নবম জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সংসদে অনুপস্থিতির আগের সব রেকর্ড ভেঙ্গে ফেললো প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। বর্তমান সংসদের এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১৫টি অধিবেশনে ৩৩৭ কার্যদিবসের মধ্যে বিএনপির সদস্যরা ২৮২ দিনই অনুপস্থিত ছিলেন। সে হিসেবে গত চার বছরে তারা সংসদে মাত্র ৫৫ দিন উপস্থিত ছিলেন। গড় উপস্থিতির হার মাত্র ১৬ শতাংশ। সর্বশেষ গত ২০ মার্চ সংসদে যোগ দেন দলটির চেয়ারপারসন ও বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এর আগে বিগত অষ্টম জাতীয় সংসদে তত্কালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সদস্যরা সর্বোচ্চ ২২৩ দিন অনুপস্থিত ছিলেন।
এমন পরিস্থিতিতে মেয়াদের চার বছর পূর্ণ করে আজ শুক্রবার ৫ বছরে পা রাখলো নবম জাতীয় সংসদ। ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসেছিল। সে হিসেবে রাষ্ট্রপতি কোন কারণে সংসদ ভেঙ্গে না দিলে আগামী বছরের ২৪ জানুয়ারি নবম সংসদ তার পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করবে। যদিও বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা।
এদিকে আগামী রবিবার বিকাল সাড়ে তিনটায় নবম জাতীয় সংসদের ১৬তম অধিবেশন শুরু হবে। প্রথা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান অধিবেশনের প্রথমদিনই জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। জানা গেছে, সংসদের এই অধিবেশনও শুরু হবে যথারীতি বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতেই। তবে স্পিকার আবদুল হামিদ মনে করেন, সংসদের এ অধিবেশনে বিরোধী দলের যোগ দেয়ার সম্ভবনা বেশি। তিনি বলেন, বিরোধী দল মূল অধিবেশনে না থাকলেও সংসদের কাজ তারা বর্জন করেননি। কমিটির সভাগুলোতে তারা নিয়মিত যাচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, চার বছর পার করে সংসদ যে পাঁচ বছরে পা রাখছে এতেও বিরোধী দলের ভূমিকা রয়েছে। সকলে মিলেই সংসদীয় এ যাত্রাকে অব্যাহত রাখতে হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সংসদ বর্জনের চিত্র:বিরোধী দলের সংসদ বর্জন দেশে অনেকটা রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত চারটি সংসদে সদস্যদের উপস্থিতির হার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ক্রমেই সংসদ বর্জনের প্রবণতা বাড়ছে। তবে দেশের সংসদীয় ইতিহাসে এবারের মত রেকর্ড আর হয়নি। সংসদের মেয়াদ শেষে সংখ্যাগতভাবে এই রেকর্ড আরও বাড়বে।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত অষ্টম জাতীয় সংসদের ৫ বছরে ৩৭৩ কার্যদিবসের মধ্যে তত্কালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ বর্জন করে ২২৩ দিন। অর্থাত্ ওই সংসদে তারা ১৫০ দিন উপস্থিত ছিলেন। গড় উপস্থিতির হার ৪২ শতাংশ। সপ্তম জাতীয় সংসদের ৫ বছরে মোট কার্যদিবস ছিল ৩৮২ দিন। এ সময় তত্কালীন বিরোধী দল বিএনপি বর্জন করে ১৬৩ দিন। আর উপস্থিত ছিলো ২১৯ দিন। গড় উপস্থিতির হার ৫৭ শতাংশ। ৫ম জাতীয় সংসদের ৫ বছরে মোট কার্যদিবস ছিল ৪০০ দিন। ওই সময় বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সংসদ বর্জন করে ১৩৫ দিন। আর উপস্থিত ছিল ২৬৫ দিন। ওই সংসদে বিরোধী দলের গড় উপস্থিতির হার ৬৬ শতাংশ।
সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার এ প্রসঙ্গে ইত্তেফাককে বলেন, বিরোধী দল সংসদ অধিবেশন অনেক সময় বয়কট করলেও সংসদীয় কমিটিতে যোগ দিচ্ছেন। গত ২২ বছরে বিরোধী দলের সংসদ বর্জন এক ধরনের রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। সকলে মিলে এ থেকে বের হয়ে আসা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী দলের সংসদে এই হতাশাজনক উপস্থিতির কারণে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা বিঘ্নিত হচ্ছে। এ কারণে অতীতের মতো বর্তমান সরকারের মেয়াদকালের প্রথম চার বছরেও জাতীয় সংসদ সত্যিকার অর্থে কার্যকর হতে পারেনি। অধিকাংশ সময় প্রধান বিরোধী দল বিএনপির অনুপস্থিতির কারণে সংসদ ছিল একপেশে। ফলে বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ, জাতীয় ও মৌলিক ইস্যুতে সংসদে সাংবিধানিক-আইনি বিতর্ক এবং সরকারের নেতিবাচক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ওয়াক আউটের মধ্যদিয়ে সত্যিকারের একটি কার্যকর সংসদ গড়া এখনও স্বপ্নই রয়ে গেছে। সংসদ বর্জনের গতানুগতিক এই ধারা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি বিরোধী দল। আর বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এলেও ছোট আকারের বিরোধী দলকে সংসদে রাখতে তারা কার্যত ব্যর্থই হয়েছে।
প্রসঙ্গত নবম জাতীয় সংসদে গত অধিবেশন পর্যন্ত মোট ২০২টি আইন পাস হয়েছে। পাসের অপেক্ষায় রয়েছে আরো ১২টি আইন। রবিবার শুরু হওয়া অধিবেশনে এগুলো উত্থাপিত হবে বলে সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে।
