বর্তমানে শিক্ষায় গুণগত মানের চেয়ে সংখ্যাগত মানকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। জানা যায়, বোর্ডগুলো জিপিএ-৫ বাড়ানোর লক্ষ্যে পরীক্ষকদের বাধ্য করছেন উত্তরপত্রের মৌলিকতা বিবেচনা না করে নম্বর প্রদানে। কিছুদিন আগেও প্রশ্নপত্রে ২০%-৩০% প্রশ্ন থাকতো ব্যতিক্রমধর্মী যা শুধু মেধাবীরাই পারতো। কিন্তু এখন আর তেমন নেই। ফলে প্রকৃত মেধাবীরা হতাশায় ভুগছে। গত এইচএসসি পরীক্ষায় প্রায় ৬২০০০ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাদের মধ্যে কতজন উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে? বিষয়টি এখনই গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত।
এখন মাধ্যমিক শিক্ষার বিষয়ে কিছু উল্লেখ করতে চাই। মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত কাউকে নিয়ে কখনো কোনো নীতি নির্ধারণ করা হয় না। ’৯০-এর দশকে কৃষিশিক্ষা বাধ্যতামূলক করার ফলে সরকারি-বেসরকারি সব বিদ্যালয়ে পদ সৃষ্টি করে কৃষিশিক্ষক নিয়োগ করা হয়। বর্তমানে কৃষিশিক্ষা ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে করে জনবল সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু মাধ্যমিক শিক্ষার কোনো উন্নতি হয়েছে কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। স্বাধীনতার পর মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যসূচি ১৯৮৫ সাল থেকে কয়েকবার এবং প্রশ্নের ধারা পরিবর্তন করা হয়েছে তার চেয়ে বেশি। এক সঙ্গে বিভিন্ন সিলেবাসের প্রশ্নে পরীক্ষা নিতে গিয়ে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন। বর্তমান সরকার কম্পিউটার শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। ফলে সারাদেশে (সরকারি প্রতিষ্ঠান বাদে) সকল বিদ্যালয়ে কম্পিউটার শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। বর্তমানে কম্পিউটার শিক্ষার বদলে তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়টি মাধ্যমিক সংযোজন করা হয়েছে, যা শিক্ষকগণ পড়াতে পারবেন। ২০১৩ সালে মাধ্যমিক স্তরে চারু ও কারুকলা এবং শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে শরীরচর্চার শিক্ষক থাকলেও চারুকলা বা আর্টের শিক্ষক প্রায় স্কুলেই নেই। এমনকি উপজেলা পর্যায়ে সরকারি স্কুলগুলোতে ঐ বিষয়ের শিক্ষক নেই। জেলা সদরের কোনো কোনো স্কুলে নেই আবার কোনো কোনো স্কুলে একাধিক কর্মরত আছেন। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে সুষ্ঠুভাবে পাঠদানের লক্ষ্যে গত ২৫-৪-১২ তারিখে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপনজারি করা হয়েছে। কিন্তু এটা ঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ার দরুন বর্তমানে পাঠদান সুষ্ঠু হবে কিনা তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। চারুকলার শিক্ষক না থাকলে বিষয়টির সঠিকভাবে পাঠদান এবং মূল্যায়ন হবে না। বছর শেষে জেএসসি পরীক্ষায় প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করবে। তাদের ঐ বিষয়ের উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য শিক্ষক পাওয়া সম্ভব কিনা? আমার প্রশ্ন বিষয়টি পড়ে মাধ্যমিক স্তরে দক্ষ জনশক্তি পড়ে ওঠার কোনো সুযোগ আছে কি-না? কাজেই কোনো বিষয় সংযোজন করার আগে ঐ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দক্ষ জনশক্তি আছে কিনা তা ভাবা দরকার।
যদি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হয় পরিমাণগত বা সংখ্যাগত, গুণগত নয় তবে বলার কিছু থাকে না। আর যদি প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গুণগত মান বাড়ানোর উদ্দেশ্য থাকে হবে জিপিএ-৫ না বাড়িয়ে প্রকৃত মূল্যায়ন করে প্রকৃত মেধা যাচাই করার সময় এসেছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সকলের ভাবা উচিত এবং এখন থেকে ভাবতে হবে। নইলে পরিমাণগত শিক্ষায় শিক্ষিতরা সমাজ ও জাতির বোঝা হয়ে দেখা দেবে।
মো. মোকছেদুর রহমান,
১১২৯ মিয়াপাড়া, জামালপুর ২০০০
