একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারকে ফাঁসির রায় দেয়ায় স্বস্তি ও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্টজনরা। প্রফেসর ইমিরেটাস আনিসুজ্জামান বলেছেন, আশা করি অন্য মামলাগুলোও দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত কার্যনির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবির একে ৩০ লাখ শহীদের স্বজনদের প্রত্যাশার প্রতিফলন হিসাবে উল্লেখ করেছেন। শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, সরকারের ওপর আমাদের বিশ্বাস দৃঢ় হলো। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল এ ঘটনাকে জাতীয় জীবনে একটি বড় অর্জন হিসাবে উল্লেখ করেছেন।
আশা করি অপর মামলাগুলোরও দ্রুত
নিষ্পত্তি হবে: আনিসুজ্জামান
আমি দীর্ঘকাল ধরে যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চেয়ে এসেছি। জাহানারা ইমামের গণআদালতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। অন্য একটি মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে আমি সাক্ষ্য দিয়েছি। সুতরাং যুদ্ধাপরাধের একটি মামলার যে নিষ্পত্তি হলো এটি স্বস্তিকর ঘটনা। আশা করি অপর মামলাগুলোরও দ্রুত নিষ্পত্তি হবে এবং দেশের মানুষের একটি প্রধান দাবি এভাবে পূরণ হবে।
শুধু বর্বর সমাজেই অপরাধীর বিচার
হয় না :শাহরিয়ার কবির
একাত্তরে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বাচ্চু রাজাকারকে যে শাস্তির রায় দেয়া হয়েছে তা শহীদ জননী জাহানারা ইমামের আন্দোলনের প্রথম সফল পদক্ষেপ। ৩০ লাখ শহীদের পরিবারের ৪১ বছরের সংগ্রামের ফসল। ৪১ বছর পর এই রায় ঘোষণা প্রমাণ করেছে যত বিলম্বই হোক সদিচ্ছা থাকলে যে কোন অপরাধের বিচার সম্ভব। যে সমাজে অপরাধীর বিচার হয় না, সে সমাজ বর্বর সমাজে পরিণত হয়। বঙ্গবন্ধু নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর জেনারেল জিয়া এই বিচার বন্ধ করেছিলেন। এই বিচার সেই বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং এই রায়টি সেই বিচারের সূচনামাত্র। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচারের ট্রাইব্যুনালটি অস্থায়ী ট্রাইব্যুনাল। সংসদে আইন পাস করে এ ট্রাইব্যুনালকে স্থায়ী রূপ দিতে হবে। তা না হলে খালেদা জিয়া যদি ক্ষমতায় আসেন তবে তা বন্ধ করে দেবেন। সে ঘোষণা তিনি ইতিমধ্যেই দিয়েছেন। সে কারণে ট্রাইব্যুনালের জনবল ও অর্থ বরাদ্দ বাড়িয়ে অধিক আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে দ্রুত বিচার কার্যক্রম পরিচালনারও পরামর্শ দেন তিনি।
শাহরিয়ার কবির বলেন, সরকারের উচিত এই যুদ্ধাপরাধের বিচারের পাশাপাশি ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা। কেননা, জামায়াতে ইসলামীর ধর্মভিত্তিক রাজনীতিই ৭১ সালে আলবদর, আলশামস, রাজাকার বাহিনীর সৃষ্টি করেছিল।
জাতির কলঙ্কমুক্তির
প্রথম পদক্ষেপ:শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী
বাচ্চু রাজাকারের বিচারের রায়ে আাামি অত্যন্ত স্বস্তি অনুভব করেছি। মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘ সংগ্রাম, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির যে আন্দোলন তা এক সফল পরিণতির দিকে এগুচ্ছে। এ সরকার যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বদ্ধপরিকর, সেই বিশ্বাস আমাদের দৃঢ় হলো। এজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ। সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। তারা অবিলম্বে সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্পন্ন করবে বলে আশা করি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে তাদের শাস্তি দিয়ে জাতির কলঙ্ক মোচন করবে। যে কলঙ্কের বোঝা জাতির জীবনে চেপে বসেছিল তা থেকে মুক্তি মিলছে এই অনুভূতি আমাকে আনন্দিত করছে।
কিছু দেশ ও সংস্থা না জেনেই বিরূপ মন্তব্য করছে: সুলতানা কামাল
যুদ্ধাপরাধের দায়ে আবুল কালাম আযাদের বিচারের রায় ঘোষণা আমাদের জাতীয় জীবনে একটি বড় অর্জন। আমরা ৪১ বছর ধরে এই বিচারের জন্য অপেক্ষা করছি। রাজাকার, আলবদর বাহিনী ও তাদের দোসররা মুক্তিযুদ্ধে যে গণহত্যা, লুট, মানুষকে ঘর থেকে উচ্ছেদ করেছিল তা মানুষের জীবনে ভয়ঙ্কর বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। সেই যুদ্ধাপরাধীদের আমরা পরে স্বাধীন বাংলাদেশে পুনর্বাসিত হতে দেখেছি। তাদের গাড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়েছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তারা দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বলয়ে প্রভাব বিস্তার করেছে। ৪১ বছর পরে যখন তাদের বিচার হচ্ছে, তখন তা নিয়ে অনেকের বিভ্রান্তি থাকতে পারে; কিন্তু আজ তরুণ প্রজন্ম বিশ্বজিত্ হত্যা নিয়ে যেভাবে আলোড়িত হচ্ছে, যুদ্ধাপরাধের ঘটনা এই বিশ্বজিতের চাইতে কম কোন ঘটনা নয়। মুক্তিযুদ্ধে পুরো দেশ তাদের হাতে বিপর্যস্ত হয়েছে। সুতরাং তাদের যে বিচার হচ্ছে এটা জাতীয় জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচার হবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে কয়েকটি রাষ্ট্র ও কিছু বিদেশি সংস্থার বিরূপ মন্তব্য প্রসঙ্গে সুলতানা কামাল বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ও কিছু দেশ বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে কোন মন্তব্য করেনি। প্রতিবাদও করেনি। টেস্টিমনি-৬০ যখন প্রকাশিত হয় তখন বহু রাষ্ট্র বাংলাদেশে গণহত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছিল। কিন্তু তখনও কিছু রাষ্ট্র রাজনৈতিক স্বার্থে পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। এখন যারা এই যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরোধিতা করছে তারা না জেনেই করছে বা তারা যুদ্ধাপরাধের বিচারের অগ্রগতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য যাচাই না করেই এসব মন্তব্য করছে। তাদের এভাবে ঢালাও মন্তব্য দেয়া অন্যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
