের আলোকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কমিটি গঠন করে দিয়ে বলেছিলেন, সবার মতামতের ভিত্তিতেই ড্যাপ সংশোধন হবে। মাসের পর মাস, বছর গড়িয়ে গেলেও কমিটি একটি বৈঠকও করেনি। অন্যদিকে বিতর্কিত ড্যাপ বাস্তবায়নেরও প্রক্রিয়া চালাচ্ছে একটি মহল। ড্যাপ আওতাধীন এলাকার লাখ লাখ মানুষ ক্ষোভে ফুঁসছে। গাজীপুরের মতো যে কোনো সময় গণবিস্ফোরণের ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ড্যাপ নিয়ে সরকারি দলের এমপিদের মাঝেও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। ড্যাপের আওতাধীন এলাকার এমপিরা বলছেন, যে ড্যাপ নিয়ে এ গেজেট জারি করা হয়েছে, সেটি সংশোধন না করলে রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকায় গণবিস্ফোরণ হতে পারে। আর এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তারা জনগণের পক্ষেই অবস্থান নেবেন। এমপিরা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, জনপ্রতিনিধিদেরও বাদ দিয়ে কোনোদিনই ড্যাপ চূড়ান্ত অনুমোদন পাবে না। কোটি কোটি মানুষের সুবিধা-অসুবিধা জড়িত এতে। তাঁরা বলেছেন, ড্যাপ বাস্তবায়ন করতে হলে জনমত নিতেই হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বর্তমান কাঠামোতে ড্যাপ কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট সবার প্রতিনিধিত্বশীল নয়। সংশ্লিষ্ট সবাইকে বাদ দিয়ে কেবল স্থপতি, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এবং পরিবেশবাদীদের অন্তর্ভুক্তিতে গঠিত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রণয়ন করা হয়েছে। ঐ কমিটিতে হাইড্রোগ্রাফিক ইঞ্জিনিয়ার, ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনার, জিওলজিস্ট, পানি বিশেষজ্ঞ, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং জনপ্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
সরকার দলের এমপিরা বলেছেন, মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন, ‘সাত মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমেই ড্যাপ চূড়ান্ত করা হবে। সেখানে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের মতামত দেয়া হবে।’ তাঁরা বলেন, প্রকাশিত গেজেটকে কাজের ধরন কী হবে সেটির একটি নির্দেশনা মনে করছি। অন্য কিছু নয়। তারা বলেন, বিষয়টি নিয়ে ঢাকার এমপিরা প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন। তাঁরা বলেন, ইতিমধ্যে আমরা আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির প্রধান সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে আলোচনা করছি। তিনি তাদের (সাংসদ) বাদ দিয়ে ড্যাপ চূড়ান্ত বা বাস্তবায়িত হবে না বলেও আশ্বস্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, গেজেট হলেও তাদের সঙ্গে সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে আলোচনা করা হবে। এমনকি এ আলোচনা কয়েক স্তরের হতে পারে। এছাড়া ওয়েবসাইটেও জনমত নেয়া হবে।
হাবিবুর রহমান মোল্লা এমপি বলেন, ‘রাজউকের এক সভায় আমি ড্যাপ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলাম। কারণ তারা যে নকশা করেছেন তা জনবান্ধব হয়নি। আর মন্ত্রিসভার বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ড্যাপের আওতাধীন এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে ড্যাপ চূড়ান্ত করার কথা।’ তিনি বলেন, ‘ড্যাপ তো জনগণের স্বার্থের জন্যই করার কথা। সেখানে জনস্বার্থ দেখা না হলে একজন জনপ্রতিনিধি হিসাবে আমি জনগণের পক্ষেই থাকব। আমি কোনোভাবেই চাইব না অন্যায়ভাবে আমার এলাকার লোক ক্ষতিগ্রস্ত হোক। যারা এ নকশা করছেন তাদের কোনো জনসম্পৃক্ততা নেই। এ ধরনের উদ্যোগ নিতে হলে সবার আগে সুবিধাভোগীদের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।’ ড্যাপ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলে তাঁর এলাকায় জনরোষ দেখা দেবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে হাবিবুর রহমান মোল্লা বলেন, ‘আমি অবশ্যই জনগণের পক্ষেই থাকব।’
জাহিদ আহসান রাসেল এমপি বলেন, ‘নির্বাচনের আগেও এলাকাবাসী ড্যাপ বিষয়ে তাদের দাবি-দাওয়া উত্থাপন করেছে। আমরাও তাদের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকার জনস্বার্থবিরোধী কোনো কাজ করবে না।’ তিনি বলেন, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিষয়টি নিয়ে জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এখন আবার সেই আলোকেই যদি ড্যাপের নকশা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয় তাহলে গণবিস্ফোরণ অবশ্যম্ভাবী। এ ধরনের বড় কোনো কর্মসূচি হাতে নেয়ার আগে অবশ্যই প্রতিনিধিদের মতামত নেয়া উচিত।
তৌহিদ জং (মুরাদ) এমপি বলেন, ‘গেজেটজারি হলেও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া এটির চূড়ান্ত অনুমোদন হবে না। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে ড্যাপ বাস্তবায়ন হবে। এ ক্ষেত্রে প্রকাশিত গেজেটকে আমরা খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছি না।’ তিনি বলেন, ‘আমি আমার এলাকার কথা বলতে পারি। ১৯৯৮সালের বন্যায় রাজধানী ও এর আশপাশ এলাকা বন্যাকবলিত হলেও সাভার আশুলিয়া মাথা তুলে ছিল। অথচ ড্যাপের রিভিউ কমিটি এই এলাকাকে নিচু এলাকা হিসাবে চিহ্নিত করেছে। এটা কোনোভাবেই এই এলাকার জনগণ মেনে নেবে না। মুরাদ জং জানান, ‘আমরা সব এমপি এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করব। আমার বিশ্বাস, এ সরকার জনগণের সরকার। প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই আমাদের বাদ দিয়ে জনস্বার্থবিরোধী কোনো কাজ বাস্তবায়ন করবেন না। আমি ইতিমধ্যে ডিও লেটার দিয়েছি সংসদীয় কমিটিতে আলোচনার জন্য।’
আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি বলেন, ‘আমার এলাকায় মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি। আমার নির্বাচনী এলাকা তেজগাঁও শিল্প এলাকা হিসাবেও চিহ্নিত। ইতিপূর্বে ড্যাপ নিয়ে আমার এলাকার সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে আমরা মতবিনিময় করেছি। সে ক্ষেত্রে ড্যাপ চূড়ান্ত করার আগে অবশ্যই জনপ্রতিনিধিদের দেখানো উচিত। যারা ড্যাপের নকশা করেছেন তাদের তো জনপ্রতিনিধিদের কাছে যেতে হয় না। কিন্তু আমাদের যা কিছু করার জনগণকে নিয়েই করতে হবে।
ঢাকা-৩ আসনের এমপি নজরুল হামিদ বিপু বলেন, আমরাও চাই, ড্যাপ বাস্তবায়ন হোক। জলাশয়ের জায়গায় জলাশয় থাকুক। কিন্তু তাই বলে জনগণের স্বার্থবিরোধী কোনো প্রকল্প আমরা চাই না। মন্ত্রণালয় গেজেট করেছে। কিন্তু আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করে গেজেট বাস্তবায়ন করা যাবে না। ড্যাপ কাদের জন্য, সেটা ভুলে গেলে চলবে না। সৈয়দ আশরাফ বলেছেন, সরকারও জনবান্ধব ড্যাপের পক্ষেই। জনগণ বাদ দিয়ে কাদের জন্য ড্যাপ করা হচ্ছে, এ প্রশ্ন আমাদের প্রত্যেক জনপ্রতিনিধিকেই শুনতে হবে।
ঢাকা-৪ আসনের এমপি সানজিদা খানম বলেন, আমি বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদে বলেছি, ড্যাপ হলে আমার এলাকার মানুষ বিপুল ক্ষতির শিকার হবে। পাশাপাশি জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করবে। যে কর্মসূচি জনগণের স্বার্থবিরোধী হবে, সেটা অবশ্যই শেখ হাসিনার সরকার বাস্তবায়ন করবে না। গেজেট হলেও এর যথাযথ সংশোধন হয়েই ড্যাপ চূড়ান্ত অনুমোদন পাবে। তা না হলে আমরা জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বো।
গোলাম দস্তগীর গাজী এমপি বলেন, ‘গেজেট মানেই তো ড্যাপ বাস্তবায়ন নয়। এলজিআরডি মন্ত্রীকে প্রধান করে প্রধানমন্ত্রী সাত সদস্যের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি করে দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেই ড্যাপ বাস্তবায়ন করা হবে। মন্ত্রিসভায় এটি আলোচনা হয়েছে। তাই আমি মনে করি, আমাদের বাদ দিয়ে বা জনগণের ক্ষতি হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের সরকার বাস্তবায়ন করবে না।’
ড্যাপের আওতায় ২৯ নির্বাচনী আসন: ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও মুন্সীগঞ্জ নির্বাচনী এলাকার ২৯টি আসন গেজেট আকারে প্রকাশিত ড্যাপের মধ্যে পড়েছে। জনপ্রতিনিধিরা হলেন কামরুল ইসলাম ঢাকা-২, নজরুল হামিদ বিপু ঢাকা-৩, সানজিদা খানম ঢাকা-৪, হাবিবুর রহমান মোল্লা ঢাকা-৫, মিজানুর রহমান খান ঢাকা-৬, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ঢাকা-৭, রাশেদ খান মেনন ঢাকা-৮, সাবের হোসেন চৌধুরী ঢাকা-৯, একেএম রহমত উল্লাহ ঢাকা-১০, আসাদুজ্জামান খান কামাল ঢাকা-১১, শেখ ফজলে নূর তাপস ঢাকা-১২, জাহাঙ্গীর কবির নানক ঢাকা-১৩, আসলামুল হক ঢাকা-১৪, কামাল আহমেদ মজুমদার ঢাকা-১৫, ইলিয়াসউদ্দিন মোল্লা ঢাকা-১৬, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ঢাকা-১৭, সাহারা খাতুন ঢাকা-১৮, তালুকদার মো. তৌহিদ জং (মুরাদ) ঢাকা-১৯, বেনজীর আহমদ ঢাকা-২০, আ ক ম মোজাম্মেল হক গাজীপুর-১, জাহিদ আহসান রাসেল গাজীপুর-২, অ্যাডভোকেট রহমত আলী গাজীপুর-৩, মেহের আফরোজ চুমকী গাজীপুর-৫, গোলাম দস্তগীর গাজী নারায়ণগঞ্জ-১, নজরুল ইসলাম বাবু নারায়ণগঞ্জ-৩, সারাহ বেগম কবরী নারায়ণগঞ্জ-৪, নাসিম ওসমান নারায়ণগঞ্জ-৫, সুকুমার রঞ্জন ঘোষ মুন্সীগঞ্জ-১, সাগুফতা ইয়াসমীন এমিলি মুন্সীগঞ্জ- ২। এর মধ্যে সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়বে ঢাকা ২, ৩, ৪, ৫, ৯, ১৪, ১৮, ১৯, ২০, গাজীপুর ১, ২, ৫ ও নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের মানুষ।
