রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতি থেকে সংসদীয় সরকার পদ্ধতিতে ফেরা এখনও অবৈধ হয়ে আছে। এমনকি যে সংসদ (পঞ্চম সংসদ) সংসদীয় পদ্ধতিতে ফেরা সংক্রান্ত দ্বাদশ সংবিধান সংশোধন আইন পাস করেছিলো সেই সংসদ গঠনের বৈধতার বিষয়টিও ঝুলে আছে বর্তমান নবম সংসদের হাতে। আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, আগামী ১৩ জুনের মধ্যে সংসদ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এই সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে বলে তিনি জানান। শুধু দ্বাদশ সংশোধনী নয়, একাদশ সংবিধান সংশোধন আইন অনুযায়ী বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদের প্রধান বিচারপতি থেকে উপ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ এবং প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যাওয়াও অবৈধ হয়ে রয়েছে। ইতিমধ্যে সর্বশেষ মুদ্রিত সংবিধান থেকে একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনীসহ সংবিধানের চতুর্থ তফসিলে সংযুক্ত ১৮ থেকে ২২ অর্থাত্ ৫টি প্যারা ফেলে দেয়া হয়েছে। ক্রান্তিকালীন বিধান হিসেবে ওইসব প্যারা চতুর্থ তফসিলে যুক্ত হয়েছিলো।
সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০১০ সালের ২৭ জুলাই রায় দেয়। রায়ে সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী চতুর্থ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত কতগুলো সামরিক ফরমান ও কার্যধারা জনস্বার্থে মার্জনা করা হয়েছিলো। প্রসঙ্গত ওই অনুচ্ছেদের শিরোনাম—‘ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি’। চতুর্থ তফসিলের মাধ্যমে ১৯৭২-এর সংবিধানে এটি যুক্ত করা হয়েছিলো। মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের ধারাবাহিকতায়, গণ-পরিষদের কার্যক্রম ইত্যাদিকে সুরক্ষা দিতেই তফসিলটি করা হয়েছিলো। এই তফসিলের সুযোগ নিয়ে সামরিক শাসকরা ১৯৭৫-এর ২০ আগস্ট থেকে ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত জারিকৃত ফরমান ও কাজের বৈধতা দেয়। একইসঙ্গে চতুর্থ তফসিলে ‘৩ ক’ নামে একটি প্যারা যুক্ত করা হয়। এখানে বলা আছে, সামরিক আইনে যা কিছুই করা হোক না কেন কোন আদালত তার বৈধতার প্রশ্ন তুলতে পারবে না। এছাড়া চতুর্থ তফসিলের ২০ থেকে ২২ প্যারায় একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনীরও বৈধতা দেয়া হয়েছিলো।
প্রসঙ্গত, একাদশ সংবিধান সংশোধন আইন ১৯৯১-এর মাধ্যমে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের উপ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ে প্রধান বিচারপতি পদে ফেরত যাওয়ার বৈধতা দেয়া হয়েছিল। দ্বাদশ সংবিধান সংশোধন আইন ১৯৯১-এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি থেকে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফেরত এবং পঞ্চম সংসদের নির্বাচন ও গঠনের বৈধতা দেয়া হয়েছিল। আপিল বিভাগ ক্রান্তিকালীন বিধান হিসেবে সংবিধানের এই সংযোজনকে অবৈধ ঘোষণা করে। তবে ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে চতুর্থ সংশোধনী (বাকশাল) বাতিল, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনসহ সামরিক ফরমানের মাধ্যমে জনস্বার্থে সংঘটিত কার্যক্রমকে মার্জনা দেয় আদালত। আপিল বিভাগের ছয়জন বিচারক এ রায়ে স্বাক্ষর করেন। এর মধ্যে চারজন বিচারক অবসরে যাওয়ার এবং আপিল বিভাগে নতুন বিচারক নিয়োগের পর সরকার পক্ষ আপিল বিভাগের ওই রায়ের বিরুদ্ধে পুনর্বিবেচনার আবেদন (রিভিউ পিটিশন) করে। আদালত কিছু পর্যবেক্ষণসহ রিভিউ পিটিশনটির নিষ্পত্তি করে দেয়। আগের আপিল বিভাগ জনস্বার্থে যেসব বিষয় মার্জনা করেছিলো, রিভিউ পিটিশনে বর্তমান আপিল বিভাগ সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত করে এবং ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়। পরে সরকারের আবেদনক্রমে আপিল বিভাগ আগামী ১৩ জুন পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করে। এই সময়ের মধ্যে কোনগুলো মার্জনা করা হবে সংসদকে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে।
কিন্তু মার্জনার বিষয়টি সংসদের ওপর ছেড়ে দিলেও ১৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আদালত ক্রান্তিকাল নির্দিষ্ট করে দেয়। রায়ে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে সংবিধান প্রণয়নের আগ পর্যন্ত অর্থাত্ ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর পর্যন্ত সময়কে ক্রান্তিকাল হিসেবে গণ্য করা হবে। এর বাইরে ক্রান্তিকাল হিসেবে সংবিধানে যা কিছু অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তা সঠিক হয়নি।
আপিল বিভাগের এ রায়ের পর ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর পঞ্চদশ সংশোধনীর পর সর্বশেষ মুদ্রিত সংবিধান থেকে এগুলো ফেলে দেয়া হয়েছে। ফলে একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনী এখন আর সংবিধানের অংশ নয়।
এ প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ বলেন, এ রায়ের ফলে একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনীসহ চতুর্থ তফসিলে সংযোজিত ১৮ থেকে ২২ প্যারা অবৈধ হয়ে গেছে। এখন আদালত এসব বিষয়ে সংসদকে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছেন। যদিও সংসদেই সিদ্ধান্ত নিয়ে এগুলো চতুর্থ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এক সংসদের অন্তর্ভুক্তি অন্য সংসদ যদি বিলুপ্ত ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে তা জটিলতা তৈরি করবে। এমনিতেই অনেক বিষয় নিয়েই জটিলতা তৈরি হয়ে আছে। সরকার বা রাজনীতিবিদরা এই জটিলতা তৈরি করেনি, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কারণে নতুন নতুন জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে।
ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘আপিল বিভাগের রায়ের কিছু কিছু অংশের বাক্য গঠন ও ব্যাকরণ মেলাতে পারছি না। তারা একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনীর বিষয়াবলী চতুর্থ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করাকে সঠিক হয়নি বলে অভিহিত করেছেন। ক্রান্তিকাল নির্দিষ্ট করার পর চতুর্থ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করাকে অবৈধ বলেছেন। তবে তারা ’৭৯-এর সংসদকে অবৈধ ঘোষণা করেননি। ৫ম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। ওই সংসদ এবং তার পরবর্তী সংসদ চতুর্থ তফসিলে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছিলো, ওই সব বিষয় বর্তমান সংসদকে বিবেচনা করতে বলেছেন আদালত। এখন বর্তমান সংসদ যদি আদালতের দৃষ্টিতে যা অবৈধ তা রেখে দেয়, তাহলে অবৈধ বিষয় চতুর্থ তফসিলে থেকে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়েও তারা (আদালত) সংসদকে পরামর্শ দিয়েছেন। তারা যেটিকে অবৈধ মনে করেন সংসদ সেই অবৈধ জিনিস কেন আরো দুই মেয়াদের জন্যে রাখবে? এভাবে রাজনৈতিক বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপ করলে সংসদ সদস্যদের সংসদ বিলুপ্ত করে দিয়ে বাড়ি চলে যাওয়া উচিত।’
একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি ইত্তেফাককে বলেন, ‘রাজনৈতিক বিষয় নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা আমরা দুই বছরে সুপ্রিম কোর্টের কাছে প্রত্যক্ষ করেছি। এর ফলে এমন কিছু সংকট ভবিষ্যতে তৈরি হবে যা সামাল দেয়া রাজনীতিবিদদের জন্যে কঠিন হয়ে পড়বে। গত দুই বছরে উচ্চ আদালত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় অনেক কিছুই অবৈধ ঘোষণা করে ফেলেছে। জিয়া ও এরশাদের শাসন অবৈধ হয়েছে। একাদশ, দ্বাদশ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার অবৈধ ঘোষিত হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে তিনটি নির্বাচন কি বৈধ হয়েছে? যদি অবৈধ হয় তাহলে মার্জনা কে করবে? আপিল বিভাগ তো এ বিষয়ে কোন মার্জনা করেনি। সংসদকেও মার্জনার ক্ষমতা দেয়নি।’
আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, কোন কোন বিষয় মার্জনা হবে-সেই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আগের সময়সীমা ১৩ জুন ২০১৩ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করে সংসদের বিবেচনার জন্য ছেড়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘কোন আইন রাখা হবে, কোন আইন বাতিল হবে তার একটি গেজেট ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। আশা করি এই সময়ের মধ্যে তা সংসদে উত্থাপন করা যাবে।’
