কমলাপুর-জয়দেবপুরে রেলপথে বেপরোয়া ছিনতাই চক্র

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:৩৩
চলন্ত ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আবার অজ্ঞাত এক যুবককে (২৪) হত্যা করেছে ছিনতাইকারীরা। তার পরনে রয়েছে বিস্কুট রংয়ের জিন্সপ্যান্ট ও ছাই রংয়ের ফুলহাতা শার্ট। মৃতদেহ পড়ে আছে গাজীপুর সদর হাসপাতাল মর্গে। ঘটনাটি ঘটেছে শনিবার ভোরে টঙ্গী রেলওয়ে ব্রিজ এলাকায়। এ নিয়ে গত ৫ মাসে ট্রেনের বিভিন্ন রুটে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে ৪০ জন যাত্রীকে। আর গত এক মাসে কমলাপুর-জয়দেবপুর ট্রেন লাইনে ফেলে ৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। আহতের সংখ্যা এক নারীসহ ৬ জন। তবে জিআরপি পুলিশের দাবী সাম্প্রতিক সময়ে পকেট মার ও ছিনতাইকারীর দৌরাত্ম্য অনেকাংশে কমেছে। রেলওয়ের ডিআইজি মোহাম্মদ সোহরাব হোসেন বলেন, যুবকের লাশ ট্রেন লাইনের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। ট্রেন থেকে ফেলে দেয়া হয়েছে এমন কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে টঙ্গী থানায় মামলা হয়েছে। তবে বিষয়টি তদন্তের জন্য তিনি নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, রেলওয়ে পুলিশের জনবল সংকট থাকায় প্রতি ট্রেনে পর্যাপ্ত পুলিশ দেয়া সম্ভব নয়। এ কারনেই শুধু রাতের ট্রেনগুলোতেই পুলিশ থাকে। ছিনতাইকারী ও পকেটমারের ব্যাপারে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময় বেশ কয়েকটি চক্রকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অপরাধপ্রবণ এলাকা ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। টঙ্গী থানা পুলিশ জানায়, গতকাল ভোর সাতটার দিকে টঙ্গী রেলওয়ে ব্রীজ এলাকায় কে বা কারা ট্রেন থেকে ওই অজ্ঞাত যুবককে ফেলে দেয়। এতে ঘটনাস্থলে ঐ যুবক নিহত হয়। খবর পেয়ে টঙ্গী মডেল থানার সাব-ইন্সপেক্টর শাহীন শেখ ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে যুবকের লাশ উদ্ধার করে গাজীপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। নিহতের বাম হাত ভাঙ্গা ছিল। সাব-ইন্সপেক্টর শাহীন শেখ বাদী হয়ে টঙ্গী মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তার কোন পরিচয় পাওয়া যায়নি। টঙ্গী জিআরপি ফাঁড়ির ইনচার্জ এমদাদুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অজ্ঞাত যুবককে ট্রেন থেকে ফেলে দেয়ার ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না। তবে তিনি দাবি করেন, যুবককে ট্রেন থেকে ফেলে দেয়া হয়নি। অপর এক প্রশ্নের ব্যাপারে তিনি জানান, ট্রেনে কোন পকেটমার নেই। তবে কথা বলার সময় তার পাশেই বসা ছিলেন এলাকার চিহ্নিত এক পকেটমার সর্দার। বিমানবন্দর জিআরপি ফাঁড়ির ইনচার্জ নজরুল ইসলাম জানান, তার এলাকায় পকেটমার বা ছিনতাইকারী আগে ছিল, বর্তমানে নেই। গত ২৩ ডিসেম্বর তেজগাঁও রেলস্টেশনের কাছে দুই বস্ত্র প্রকৌশলী মাজহারুল ইসলাম ও গোলাম মোর্শেদকে ছিনতাইকারীরা চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেয়। ভাগ্য ভাল তারা মারাত্মক আহত হয়েও বেঁচে যান। এই দুই প্রকৌশলী ঘটনার দিন সকালে গাজীপুর যাওয়ার জন্য কমলাপুর থেকে ট্রেনে উঠেছিলেন। ছিনতাইকারী সবার সামনে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাদের কাছে থাকা মালামাল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। বাধা দিলে ছিনতাইকারীরা তাদের গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। এক পর্যায় ছিনতাইকারীরা তাদেরকে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেয়। পরে পথচারীরা তাদেরকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। একইভাবে গত ১৭ ডিসেম্বর পদ্মা এক্সপ্রেসে ট্রেনের যাত্রী শারমিন সুলতানা ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছিলেন। গত ২৮ ডিসেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুরের গাড়ারন এলাকায় পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সের অজ্ঞাত পরিচয়ের এক ব্যক্তিকে ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে হত্যা করা হয়। আর অধিকংশ ঘটনায় ছিনতাইকারীরা রয়েছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। অভিযোগ রয়েছে, ট্রেনে যারা ছিনতাই ও পকেটমারে জিআরপি পুলিশের কতিপয় সদস্য তাদের পরোক্ষভাবে সহায়তা দিয়ে থাকে। আর এ কারণেই অপরাধীরা একের পর এক ঘটনা ঘটাচ্ছে। প্রাপ্য তথ্য থেকে জানা যায়, টঙ্গী ও বিমানবন্দর রেলস্টেশনে একাধিক সক্রিয় পকেটমার চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ রেল যাত্রীরা। এদের সীমানা টঙ্গী থেকে কমলাপুর পর্যন্ত। আর মূল আস্তানা বিমানবন্দর রেলস্টেশন। এদের মধ্যে রয়েছে টঙ্গীতে আম্মাজান চাপাতি গ্রুপ সর্দার সুমন ওরফে মাক্কু সুমন, গামছা পার্টির সর্দার হাবিব, জহির ও মনির। এরা টঙ্গী থেকে কমলাপুরগামী ট্রেনের মধ্যে যাত্রীদের কাছ থেকে গলায় গামছা দিয়ে সর্বস্ব ছিনিয়ে নিয়ে যায়। কোন যাত্রী প্রতিবাদ করতে চাইলে তাদের চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেয়া হয়। রয়েছে মলম পার্টি গ্রুপ। এ গ্রুপে রয়েছে জামালপুরের চাঁন মিয়া ওরফে মেম্বর। চাঁন মিয়া দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে মলম পার্টির সাথে জড়িত। তার রয়েছে ১০ জন সক্রিয় সদস্য। এছাড়া বিমানবন্দরে রয়েছে থাপ্পা পার্টি। এই পার্টির মূল হোতা সাজু ওরফে থাপ্পা সাজু। এর কাজ সাধারণ যাত্রীদের শরীরে বিনা কারণে থাপ্পর মেরে দ্বন্দ্ব তৈরি করা। এরপর ৪/৫ জন সদস্য মিলে ট্রেনের টয়লেটের ভিতরে টেনে নিয়ে তাদের কাছ থেকে মোবাইল ও নগদ টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। পাশাপাশি বিমানবন্দরে আরো একটি সুন্দরী মহিলা প্রতারকচক্র কাজ করে থাকে। তারা দামি পোশাক পরে উন্নতমানের লাগেজ নিয়ে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর যাওয়ার জন্য ভিআইপি বগিতে উঠে বসে। নিজের লাগেজটি রেখে অন্যের লাগেজ নিয়ে তেজগাঁও রেলস্টেশন এলাকায় নেমে যায়। এই দলের মূল হোতা সুন্দরী রিজিয়া আক্তার ও সানু ওরফে সিলেটি সানু। এছাড়াও ট্রেনে ছিনতাই চক্রের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে রয়েছে টঙ্গীর কসাই আলমগীর, বোমা মাসুদ, জয়, পুবাইলের আউয়াল, রাশেদুল, রুবেল, শাওন প্রমুখ। ভুক্তভোগী একাধিক ট্রেনযাত্রী জানিয়েছেন, রাত যত বাড়ে ততই ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠে। তাদের টার্গেট আন্তঃনগর মেইল ও লোকাল ট্রেন। তারা এতই শক্তিশালী যে অনেক সময় প্রকাশ্যে অস্ত্র ঠেকিয়ে সর্বস্ব কেড়ে নেয়। বাধা দিলেই ছুরিকাঘাত। অনেক ক্ষেত্রে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করে। রেলওয়ে পুলিশ বা টিটিদের (ট্রেনের টিকেট পরিদর্শক) জানালেও তারা থাকেন পুরোপুরি নির্বিকার। তারা নানা অজুহাত দেখান। রেলের যাত্রী উসমান কবির জানান, তিনি জামালপুর থেকে টঙ্গী আসা পর্যন্ত তার মানিব্যাগ সাথে ছিল। বিমানবন্দর নামার পরই দেখেন ম্যানিব্যাগ নেই। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, টঙ্গী থেকে বিমানবন্দর পর্যন্তই পকেটারমারদের দৌরাত্ম্য সর্বাধিক। কোন অভিযোগ নিয়ে জিআরপি বিমানবন্দর ফাঁড়িতে গেলে কোন ধরনের সহায়তা পাওয়া যায় না।