তাজরীন ফ্যাশনস ট্র্যাজেডির দুই মাস পার না হতেই আবার গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল শনিবার দুপুর ৩ টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকার ‘স্মার্ট’ নামের একটি গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডে ৭ পোশাক কর্মী নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন। এদের মধ্যে ১৫ জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে অজ্ঞাত পরিচয়ের এক নারী শ্রমিক ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছেন। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিত্সকরা জানিয়েছেন। এদিকে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় লোকজন বেড়িবাঁধ এলাকায় প্রতিবাদ মিছিল ও বিক্ষোভ করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন করা হয়। এ রিপোর্ট লেখা পযন্ত বেড়িবাঁধ এলাকায় বিভিন্ন গার্মেন্টসের কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করছিলেন। এ ঘটনার পর স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার ঘটনাস্থল এবং শিকদার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। এসময় প্রতিমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়া এবং ঘটনা তদন্তের আশ্বাস দেন।
স্মার্ট গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডে নিহতরা হলেন ভোলার বোরহান উদ্দিন থানা এলাকার মো. কাওসার হোসেনের মেয়ে জোত্স্না (২০), ঝালকাঠির রাজাপুর থানার কালুদাস কাঠি গ্রামের আলফাজের মেয়ে রাজিয়া (১৫), অজ্ঞাতপরিচয় কিশোরী (১৫), বসিলা বস্তির জাবেদ হোসেনে মেয়ে কোহিনুর (১৫), ভোলার বোরহান উদ্দিন থানার চর গাজীপুর গ্রামের আজিজুল হকের মেয়ে নাসিমা (৩০) ও বোরহান উদ্দিন থানার দেউলা গ্রামের নয়া মিয়ার মেয়ে নাসিমা (১৭)। এছাড়া বসিলা রোডের বাসায় প্রাথমিক চিকিত্সাধীন অবস্থায় লাইজু (১৬) নামে অপর এক নারী শ্রমিক মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে জোত্স্না ও লাইজুর লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গ এবং বাকি ৫ শ্রমিকের লাশ শিকদার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে রয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস সূত্র এবং স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকার তিন রাস্তার মোড়ের খান মার্কেটের ২য় তলায় ‘স্মার্ট’ নামের ঐ গার্মেন্টস কারখানায় গতকাল বিকাল ৩ টার দিকে হঠাত্ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। শ্রমিকরা বুঝে ওঠার আগেই তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কে শ্রমিকরা সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলে হুড়োহুড়ি বেধে যায়। ফলে দ্বিতীয় তলায় অনেকে আটকে পড়ে অগ্নিদগ্ধ হন। অগ্নিদগ্ধদের মধ্যে ২০ থেকে ২২ শ্রমিক দোতলা থেকে লাফিয়ে বাঁচার চেষ্টা করলে তারা আরো গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাদেরকে উদ্ধার করে শিকদার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। এর মধ্যে শিকদার মেডিক্যাল ভর্তি হওয়া ৫ জন বিকাল সাড়ে ৪ টার দিকে মারা যান। অপরদিকে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি হওয়া তিনজনের মধ্যে জোত্স্না নামের এক শ্রমিক বিকাল ৫ টার দিকে মারা যান। এদিকে আগুনের খবর পেয়ে দুপুর সাড়ে তিনটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের ৭টি ইউনিট দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং আহতদের উদ্ধারের চেষ্টা করে। তারা দেড় ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এ সময়ে কারখানার মালামাল পুড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের উপ-সহকারী পরিচালক মো. আ. হালিম জানান, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে এ পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে। তাত্ক্ষণিকভাবে ৬ জন নিহত ও ১৫ জন আহত হওয়ার খবর পেয়েছে। তিনি আরো জানান, আগুন নেভানোর পর ডাম্পিংয়ের সময় তারা হতাহত কাউকে ভেতরে দেখতে পাননি। হতাহতের খবর জানালেও তিনি কারখানার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে কিছু জানাতে পারেনি। এদিকে কারখানার সামনে নাজমা, সুরমা ও আকলিমা নামে তিন পোশাক কর্মীকে খুঁজতে দেখা গেছে তাদের স্বজনদের। এদিকে কারখানার নিরাপত্তাকর্মী ফরিদ আলম পুলিশকে জানান, গত শুক্রবার ঐ কারখানার বয়লার নষ্ট হলে তা ঠিক করা হয়। গতকাল শনিবার ঐ বয়লার থেকে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হতে তিনি দেখেছেন। কারখানাটির শ্রমিক মমতাজ বেগম জানান, আগুন লাগার আগে তিনি ফিনিশিং সেকশনে কাজ করছিলেন। আয়রন সেকশন থেকে আগুনের উত্পত্তি হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। ঐ কারখানায় প্রায় সাড়ে তিনশ’ শ্রমিক কাজ করে জানিয়ে তিনি বলেন, লাঞ্চের পর আগুন লাগায় শ্রমিক সংখ্যা কম ছিল। এদিকে বিজেএমইএ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের প্রধান মনছুর খালেদ জানান, কারখানাটি অনুমোদন চেয়ে বিজিএমইএ’র কাছে কোন আবেদন করেনি। তারা বিজিএমইএ’র অনুমোদন নেয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শিকদার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেঝেতে লাশগুলোকে ঘিরে স্বজনদের আহাজারি। স্বজনদের প্রশ্ন আর কত মানুষ লাশ হবে পোশাক কারখানায়?
এদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী ও ঐ এলাকার সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ঘটনাস্থলে গিয়ে আহত ও নিহতদের স্বজনদের সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হবে। মালিকের গাফিলতি থাকলে সরকার ব্যবস্থা নেবে। ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে তাত্ক্ষণিকভাবে নিহত প্রতি ২০ হাজার টাকা সহায়তার ঘোষণা দেন। তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী এ মুহূর্তে চট্টগ্রামে রয়েছেন প্রতি মুহূর্তের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা জানিয়েছেন।
অপরদিকে কারখানা এবং শিকদার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে আইজিপি বলেন, আবাসিক এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে ওঠা গার্মেন্টস কারখানা উচ্ছেদ করা হবে। তিনি আরো বলেন, এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা শুধুই শর্ট সার্কিট থেকে নাকি নাশকতা তাও খতিয়ে দেখা হবে।
