গোলাপ চাষে ক্যাপ প্রযুক্তি একটি সফল ও জনপ্রিয় প্রযুক্তি হওয়ার পরও বাংলাদেশে এর ব্যবহার নেই বললেই চলে। যে গোলাপ ফুলটির দাম বর্তমানে দুই টাকা, ক্যাপ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সেই ফুলটির গুণগতমান বৃদ্ধি পেয়ে দাম হয় ১০ টাকা। শুধু তাই নয়, ফুলটি আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানির উপযোগী হয়। আর এ প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য ফুলপ্রতি খরচ হয় মাত্র ৫০ পয়সা।
আন্তর্জাতিক বাজারে চীনের ফুলের চাহিদা বেশি। উন্নতমানের গোলাপ উত্পাদনের জন্য সে দেশের ফুলচাষিরা নিয়মিত রোজক্যাপ ব্যবহার করেন। রোজক্যাপ হল স্থিতিস্থাপকতা
গুণসম্পন্ন প্লাস্টিকের এক ধরনের ক্যাপ। গোলাপের কুঁড়ি বের
হওয়ার পর ক্যাপটি ওই কুঁড়িতে পরিয়ে দিতে হয়। এতে গোলাপ কুঁঁড়িটি সুরক্ষিত থাকে এবং পোকা-মাকড়ের উপদ্রব ও প্রাকৃতিক সব ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায়। এ ক্যাপটি স্থিতিস্থাপক হওয়ায় কুঁড়িটি বড় হওয়ার সাথে সাথে ক্যাপটিও বাড়তে থাকে। এ কারণেই ক্যাপের ভেতর কুঁড়িটি একটি উন্নতমানের পূর্ণাঙ্গ গোলাপ হিসেবে প্রস্ফুটিত হয়। গোলাপের বাহিরে ক্যাপটি থাকায় ফুল সংগ্রহ, পরিবহন এবং বাজারজাতকরণে ফুলের কোনো ক্ষতি হয় না।
বাংলাদেশে উন্নতমানের গোলাপ উত্পাদনের জন্য এখনো রোজক্যাপ নামে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি ফুলচাষিদের অজানা। এ কারণেই দেশে এই ক্যাপ তৈরি হয় না এবং আমদানিরও ব্যবস্থা নেই। সমপ্রতি কয়েকজন উদ্যোক্তা চীন থেকে কিছু ক্যাপ এনে ব্যবহার করে শতভাগ সুফল পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে গদখালির সরদার নার্সারি। এই নার্সারির মালিক রুস্তম আলী সরদার জানান, আগে যে ফুল ফুটত সেগুলো প্রতিটি বিক্রি হত দুই টাকায়। এখন সেই ফুল এত উন্নতমানের হচ্ছে যে তার দাম উঠেছে ১০ টাকায়। শুধু তা-ই নয়, এ ফুলের সবটাই রফতানি মানের। তবে এই ক্যাপ আমদানি না হওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী পাওয়া যাচ্ছে না। ফুলচাষিদের কল্যাণে বিশেষ করে ফুল রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের স্বার্থে রফতানিযোগ্য ফুল উত্পাদনের জন্য তারা রোজক্যাপ আমদানির ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
ফুল চাষের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল ফুল চাষের বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কৃষি কর্মকর্তা না থাকায় কৃষি বিভাগের কাছ থেকে কোনো পরামর্শ পাওয়া যায় না। গত তিন দশক ধরে ফুলের যে আবাদ হচ্ছে তা অনেকটা অনুমানের ওপর নির্ভর করে। আন্দাজে কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় ফুলচাষিরা ক্ষতির শিকার হন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে বাংলাদেশের ফুলের বাজার তৈরি করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে তবে এর জন্য প্রয়োজন নিত্যনতুন প্রযুক্তি ব্যবহার ও আর্ন্তজাতিক গুণগতমানসম্পন্ন ফুল উত্পাদন। এক্ষেত্রে রোজক্যাপ প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে একটি ভাল উদ্যোগ।
উত্পাদিত ফসল বা পণ্যের মূল্য সংযোজনের জন্য নতুন নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। মুক্তবাজার অর্থনীতির এই সময়ে দেশীয় কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার জন্য নিত্যনতুন প্রযুক্তি গ্রহণ অপরিহার্য। আমাদের দেশে বিভিন্ন দিবস ও অনুষ্ঠানে এখন ফুলের ব্যবহার প্রায় অপরিহার্য। আর তাই চাহিদার সাথে সাথে দেশে ফুল চাষের এলাকা প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে ঢাকায় বিদেশ থেকে আমদানি করা ফুলের ব্যবসাও বেশ জমজমাট। বেসরকারি উদ্যোগে বিদেশ থেকে গোলাপের ক্যাপ আমদানি করে দেশে গোলাপ চাষকে উত্সাহিত করা সম্ভব। একই সাথে বিভিন্ন সরকারি নার্সারি ও উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ এ প্রযুক্তি সমপ্রসারণে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারে।
লেখক:আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ, সহকারী অধ্যাপক
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
