বোরো ধান চাষে ব্যয় কম আয় বেশি?

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০১৩, ১৭:৩৮
বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষককে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সারা বিশ্বের মত এবং সকল সেক্টরের মত লাভ-লোকসানের হিসেব বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর কৃষি উত্পাদন ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। ফসল চাষের ক্ষেত্রে বর্তমানে ব্যয় বর্ধনকারী উপাদান হল সার, সেচ, জমি প্রস্তুতকরণ, পরিবহন ও সুস্থ বীজ/চারা। আয়ের মধ্যে আছে পণ্যের উত্পাদন হার, গুণমান ও মূল্য। বাংলাদেশের মাটির উর্বরতার হার কমে যেতে থাকার কারণে সারের ব্যবহার এমনিতেই বাড়াতে হচ্ছে। জমিতে আধুনিক জাতের চাষ করে বেশি ফলন পেতে হলে সারের সাথে সাথে সেচের প্রয়োজনীয়তাও বেড়ে যায়। তাই এই সার-সেচজনিত ব্যয় পণ্যমূল্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে কৃষি খারাপ অবস্থার মুখোমুখি হবে এটাই স্বাভাবিক। এ বছর নতুন করে কোনো সেচযন্ত্রের আবেদনে সাড়া দেয়নি সরকার। যদিও দেশের ৮০ভাগ সেচযন্ত্র চলে ডিজেলে। কিন্তু এখানে কথা হল কৃষক বার বার ধান উত্পাদন করে হিসাবকৃত মূল্য পাচ্ছে না। এর উপর সেচে ডিজেল ব্যবহার করলে উত্পাদন খরচ আরো বেড়ে যাবে। তারপরও কৃষক বাধ্য হয়ে বোরো চাষ করবে। কেননা এ ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই। দেশের সরকারসমূহ উত্পাদক কৃষকের দিকে তাকিয়ে পণ্যমূল্য বাড়ানোর আবার শহরের অনুত্পাদক ভোক্তার দিকে তাকিয়ে পণ্যমূল্য কম রাখার চেষ্টা করেছে। তবে ব্যবসাবান্ধব সরকারসমূহ শহরে তাদের জনপ্রিয়তা ঠিক রাখতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের জয়যুক্ত করেছে। কৃষকের আর্তনাদ তাদের চিন্তিত করতে পারেনি। সরকারি তথ্য ও হিসাবমতে আমরা ২০০০ সালে কৃষিকাজের আয়কে যদি ১০০ ধরি, তাহলে দেখা যায় যে, ২০১২ সালে স্থিরমূল্যে কৃষি উত্পাদন ব্যয় হয়েছে প্রায় ১২০ এবং কৃষিপণ্যমূল্য হয়েছে প্রায় ৮৫। অর্থাত্ কৃষক প্রায় ৩৫ ভাগ ঘাটতিতে পড়েছে। ২০১৫ সালে তা ৪৫ ভাগ ঘাটতি হবে। ২০১৫ সালের পর তা যদি ৫০ভাগ পার হয়ে যায় তবে দেশের কোনো কৃষক আর কৃষিকাজ করতে পারবে না, শহরে এসে অন্য পেশায় নিযুক্ত হওয়ার চেষ্টায় থাকবে। বিগত ১৯১৩ সালে উপমহাদেশের বিখ্যাত গ্লোব নার্সারি কর্তৃক প্রকাশিত “কৃষিলক্ষ্মী” পত্রিকায় ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞ স্যার হাওয়ার্ড লিখেছিলেন- “ভারতীয় কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে জলসেচ এবং গোবর। এ দু’টিতে অভাব হলে ভারতকে খাদ্য আমদানি করতে হবে, যা চিন্তাই করা যায় না। তাই সে সময়ে তারা এখানে শতাধিক কৃষি গবেষণা ও খামার প্রতিষ্ঠা করেছিল, যার ফলাফল হল আমরা এখনো খেয়ে পরে বেঁচে আছি। এখন সরকারের দায়িত্ব হল এদেশে কৃষি উত্পাদন ধারা অব্যাহত রাখতে সঠিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা। এই মুহূর্তে আমাদের সামনে রয়েছে বোরো ধানের চাষ। এই ধান চাষে কৃষক হতাশ। তাই তাদেরকে “ব্যয় কম আয় বেশি” ধারণা দ্বারা বাস্তবসম্মতভাবে প্রভাবিত করতে না পারলে বোরো উত্পাদন কমে যাবে। এতে সরকার সমস্যায় পড়বে। বর্তমানে ব্যবহূত সকল ধরনের অসত্য তথ্য তাদের কোনো সাহায্যে আসবে না। এ অবস্থায় কৃষককে পরোক্ষ ভর্তুকি ও তাদের ন্যায্য পণ্যমূল্য ঘোষণা দিলেও পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটার সম্ভাবনা কম। কল্পিত মিনিকেট নামক চালরহস্য সরকারকে আরো জটিলতায় ফেলার আশংকা রয়েছে। প্রয়োজন ব্যাপক প্রচার এবং সত্য তথ্য প্রচার। সাথে সাথে ব্যাপক মাঠভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালাতে হবে নির্দিষ্ট মডিউলের ভিত্তিতে। যেমন- বিষয় হিসেবে বলা যায়- সুষম সার ব্যবহার করা এবং সেচযন্ত্রগুলো সচল রাখা, সার্বিক চাষপদ্ধতি অবলম্বনে যত্নবান হওয়া। এই পরিস্থিতির আলোকে বর্তমানে বোরো মৌসুমে করণীয় হিসেবে আমি কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। যেমন- ১. মাঠে সেচযন্ত্র সঠিক রাখুন; ২. জমিতে টিলার চাষ দেওয়ার পরও একটি লাঙল চাষ-মই বেশি দিন এবং জমি সমতল কাদাময় রাখুন, এতে কম পানিতে বেশি পরিমাণ জমি সেচ দেয়া যাবে। ৩. জমিতে ফসফেট পাটাশ সার কমাবেন না; ৪. ইউরিয়া সারের কিস্তি প্রয়োগে লিফ কালার চার্ট ব্যবহার করুন; ৫. জমির আইল ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি করে শক্ত করে বাঁধ দিন; ৬. জমির মূল আইলের ৪ থেকে ৬ ফুট ভেতরে ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি উঁচু আরেকটি কূল-আইল বেঁধে এর ভেতরে পানি দিন। এই কাজগুলো সঠিকভাবে করে যে জমিতে ৪০ মিনিট সেচ দেয়া হত সে জমিতে ২০ থেকে ২৫ মিনিট সেচ দিন। ফলন কম হবে না, তবে চাষব্যয় ২৫ ভাগ পর্যন্ত কম হবে। কৃষক উপকৃত হবে। সাথে সাথে সরকার কৃষকের চাষব্যয় বিবেচনায় নিয়ে যদি এখনই ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে দেয় তা হলে আশা করি কৃষক জমি ছেড়ে শহরে বস্তিবাসী হবে না। ইটভাটা বা তামাক চাষের জন্য জমি লিজ দেবে না। তবে ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে সরকারকে সার-সেচ নিয়ে ব্যাপকভাবে গবেষণা শুরু করতে হবে। ইদানিং মিডিয়াতে প্রায়ই বিভিন্ন সফলতার গল্প প্রচার হতে দেখা যায়। কৃষি যন্ত্রপাতির উদ্ভাবন বা আধুনিকায়নের উদ্যোগ দেখা যায়; এমনকি গ্রামের কৃষকও এদিকে পিছিয়ে নেই। সরকারের উচিত এসব সৃজনশীলতাকে বিবেচনায় নেয়া। সাথে সাথে কৃষি আইটির উপর জোর দেয়া সরকারি ও বেসরকারিভাবে। লেখক:কৃষি বিশেষজ্ঞ