কেন এই অস্থিরতা কীভাবে বন্ধ হবে!

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫১
এই দেশমাতৃকার সন্তান আমরা সবাই। একই রাষ্ট্রে আমাদের বেড়ে ওঠা, বেঁচে থাকা। সার্বভৌমত্বের অনিবার্যতা মেনে নিলে, আমরা সবাই যূথবদ্ধ পদচারণায় বিশ্বাসী। কিন্তু প্রতিদিনের মনুষ্যনির্মিত দুর্ঘটনাগুলো এই সৌহার্দ্যের বাণীকে আঘাত করে বিপুল শক্তিতে। নির্যাতনের ঘনঘটা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ছোটবেলা থেকে জেনেছিলাম ‘কাকেও নাকি কাকের মাংস খায় না’। কিন্তু মানুষের বর্বরোচিত চেহারা এইসব মহত্ প্রবাদকে ভুলিয়ে দেয়। এক একটি ঘটনার ভয়ঙ্কর বিবৃতি যখন সামনে হাজির হয়, তখন থমকে দাঁড়ায় সমস্ত মানবিক সত্তা। নারীর ওপর নির্যাতন যেন পরিণত হয়েছে নৈমিত্তিক ঘটনায়। বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন পরিবেশে এর বিচিত্র বীভত্স প্রকাশ। সবসময়, সকল স্তরের নারীরা ঘরে কিংবা বাইরে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে গেছে এমনই কিছু বীভত্স ঘটনা। নারী নির্যাতন কেনো ঘটছে, কীভাবে তা রোধ করা যায় সেই বিষয় নিয়ে বিশিষ্টজনদের সাথে কথা বলে আমাদের আজকের পৃষ্ঠজুড়ে আয়োজনটি সাজানো হয়েছে। ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলাম আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ অস্থিরতার কারণে হঠাত্ করে নারী নির্যাতন বেড়ে গেছে। অপরাধ সহনের অপসংস্কৃতিতে অভ্যস্থ হয়ে গেছি আমরা। আমাদের সকলেরই এক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব আছে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে অপরাধকে না বলতে হবে। সমাজের এই অবস্থা প্রমাণ করে আমরা আজও সভ্য হতে পারিনি। দুইভাবে এই অপরাধ প্রতিরোধ করতে হবে। এক. সামাজিকভাবে তাদের ঘৃণা করতে হবে এবং দ্বিতীয়ত দ্রুত গতিতে আইনী প্রক্রিয়া শেষ করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু আমাদের বিচার ধারাবাহিকতা, তদন্ত পক্রিয়া নিখুঁত নয়। ফরেনসিক বিভাগগুলো অত্যাধুনিক করার পাশাপাশি প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। এখানে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার ব্যবহার করে দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও সততার বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ এক্ষেত্রে বরাবরই অভিযোগ পাওয়া যায়। খুলনার শ্রাবণী হত্যা ঘটনায় পিপি’র বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দলমত নির্বিশেষে সকলের ঊর্ধ্বে উঠে সত্ ও দক্ষ ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় বার এবং স্থানীয় বিচারকদের অভিমতের গুরুত্ব দিয়ে পিপি নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। --- শফিক আহমেদ আইনমন্ত্রী নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে, এর অর্থ এই না যে আইনের অভাবে এমনটি হচ্ছে। আমাদের আইনগুলো সবই সঠিক এবং যথাযথ রয়েছে। এক্ষেত্রে পুলিশের কিছুটা গাফিলতি রয়েছে। আদালতে মামলা করা হলে তদন্তকারী পুলিশের তদন্তের ভিত্তিতে এবং আদালতের সাক্ষীসবুদ উপস্থাপনের মাধ্যমে আসামিকে সাজা প্রদান করা হয়। এক্ষেত্রে যদি পুলিশ আসামিকে না ধরে কিংবা সঠিকভাবে তদন্তকাজ না করে তাহলে আইন দিয়ে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা যায় না। মামলা করা হলে তার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা যেমন তদন্ত, সাক্ষীসবুদের অভাব কিংবা প্রভাবশালীদের প্রভাব মামলাকে প্রভাবিত করে এবং কোনো কোনো সময় আসামি পার পেয়ে যায়। আসামির শাস্তি নিশ্চিত করতে পুলিশের তদন্তের ভূমিকা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কোথাও তদন্তের গাফিলতি থাকলে তার দায় পুলিশের উপরই বর্তায়। ---- আব্দুল জলিল মন্ডল অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, অপারেশন এন্ড ক্রাইম তদন্ত মনোপুত না হলে আসামি অথবা বাদী পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। কিন্তু তদন্ত তো কারো না কারো পক্ষে এবং অন্য কারো বিপক্ষে যাবে। বরাবরই পুলিশের সততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু পুলিশ তদন্ত করে তথ্য আদালতে জমা দেয়ার পর আমাদের আর কিছু করার থাকে না। সেক্ষেত্রে আদালত বিচারকার্য সমাধা করে। কিন্তু দোষটা এসে পড়ে পুলিশের ঘাড়ে। পুলিশ সামাজিকভাবে ধিক্কারের শিকার হয়। আমি জোর দিয়ে বলতে চায় বাংলাদেশের প্রত্যেক শ্রেণি-পেশার মানুষ কতোটা সত্ তার একটা পরিসংখ্যান থাকা প্রয়োজন। পুলিশ তার বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো প্রতিবাদ করতে পারে না। সেই জন্য ঢালাওভাবে পুলিশকে দায়ী করা যেমন ঠিক না তেমনি কোনো কোনো পুলিশ যে তার কাজে গাফিলতি করে না তাও বলা যাবে না। তদন্ত কাজে পুলিশ সম্পূর্ণ স্বাধীন। এমনকি হাইকোর্টও তদন্তাধীন কোনো মামলার বিরুদ্ধে নির্দেশ দিতে পারে না। তদন্তকারী অফিসারের উপর চাপ থাকতে পারে, তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সমাজপতির চাপ থাকে। সেক্ষেত্রে তদন্তকারী অফিসার যদি এ ধরনের চাপে বশ্যতা শিকার করে তাহলে তার বিরুদ্ধেও শাস্তির বিধান আছে। ----- অধ্যাপক আবদুল্লাহ্ আবু সায়ীদ সভাপতি, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র সুস্থ বিনোদন ও সংস্কৃতির অভাবে তরুণ সমাজ অস্থির হয়ে উঠেছে। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া অপরাধের বিচার না হওয়া দেখে অন্যকে অপরাধ ঘটাতে উত্সাহিত করছে। এটি যেমন একটি প্রধান কারণ তেমনি আরেকটি কারণ হলো সুস্থ বিনোদন ও সংস্কৃতির অভাবে দুর্বল মানসিকতার মানুষ তৈরি হচ্ছে। দুর্বল মানুষ পৈশাচিক এবং হিংস্র হয়। তারা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। অন্যকে পেতে দেখে নিজে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে পড়ে। অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। সমাজের এই অবস্থা পরিবর্তন হলে অনেক অপকর্মের সাথে নারী নির্যাতনও কমে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। ----- সারা জাকের নাট্যব্যক্তিত্ব ও সমাজকর্মী আমাদের একটি বিষয় বুঝতে হবে, এই ধরনের ঘটনা কী আসলেই বাড়ছে নাকি আমাদের সামনে মিডিয়ার কল্যাণে বেশি বেশি আসছে সেটি দেখতে হবে। আমাদের দেশের মিডিয়া এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন এবং তাদের দৃষ্টিতে এ ধরনের ঘটনা এড়িয়ে যায় না। নারীরা বাইরে যেমন নির্যাতিত হচ্ছে তেমনি ভালো নেই ঘরের মধ্যেও। ঘরে পরিবারের মানুষের দ্বারাই নারী নির্যাতনের শিকার হয় বেশি। কিন্তু এই ধরনের ঘটনা আমাদের সামনে তেমন করে আসে না। ঘরের মধ্যে নির্যাতন কিংবা বাইরে ধর্ষণ বা এই ধরনের যাবতীয় ঘটনা থেকে আমাদের নারীদেরকে মুক্ত করতে চাইলে সবার আগে প্রয়োজন আমাদের সকলের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি এবং নারীদের সম্পর্কে আমাদের চিন্তাধারায় পরিবর্তন জরুরি। আর যারা মানবাধিকার কর্মী আছেন তাদের খেয়াল রাখা উচিত যাতে এরকম কোনো ঘটনা ঘটলে দু-একদিন মানববন্ধন বা এরকম কোনো কর্মসূচি দিয়ে বসে থাকলে চলবে না। আইনী লড়াইয়ের পাশাপাশি মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টিতেও তাদের অগ্রণী ভূমিকা থাকতে হবে। ---- এলিনা খান নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশন গত সপ্তাহের মাঝামাঝি মানিকগঞ্জে বাসে এক গার্মেন্ট শ্রমিককে ধর্ষণ করা হলো। এই ধরনের ঘটনা একেবারে নতুন না। গত কিছুদিন ধরে আমাদের দেশে এই ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটেই চলেছে। খবরের কাগজ খুললেই ধর্ষণ এবং গণধর্ষণের ঘটনা প্রায়শই চোখে পড়ে। এটি দুঃখজনক। আমাদের দেশে আইন এই ধরনের ঘটনার প্রতিকারের জন্য যথেষ্ট শক্ত। কিন্তু আসল দুর্বলতাটা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে। আইন অনুযায়ী ধর্ষণ বা এই ধরনের ঘটনা ঘটার ১২০ দিনে মামলা শেষ করার কথা এবং ৯০ দিনে তদন্ত শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু দেখা যায় প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে প্রথমে কিছুদিন মানুষজন এবং আমাদের মিডিয়া সোচ্চার থাকে এবং যথারীতি দিন অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে সেটা থেমে যায়। মামলার খোঁজ রাখে না কেউ। ছাড়া পেয়ে যায় অপরাধী। এই সংস্কৃতির পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। এছাড়া মামলার দীর্ঘসূত্রিতা এবং প্রভাবশালীর নেক নজরে পড়ার কারণে মামলা আর আগাতে পারে না। ধর্ষণ বা এই ধরনের ঘটনাগুলো রোধ করতে হলে পরিবার থেকে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। রাস্তাঘাট নির্মাণের পাশাপাশি স্থানীয় সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে। স্থানীয়ভাবে শালিসী বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে কঠোর হলে গ্রামাঞ্চলে এই ধরনের ঘটনা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। ----- তাসমিমা হোসেন সম্পাদক, পাক্ষিক অনন্যা; মানবাধিকার কর্মী নারীর প্রতি পুরুষের সহিংসতা পূর্বেই ছিলো আজও আছে। ইদানিং এর রূপ ক্রমাগতই বীভত্স আকার ধারণ করছে যা রীতিমত ভয়াবহ। বিগত এক দশক ধরে বাংলাদেশে নারী শিক্ষা এবং নারী অধিকারের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটছে; নারীরা তাদের স্বকীয়তাকে প্রবলভাবে প্রতিষ্ঠিত করছেন। সেই সাথে অর্থনীতি মুক্তবাজার ভিত্তিক হয়ে ওঠায় সেখানেও মেয়েদের পদচারণা আজ পুরুষদের চোখে হয়ে উঠেছে ঈর্ষণীয়। এই যে মেয়েরা আজ এতোকালের পুরুষের একাধিপত্যভুক্ত এলাকায় প্রবেশ করছে সেটা পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। পুরুষ তার সনাতন ধারণার কারণে নারী যে পরিপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠতে পারে সেটা মেনে নিতে পারছে না। আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস এই ধারণা যতোদিন না পাল্টাবে ততোদিন সহিংসতা কমবে না। পরিবার থেকে আজ সচেতনতার শিক্ষা শুরু করতে হবে। আর আইনী ব্যবস্থায় সচ্ছতা আনতে হবে, দুর্নীতি দূর করতে হবে। পুলিশের ভূমিকা দৃঢ় করতে তাদের জন্য নারী পুরুষ সমতাভিত্তিক আরো সচেতনতা মূলক ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বোপরি সরকার যদি সত্যি সত্যি চায় এ দেশের নারীদের পাশে দাঁড়াতে তবে তার সদিচ্ছার কথা ঘোষণা দিয়ে নারীদের পাশে দৃঢ় আইন নিয়ে এসে দাঁড়াক। এছাড়া আইনজীবীদের উচিত ধর্ষণকারীর পক্ষে কোনো মামলা লড়া থেকে বিরত থাকা। ----- ব্যারিস্টার সারা হোসেন আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী আসলে নারী নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে আমাদের দেশে সেভাবে কোনো পরিসংখ্যান নেই। তাই সঠিকভাবে আমরা বলতে পারি না যে নারীর উপর নির্যাতনের মাত্রা কি পরিমাণে বেড়ে যাচ্ছে। এটাও বলা যায় না যে নারী আগের তুলনায় কম নির্যাতিত হচ্ছে। কারণ প্রতিদিন পত্রিকা খুললেই আমরা নারী নির্যাতনের ঘটনা দেখি। আবার পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে আমাদের দেশে যতোজন নারী নির্যাতিত হচ্ছে তার মধ্যে মাত্র ২ শতাংশ বিচারের জন্য পুলিশের দারস্থ হচ্ছেন। নিরব থেকে নির্যাতন সহ্য করে যাচ্ছেন। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন জরুরি। এই ধরনের নির্যাতনের পেছনে কারণ হিসেবে কাজ করে সামাজিকভাবে নারীকে ছোট করে দেখা, নারীর প্রতি সম্মান না থাকা। এছাড়া আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপরও দায় বর্তায়। নারী নির্যাতন এবং ধর্ষণের মতো ঘটনা এড়াতে যেমন কঠোর আইন থাকা প্রয়োজন তেমনি এই আইনগুলোকে বাস্তবায়িত করা অতীব জরুরি। ----- তানিয়া হক বিভাগীয় চেয়ারম্যান, উইমেন এণ্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, ঢাবি নারী নির্যাতন বৃদ্ধির মূল কারণ লিঙ্গ বৈষম্য। কিছুদিন আগে ছিল এসিড নিক্ষেপ। তারপর ইভটিজিং, এরপর ধর্ষণ আর এখন মাত্রা আরো বেড়ে হল গণধর্ষণ। এছাড়া পারিবারিক নির্যাতনের ব্যাধিতো আছেই। আমাদের নারীরা এখন ঘর মুখো নয়। সমাজের অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কর্ম তত্পরতা লক্ষণীয়। এ বিষয়টিই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার মাথা ব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সচেতন এবং অচেতন দুভাবেই তারা নারী নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া এর পেছনে আরো দুটি মৌলিক কারণ আছে। সেটা হল আমাদের দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক আচরণ। নারীর উপর নির্যাতন বন্ধে আমাদের প্রশাসনের কথা বলতে গেলে প্রথমেই চলে প্রশাসনের নিজের সমস্যাগুলোর কথা। নানা সমস্যায় জর্জরিত আমাদের প্রশাসন। তাই প্রশাসনের থেকে সহযোগিতা পাওয়া তো যায়ই না বরং দেখা যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের সহায়তায়ও অনেক নারী নির্যাতনের সম্মুখীন হচ্ছে। অথবা প্রশাসন বিষয়গুলোকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে আকাশ সংস্কৃতিরও একটা প্রভাব আছে নারীর উপর এ ধরনের হয়রানির ক্ষেত্রে। আর নারীর উপর সহিংসতা রোধে আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব একটা দায়বদ্ধতা তো অবশ্যই আছে। তবে আমার মনে হয় নারী নির্যাতনকারী বিশেষ করে ধর্ষককে প্রথমত পরিবার থেকে বঞ্চিত করা উচিত। ঘুরে ফিরে দেখা যাচ্ছে ধর্ষককে পরিবারই আশ্রয় দেয়। এটা তার অন্যায় করার প্রশ্রয় সৃষ্টি করে। ধর্ষকের কোন আশ্রয় থাকতে পারে না। সে সবার কাছেই অপরাধী। এরপর সামাজিক এবং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা দরকার। ‘পথের শেষ কোথায়? কী আছে শেষে?’- এ প্রশ্ন চলছে দিনের পর দিন মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। কিন্তু এর উত্তর ভিন্ন গ্রহের কোন প্রাণী এসে জানাতে পারাবে না আমাদের। আমরাই কেবল এর জোরদার সমাধানের পথে এগোতে পারি। একটি দুর্ঘটনা ঘটে যাবার পর প্রতিবাদ, স্মারকলিপি, মিছিল, মানববন্ধন জাগিয়ে তোলে জনতাকে। ফলস্বরূপ- আইন প্রয়োগ, বিচার এবং অপরাধীর শাস্তি। কিন্তু একটি কথা খুব ভালোভাবে অনুভব করা প্রয়োজন যে, এই প্রতিবাদগুলো কেবল সমসাময়িক ঘটনার প্রতিক্রিয়া হয়ে যেন না থাকে। একটি দুর্ঘটনার পর অসংখ্য মিছিল-মিটিং-সমাবেশের পরও কেন আরও একটি দুর্ঘটনা ঘটে? ভবিষ্যত্ অপরাধীরা তাদের পূর্বসূরিদের শাস্তি দেখেও নিজেদের শুধরে নিতে পারছে না কেন? এর প্রধান কারণ মূল্যবোধ। মানুষের প্রতি যদি মানুষের শ্রদ্ধা থাকে, তবে ন্যূনতম অপরাধেও তার হ্নদয় কখনো সম্মতি দেবে না। পরিবার, প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম- প্রত্যেকেরই নিজ নিজ অবস্থানে থেকে এই মূল্যবোধ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হবে। ------- মাহফুজা খানম সভাপতি, বিশ্ব শিক্ষক সমিতি পুঁজিবাদী সমাজ নারীকে পণ্য হিসেবে দেখছে। ধনতান্ত্রিক দেশে মুনাফার জন্য মানবিক দর্শন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের জন্য নারীর উপরে এই বিপর্যয় নেমে এসেছে। রাজনীতি মানেই সমাজ সেবা। কিন্তু বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন যারা বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, ছষট্টির ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম এমনকি নব্বইয়ের এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিল তারাই আজ নিজেদের আদর্শ থেকে সরে এসেছে এবং নানাভাবে বিভিন্ন অপকর্মের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের হাত থেকে নারীরা রেহায় পাচ্ছে না। ছাত্রী-শিক্ষকের সম্পর্ক বাবা-মেয়ের মতো। আজ এই সম্পর্কও দূষিত হচ্ছে। শিক্ষকের হাতে ধর্ষিত হচ্ছে ছাত্রী। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের সদস্য। আমাদের যে তদন্তগুলো করতে হয় তার বেশিরভাগই নারীর প্রতি যৌন হয়রানিমূলক। ভালো রেজাল্টকে ভিত্তি করে শিক্ষক-ছাত্রী সম্পর্ককে কলুষিত করছে, তদন্তের আয়োজন করতে হচ্ছে তাদেরকে নিয়ে। আমাদের বেশিরভাগ তদন্তই হচ্ছে নারী নির্যাতনকেন্দ্রিক। ৪১ বছর পার করেও আমরা সঠিক গণতন্ত্রের চর্চা করতে পারছি না। অপরাধ করে অপরাধী পার পেয়ে যাচ্ছে। আইনের শাসন যা সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। নিজেদের ক্ষমতা ও মর্যাদাকে রক্ষা করতে হবে তরুণীদেরকেই। তেমনি সামাজিক ন্যায় বিচার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কেউ যাতে নারীর উপর কোনো ধরনের অত্যাচার করতে না পারে সেই বিষয়ে সচেতন হতে হবে প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে। কি ক র ণী য় ++ সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে অপরাধকে না বলতে হবে। ++সামাজিকভাবে তাদের ঘৃণা করতে হবে এবং দ্বিতীয়ত দ্রুতগতিতে আইনী প্রক্রিয়া শেষ করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ++ফরেন্সিক বিভাগগুলো অত্যাধুনিক করার পাশাপাশি প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। ++আসামীর শাস্তি নিশ্চিত করতে পুলিশের তদন্তের ভূমিকা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ++দুর্বল মানুষ পৈশাচিক এবং হিংস্র হয়। ++পরিবারের মানুষের দ্বারাই নারী নির্যাতনের শিকার হয় বেশি। ++সবার আগে প্রয়োজন আমাদের সকলের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি এবং নারীদের সম্পর্কে আমাদের চিন্তাধারায় পরিবর্তন জরুরি। ++পাশাপাশি স্থানীয় সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে। স্থানীয়ভাবে শালিসী বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। ++পরিবার থেকে আজ সচেতনতার শিক্ষা শুরু করতে হবে। আর আইনী ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে হবে, দূর্নীতি দূর করতে হবে।