চেক ক্লিয়ারিংয়ের উপর অতিরিক্ত ফি আদায় করছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। ব্যাংকগুলোর নিজস্ব উত্স থেকে এ চার্জ মেটানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পরামর্শ দেয়া হলেও তা না মেনে গ্রাহকদের কাছ থেকেই ক্লিয়ারিং ফি আদায় করা হচ্ছে। বরং একটি চেক ক্লিয়ারিংয়ের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংককে যে টাকা দিচ্ছে তার চেয়ে দ্বিগুণ টাকা গুণতে হচ্ছে গ্রাহককে। এতে বিপাকে পড়ছেন ব্যবসায়ীসহ সব ধরনের ব্যাংক গ্রাহক। অন্যদিকে চেক ক্লিয়ারিংয়ে সরকারি ও সরকারি কর্মকর্তাদের এ ফি থেকে অব্যাহতি দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে আরো বৈষম্য তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আর্থিক অনিয়ম, বিশৃংখলা ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো চেকের মাধ্যমে লেনদেনে অভ্যস্ত। বিভিন্ন সময় সরকারও এ বিষয়ে গ্রাহকদের উত্সাহিত করেছে। কিন্তু চেক ক্লিয়ারিং (নিষ্পত্তি) করতে গ্রাহকের একাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেয়ার কারণে চেকে লেনদেন করতে তারা উত্সাহিত হচ্ছেন না। এ অবস্থা চলতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে চেক ও ইলেকট্রনিক্স ফান্ডস ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক বা ইএফটিএনের প্রতি গ্রাহকরা আগ্রহ হারিয়ে নগদ (ক্যাশ) টাকায় লেনদেন করবে। আর্থিক ও সামাজিক বিশৃংখলা বেড়ে যাবে। এমনকি নগদ টাকা চুরি, ছিনতাই ও হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটবে বলে ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এরূপ চার্জ আদায় করার যৌক্তিকতা দেখি না। এক্ষেত্রে টাকার পরিমাণ তুচ্ছ হলেও এটা ভাল দেখায় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের আয়-ব্যয়ের বিভিন্ন উত্স ও খাত রয়েছে। চেক ক্লিয়ারিংকে আয়ের উত্স না করে ব্যয় খাত করার কথা বলেন তিনি। গ্রাহকের উপর এ ধরনের চার্জ আরোপ ঠিক হচ্ছে না উল্লেখ করে তা পুনর্বিবেচনা করা যায় কি না- সে বিষয়টি ভাবার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। অন্যদিকে সরকারি চেক ফি থেকে অব্যাহতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, এটা বৈষম্য তৈরি করা হবে। এক্ষেত্রে দুই রকমের নীতি করাও ঠিক হবে না।
চেক ক্লিয়ারিং বিষয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) সভাপতি সবুর খান বলেন, চেক ক্লিয়ারিংয়ে এ ধরনের চার্জ আরোপ করা বন্ধ না করলে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে চেকের মাধ্যমে লেনদেন থেকে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বিরত থাকবে। আর তখন আর্থিক ও সামাজিক খাতে চরম বিশৃংখলা দেখা দেবে। তিনি বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা ২০০ টাকা খরচ বা অন্যকে দেয়ার জন্য চেকের মাধ্যমে লেনদেন করে। এক্ষেত্রে যদি তার একাউন্ট থেকে সাত টাকা কেটে নেয়া হয় তাহলে ওই গ্রাহক চেক নিতে চাবে না। এ চার্জ আরোপ করার পরে গ্রাহকরা চেক নিতে অস্বীকার করছে এবং একটি প্রতিষ্ঠানে ১৫টি চেক ফেরত এসেছে যার রিপোর্ট তার কাছে আছে বলেও দাবি করেন তিনি।
গত নভেম্বরে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম্্স ডিপার্টমেন্ট। দেশে কার্যরত তফসিলি ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো ওই সার্কুলারে বলা হয়, বাংলাদেশ অটোমেটেড ক্লিয়ারিং হাউজ (বিএসিএইচ) সুষ্ঠু পরিচালনার স্বার্থে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা ব্যয় নির্বাহের জন্য এর মাধ্যমে লেনদেনের ক্ষেত্রে চার্জ ধার্য করা হয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের আর্থিক সহায়তায় ওই প্রকল্প স্থাপন করা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, প্রতিবছর বিএসিএইচ মেশিনের মূল্যমান সাড়ে ১২ কোটি টাকা হারে কমে যাওয়া এ ওই মেশিন পরিচালনার জন্য ১২ কোটি মিলে মোট বছরে খরচ হবে ২৫ কোটি টাকা। এ টাকা তুলতেই চেক ক্লিয়ারিং এ চার্জ আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সার্কুলার জারির পর চলতি মাসের (জানুয়ারি) শুরু থেকে হাই ভ্যালু চেক ক্লিয়ারিং এর ক্ষেত্রে চেক উপস্থাপনকারী ব্যাংকের কাছ থেকে ২৫ টাকা এবং রেগুলার চেক ক্লিয়ারিং ও যেকোন ইএফটি (ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার) লেনদেনে পাঁচ টাকা নেয়া হবে। এছাড়া উপস্থাপনকারী ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে যথাক্রমে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা ও সাত টাকা নিতে পারবে। তবে গ্রাহকদের চার্জ না করে ব্যাংকের নিজস্ব উত্স থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের চার্জ পরিশোধ করার জন্য ওই সার্কুলারে ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে সে পরামর্শ না মেনে গ্রাহককে চার্জ করায় নতুন এ জটিলতা তৈরি হয়েছে। এ থেকেও নতুন করে ব্যবসার ক্ষেত্র পেয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। কারণ চেক ক্লিয়ারিংয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে যে টাকা দিতে হয়, গ্রাহকদের কাছ থেকে তার চেয়ে বেশি টাকা আদায় করছে সবগুলো ব্যাংকই।
সরকারি চেক ও সরকারি কর্মকর্তাদের চেক ক্লিয়ারিং এর ফি অব্যাহতি চেয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে একটি আবেদন করেছে সোনালী ব্যাংক। সে অনুযায়ী এসব চেক এ নিয়মের বাইরে রাখতে আজ বা আগামীকালই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। এজন্য প্রতিবেশী দেশগুলোতে কিভাবে সরকারি চেক ক্লিয়ারিং করা হয় সে বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অন্যদিকে বিএসিএইচ প্রকল্প না অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বা স্বতন্ত্রভাবে কোন ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে পরিচালনা করা যায় কি না সে বিষয়েও চালুর সময় চিন্তা করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে পরে বাতিল হয়ে যায়। এবং গত দুই বছর এ প্রকল্প চালু হলেও চলতি বছর থেকে নতুন করে চার্জ ধার্য করে বাংলাদেশ ব্যাংক। অন্যদিকে চেক ক্লিয়ারিং ফি গ্রাহকের কাছ থেকে না নেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ জানিয়েছে ডিসিসিআইসহ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তবে তাদের সে আবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংক সাড়া দিচ্ছে না বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
প্রসঙ্গত, আন্তঃব্যাংকের চেক লেনদেনের ক্ষেত্রে চেক ক্লিয়ারিং এর প্রয়োজন পড়ে। অটোমেটেড পদ্ধতিতে এটি হওয়ায় খুব সহজে ও দ্রুত তা সম্পন্ন হয়ে থাকে।
