সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

রুশ অস্ত্রচুক্তির বিরোধিতাকারীরা শক্তিশালী সেনাবাহিনী চায় না

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:৩৪
যারা শক্তিশালী সেনাবাহিনী চায় না তারাই রাশিয়ার সাথে অস্ত্র কেনা চুক্তির বিরোধিতা করছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, বিরোধিতাকারীরা কী চান না বাংলাদেশের সেনাবাহিনী শক্তিশালী হোক? মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের যারা সমর্থন করেছে তাদের কাছ থেকে অস্ত্র কিনলে অপরাধী, আর বিরোধিতাকারী দেশ থেকে কিনলে সাধুবাদ- এটা কেমন কথা? যারা এতোদিন সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করেছে, সামরিক বাহিনীর ঘাড়ে চড়ে ক্ষমতা ভোগ করেছে- সেই সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করতে সমরাস্ত্র কিনলে তাদের এতো বিরোধিতা কেন? বুধবার জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও ইলেকট্টনিক মিডিয়ার সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তরে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সম্প্রতি রাশিয়া সফরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতেই প্রধানমন্ত্রীর এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমান সরকার কূটনৈতিক ক্ষেত্রে নীতির কোন পরিবর্তন করেনি। আমরা কোন পন্থি নই, আমরা বাংলাদেশ পন্থি। সমরাস্ত্র ক্রয় নিয়ে কমিশন খেয়েছে’- বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের এমন অভিযোগ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের সাথে সরকারের চুক্তি হয়েছে। এখানে কমিশনের কোনো সুযোগ নেই। যাদের কমিশন খাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁরাই একথা বলেন। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমাদের কমিশনের বিষয় জানা নেই, কমিশন খাওয়ার অভ্যাসও নেই। ব্যারিস্টার মওদুদের শুধু কমিশন খাওয়ারই অভ্যাস নেই, রাজনীতিতে দলবদলেও তিনি চ্যাম্পিয়ন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী কৌতুক করে যারা কমিশনের ভাগ খেতে চান তাদেরকে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাশিয়া আমাদের পরীক্ষিত বন্ধু। মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য অপরিসীম ভূমিকা পালন করেছে রাশিয়া। আমরা কোনো পন্থি নই, দেশ ও জনগণের স্বার্থে যে দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব দরকার তা করবো। তিনি বলেন, আমাদের মন্ত্রিসভায় মস্কোপন্থি, মার্কিনপন্থি, চীনপন্থি, ভারতপন্থি সবাই আছেন। তবে আমি কোনো পন্থি নই, আমি বাংলাদেশপন্থি। অপর প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, শতকরা সাড়ে ৪ ভাগ সুদে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। যার মধ্যে ৯০ ভাগ অর্থই দিচ্ছে রাশিয়া। আর এই সুদ এখন নয়, ২০১৮ সাল থেকে দিতে হবে। আর স্টেট ক্রেডিট নেয়া নতুন কিছু নয়। এর আগে চীন থেকে ঋণচুক্তির মাধ্যমে অস্ত্র আনা হলেও সুদ দিতে হয়েছে পরদিন থেকেই। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, এর আগে চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেনসহ অন্যান্য দেশ থেকে অস্ত্র কেনা হয়েছে, তখন তো কোনো কথা হয়নি। রাশিয়ার ক্ষেত্রে হচ্ছে কেন? বর্তমান সরকারের মেয়াদেই বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ শুরু করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন করবে কী না জানুয়ারি মাসের মধ্যে তাদেরকে জানাতে হবে। অন্যথায় জানুয়ারির পর বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু করা হবে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়েই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্বের সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশগুলোতে যেভাবে নির্বাচন হয়, বাংলাদেশে একইভাবে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ বিষয়ে বিরোধী দলের কিছু বলার থাকলে সংসদে এসে বলুক। সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তরে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের জনগণের প্রতি আমার আস্থা ও বিশ্বাস আছে। কারণ আমরা জনগণের জন্য কাজ করি। তাই আগামী নির্বাচনে দেশের জনগণ ভোট দিলে ক্ষমতায় যাব, নইলে যাব না। কিন্তু জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আমরা জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়ার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। এ নিয়ে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে এখনও চলছে। এ ব্যাপারে তিনি দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। সাংবাদিক সম্মেলনে প্রশ্নোত্তর পর্বে বেশ ক’জন সিনিয়র সম্পাদক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসংগ তুললে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি মামলার রায় হয়েছে, ইনশাল্লাহ সকল যুদ্ধাপরাধীরই বিচার হবে। যখনই কোনো যুদ্ধাপরাধী পাওয়া যাবে, তখনই তাদের বিচার করা হবে। ড. মোহাম্মদ ইউনূসের রাজনীতিতে আসা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। এদেশে যেকোনো নাগরিকের রাজনীতি করার অধিকার আছে। আমি কাউকে রাজনীতিতে না আসার বলার কে? বরং আমি বিশ্বাস করি এবং কামনা করি ‘শত ফুল ফুটতে দাও’। আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল সংসদে আসবে কি না, সেটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। বিরোধী দলে থাকতে আমি দুই মিনিটও কথা বলতে পারতাম না। কিন্তু বর্তমান বিরোধী দলীয় নেত্রী গত ৪ বছরে ৭/৮ বার মাত্র সংসদে গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলেছেন। এতো উদারভাবে কখনো সংসদ চলেনি। নির্দিষ্ট সময়েই আগামী নির্বাচন হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই চার বছরে ৫ হাজার ৫০৯টি বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচন হয়েছে। একটি নির্বাচন নিয়েও গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা মারামারি, কাটাকাটি বা ভোট কারচুপির কথা লিখতে পারেননি। প্রতিটি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। এরপরও কী বলবেন আমাদের দিয়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়? এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, নির্বাচনের সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসনসহ সবকিছুই থাকে নির্বাচন কমিশনের অধীনে। নির্বাচন কমিশনই ইচ্ছা অনুযায়ী যে কাউকে বদলি করতে পারে। গত ৪ বছরে উপ-নির্বাচনসহ অনেক নির্বাচনেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী হেরে গেছে। আমরা জনগণের রায় মেনে নিয়েছি, কোথাও ভোট কেড়ে নেইনি। তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়েই আগামী নির্বাচন হবে। পৃথিবীর যেসব দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র আছে, যেসব দেশে যেভাবে নির্বাচন হয়- বাংলাদেশেও আগামী নির্বাচন সেভাবেই হবে। এ নিয়ে বিরোধী দলের কোনো কথা থাকলে তারা সংসদে এসে বলতে পারে। ছাত্রলীগের সন্ত্রাস সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যখনই কোন সরকার আসে, তখনই সরকার পার্টিতে ঢুকে পড়ে সুযোগসন্ধানীরা অপকর্ম করে। কিন্তু যখনই যেখানে কোনো ঘটনা ঘটছে আমরা তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি। গ্রেফতার করে মামলা দিয়ে শাস্তি দিচ্ছি। আমরা কাউকে ছাড় দিচ্ছি না। দুষ্টু গরুর চেয়ে আমার কাছে শূন্য গোয়াল ভাল। সরকারের ভাবমূর্তি যারা ক্ষুণ্ন্ন করবে তাদের আমার দরকার নেই। যেই কোনো অপকর্ম করুক সেই যে-ই হোক তাদের আমরা ছাড়ছি না, ছাড়বোও না। আওয়ামী লীগ এতো দুর্বল হয়ে যায়নি যে অপকর্মকারীদের দলে রাখতে হবে। প্রশাসনকে আমি কড়া নির্দেশ দিয়েছি- ছাত্রলীগ কেন যেই কোন অপরাধ করবে তাত্ক্ষণিক গ্রেফতার করে আইনের হাতে সোপর্দ করতে। বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, পদ্মা সেতুতে কোন দুর্নীতি হয়নি, দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছে বলে অর্থায়ন বন্ধ করা হয়েছে। তবে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ আমরা শুরু করবো এবং শেষও করবো। বিকল্প ব্যবস্থাও আমাদের হাতে রয়েছে। জানুয়ারির মধ্যে আমরা বিশ্বব্যাংক থেকে চূড়ান্ত কথা জানতে চাই তারা পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন করবে কী না। জানুয়ারির মধ্যে চূড়ান্ত কথা না পেলে বিকল্পপন্থায় নিজস্ব অর্থায়নেই মূল সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করবো। রাশিয়া সফরের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ সফরে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে তিনটি চুক্তি ও ছয়টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের পারমাণবিক বিদ্যুত্ উত্পাদনের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে চুক্তির সময় জনগণের উদ্বেগকেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পারমাণবিক চুল্লির নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী চুল্লিতে ব্যবহূত তেজস্ক্রিয় জ্বালানি বর্জ্য রাশিয়ায় ফিরিয়ে নেয়া হবে। সাংবাদিক সম্মেলনে বলা হয়, রাশিয়া থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার জন্য দেশটি বাংলাদেশকে এক বিলিয়ন ডলার স্টেট ক্রেডিট হিসেবে দিচ্ছে। এছাড়া ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রী এ সময় তুলে ধরেন। সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী জানান, রাশিয়া সফরকালে তিনি দেশটির যোগাযোগ ও গণমাধ্যম মন্ত্রী, ফেডারেল কাউন্সিল চেয়ারম্যানের সাথে দেখা করাসহ সেখানকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পরিদর্শনের কথা জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ককে রাশিয়া এক নতুন মাত্রায় নিতে চায়। বাংলাদেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ন্ন রেখে আমরাও রাশিয়ার সাথে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরো জোরদার করতে চাই।