‘স্ত্রী সাদিয়া আফরিন রিতাকে (২২) ভালবেসে বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু সে আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। এ কারণেই আমি তাকে নিজ হাতে খুন করে বুকের আগুন নিভিয়েছি।’ গতকাল মঙ্গলবার আদালতে এভাবে নিজের দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন গৃহবধূ রিতার স্বামী মানিক ব্যাপারী ওরফে মানিক (৩২)। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুর সেকশন-১০, বি-ব্লক, রোড-১০, ৩ নম্বর বাসার পঞ্চম তলার একটি ফ্ল্যাটের তালা ভেঙ্গে পুলিশ রিতার গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে। ঘটনার পর থেকে মানিক পলাতক ছিল। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গত রবিবার রাতে ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ থেকে তাকে গ্রেফতার করে ঢাকায় নিয়ে আসে। ডিবি পুলিশ গতকালই তাকে আদালতে হাজির করে। মানিকের স্বীকারোক্তিমূলক জবান-বন্দি গ্রহণ করেন মহানগর হাকিম মোঃ আতিকুর রহমান।
মানিকের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর জেলার সখিপুর থানার চুরিরচর। পিতা মৃত শহীদ আলীর ব্যাপারী। কয়েক বছর আগে তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্টে মাস্টার ডিগ্রি নেন। চাকরি করেন মিরপুর ফ্যাশন নামে বায়িং হাউজে। আর সাদিয়া আফরিন রিতার গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা থানার চাঁদগ্রাম। পিতা মতিয়ার রহমান। এসএসসি পাস রিতা মিরপুরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার অপারেটর। এখানেই পরিচয় মানিকের সঙ্গে। বিয়ের পরই রিতা চাকরি ছেড়ে দেন।
জবানবন্দিতে মানিক জানান, প্রায় দুই বছর প্রেম করার পর তিন বছর আগে তিনি রিতাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর মিরপুরে ভাড়া বাসায় তারা বসবাস শুরু করেন। গত তিন মাস আগে রিতা চাকরি নেয় মিরপুর-১-এ গ্যালাক্সী হোম বিল্ডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানে। আর এ চাকরি নেয়ার পর থেকেই তার মধ্যে পরিবর্তন আসে। জোটে নতুন বন্ধু-বান্ধব। সে তাদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল ফোনে কথা বলতো। এ নিয়ে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া লেগে থাকতো। অন্য ফ্ল্যাটের লোকজন প্রায়ই তাদের ঝগড়া-বিবাধ শুনতো। গত ১১ জানুয়ারি শুক্রবার সকালে মানিক ঘুম থেকে উঠে বাথরুম যান। প্রায় আধাঘণ্টা পর বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখেন তখনও তার স্ত্রী রিতা বেডরুমে বসে মোবাইলে কথা বলছে। মানিক কার সঙ্গে কথা বলছো জানতে চাইলে স্ত্রী রিতা উত্তেজিত হয়ে বলে, “কে ফোন দিয়েছে, তা তোমার জানা দরকার নাই”।
মানিক আরও জানান, এ অবস্থায় তিনি মাথা ঠিক রাখতে পারেননি। তিনি জোর করে রিতার হাত থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেন। এ নিয়ে দুইজনের মধ্যে ব্যাপক বাদানুবাদ হয়। এক পর্যায়ে রিতা রাগ করে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। ঐ দিন আর বাসায় ফেরেনি। তার মোবাইল ফোনটিও বন্ধ ছিল। পরের দিন সকালে বাসায় ফেরে। এসময় মানিক রিতাকে জিজ্ঞাসা করে, রাতে কোথায় ছিলে ? এ কথা বলার পর রিতা উত্তেজিত হয়ে অকথ্য ভাষায় তাকে গালাগাল শুরু করে।
মানিক জানান, রিতার এ ধরনের আচরণে তিনি রাগ সম্বরণ করতে পারেননি। তিনি রিতার গলায় ওড়না পেঁচিয়ে মেঝেতে ফেলে দেন। এরপর তার পেটের উপর বসে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। হত্যার পর মৃতদেহটি বিবস্ত্র করে টেনে বাথরুমে নিয়ে যান। পরে একটি ছুরি দিয়ে তার গলা কেটে আলাদা করেন। এরপর পলিথিনে মুড়িয়ে বাথরুমের সামনে রাখা খালি বড় ড্রামে লুকিয়ে রাখেন। পরে গরম পানি দিয়ে গোসল সেরে বাসায় তালা লাগিয়ে বের হয়ে যান। প্রথমে লালবাগে তার এক বন্ধুর কাছে। পরে সেখান থেকে যাত্রাবাড়ী হয়ে নরসিংদী। কিন্তু সেখানে থাকা নিরাপদ না ভেবে গত ১৮ জানুয়ারি মামাবাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জের রঘুনাথপুর যান।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম জানান, মানিককে গ্রেফতার করে মহানগর গোয়েন্দা দফতরে আনার পরপরই তিনি ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেন। জিজ্ঞাসাবাদে মানিক জানিয়েছেন, রিতাকে তিনি খুব ভালবাসতেন। কিন্তু রিতা তার সঙ্গে রীতিমত বেঈমানী করেছে। এ কারণে হত্যাকাণ্ডের পর হাতে লেগে থাকা রিতার রক্ত তিনি তার বুকে লাগিয়েছিলেন। এতে তার বুকে জমাট বাঁধা আগুন নিভিয়েছেন। মানিক জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ড নিয়ে তার কোন ধরনের অনুশোচনা নেই ।
এসি তৌহিদ আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের চারদিন পর তালাবন্ধ ফ্ল্যাট থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়ায় ভবনের অন্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা থানায় খবর দিয়েছিল। এরপরই ঘটনাটি জানাজানি হয়। তাছাড়া রিতার বাবা-মা থাকেন গ্রামের বাড়িতে। খবর পাওয়ার পর তারা ঢাকায় আসেন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাদিয়া আফরিন রিতার বাবা মতিয়ার রহমান বাদী হয়ে মিরপুর থানায় মামলা করেছেন। মামলাটির তদন্ত ন্যস্ত হয় ডিবিতে।
