‘ভর’ ছোটগল্প লেখক কায়েনাত আহমেদের প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ। এই গ্রন্থের গল্পগুলো ভূতের নয়, আমি বলব গল্পগুলো ভয়ের। লেখক সহজ, আড়ম্বরহীন বাক্যে পাঠকের সামনে উপস্থিত করেছেন রহস্যময় কিছু সময় এবং চরিত্র। আরো নির্দিষ্ট করে বললে জীবন-জগতের যে অংশটুকু এখনো বিজ্ঞান এবং যুক্তিবিদ্যার আওতার বাইরে অপার রহস্যময়তা নিয়ে টিকে আছে, এখনো যে সব ঘটনাবলিকে ব্যাখ্যা করতে না পেরে শেষে ‘ও কিছু না, দৃষ্টিবিভ্রম’ বলে আমরা এড়িয়ে যাই বা চালিয়ে দিই, কায়েনাত আহমেদ ঠিক সেই বিষয়টি নিয়েই কাজ করেছেন নিপুণ দক্ষতায়। মোট পাঁচটি ভিন্ন স্বাদের গল্প আছে গ্রন্থটিতে। আক্ষরিক অর্থেই ভিন্ন স্বাদ—অভূতপূর্ব, ভর, মর্গান লজ, বাণ, অভিশাপ—প্রতিটি গল্পেই গল্পকার তাঁর নৈপুণ্য বজায় রেখেছেন। দ্বিতীয় গল্পটি পড়তে গিয়ে কখনোই পাঠকের মনে হবে না যে, প্রথম গল্পটিও অনেকটা এমন ছিল। অথবা মনে হবে না—এমন গল্প জীবনে অনেক পড়েছি। চেনা-পরিচিত জীবন ও জনপদেরই গল্প, কিন্তু কায়েনাত আহমেদ লিখেছেন অনুপম বয়ানে।
গ্রন্থের ভূমিকায় লেখক গল্পগুলোকে ভূতের বলছেন, তবে শেষ পর্যন্ত আর নিছক ভূত অথবা ভয়ের থাকেনি গল্পগুলো। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ‘অভিশাপ’ গল্পটির কথা। এই গল্পের শেষের দিকে যখন সুনীতি বাবুর প্রেতাত্মা এসে তাইমুর উদ্দিন সরদারকে বলে, ‘মিছে কথা বললে অমঙ্গল হয় বাবু’, তখন গল্পটি আর নিছক ভয়ের অথবা ভূতের থাকে না, আশ্চর্য সূক্ষতায় ছুঁয়ে যায় জীবনবোধকেও। এবং এখানেই কায়েনাত আহমেদের সাহিত্যিক দক্ষতা। তিনি অবলীলায় হেসে-খেলে তাঁর গল্পের চরিত্রগুলোকে এমন কিছু ঘটনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন, যা পাঠককে শুধু ভয়ই জাগাবে না, ভাবাবেও। যেমন বলা যেতে পারে ‘বাণ’ গল্পটির কথা। কালোজাদুর ভোজবাজির আড়ালে এই গল্পে আমরা দেখি মানুষের ক্ষতি করার নির্মম-নিষ্ঠুর পরিণতি। আবার ‘মর্গান লজ’ গল্পে আমরা দেখি ভালোবাসার মানুষের জন্য ব্যথিত হূদয়ের হাহাকার। সুতরাং ‘ভর’ নিছক ভয় অথবা ভূতের গল্পগ্রন্থ নয়, কিন্তু প্রচুর ভূত আছে...
গ্রন্থটির আরেকটি চমত্কার বিষয় হচ্ছে, একদম শিশু ব্যতীত যে কোনো বয়সের পাঠক গল্পগুলো পড়ে আনন্দ লাভ করবেন।
গল্প বয়ানে টানটান উত্তেজনার মাঝে কখনো কখনো পাঠককে একটু হতাশ হতে হয় লেখকের কিছু শব্দচয়নে। কিছু কিছু বাক্যের অপরিপক্ক গঠনপ্রক্রিয়া এই গ্রন্থের একমাত্র দুর্বলতা। শব্দচয়ন এবং বাক্যগঠনের বিষয়ে আরেকটু সতর্ক হলে ‘ভর’কে শতভাগ সার্থক গ্রন্থ বলা যেত।
ভর
কায়েনাত আহমেদ
প্রকাশক :বর্ষা দুপুর
দাম :২০০ টাকা
