কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী গ্রাম সাগরদাঁড়ী, জেলা যশোর। এই গ্রামেই এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মধুসূদন দত্ত ২৫ জানুয়ারি ১৮২৪। পিতা রাজ নারায়ণ দত্ত ছিলেন পেশায় আইনজীবী। মাতা জাহ্নবী দেবী। মধূসুদন এর বয়স যখন সাত বছর তখন তাঁর পিতা সপরিবারে কলকাতায় বসবাস করতে থাকেন। মধূসুদন ভর্তি হলেন কলকাতার হিন্দু কলেজে। এ কলেজে পড়ার সময়ই কিশোর মধুসূদনের মধ্যে তৈরি হয় পাশ্চাত্যপ্রীতি। মেধাবী মধূসুদন ইংরেজিতে কবিতা লিখতেন এবং একসময় নারী শিক্ষা বিষয়ক প্রবন্ধ লিখে পেলেন প্রথম পুরস্কার, একটি স্বর্ণপদক। হঠাত্ করেই মধূসুদন ধুতি ছেড়ে আচকান-পায়জামা ধরলেন। তারপর সোজাসুজি সাহেবি কোট-প্যান্ট। ইংরেজি সাহিত্যে খ্যাতি পাবার মোহ তাঁকে পেয়ে বসলো। উচ্চাভিলাষী মধুসূদন যশ, খ্যাতি, সাফল্য পাবার জন্য এতটাই মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন যে স্বধর্ম, স্বদেশ, স্বজাতি, স্বজন ত্যাগ করে খ্রীষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হন। পিতার সাথে তাঁর একসময় সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। শ্রী মধুসূদন দত্ত হয়ে যান মাইকেল মধুসূদন দত্ত। জমিদার-পুত্র মধুসূদন বাধ্য হয়ে ভাগ্য অন্বেষণে মাদ্রাজে যান এবং সেখানে এক অনাথ আশ্রমে শিক্ষকতা করতে থাকেন। মাদ্রাজ গমনের তিন বছর পর তাঁর মাতৃবিয়োগ ঘটে। এরপর পারিবারিক সম্পর্ক প্রায় একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিনি মাদ্রাজে অরফ্যান এসাইলামের বালিকা বিভাগের ছাত্রী রেবেকা ম্যাকটাভিসকে বিয়ে করেন। কিন্তু মধূসুদন-রেবেকার দাম্পত্য জীবন খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। এসময় পরিচয় হয় হেনরিয়েটার সঙ্গে। একটা অতৃপ্তি এবং কামনা তাঁকে শৃঙ্খলাহীন চাঞ্চল্যে সমর্পিত করে। মধূসুদন একসময় রেবেকা এবং সন্তানদের ছেড়ে হেনরিয়েটাকে সঙ্গী করে নেন। মধূসুদন প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য সাহিত্য-সংস্কৃতির বিশাল ভুবনে পরিভ্রমণ করেছেন। অর্জন করেছেন সংস্কারমুক্ত চেতনা। তাঁর আহরিত রূপ-রুচি-সৌন্দর্য-শিল্প বিভিন্ন বিষয় বাংলা সাহিত্যের গতানুগতিক আঙ্গিকে নিয়ে আসে নবতর শিল্প-সুষমা। মাদ্রাজে প্রবাসকালে হিব্রু, ফরাসি, জার্মান, ইটালিয়ান, তামিল ও তেলেগু ভাষা শিক্ষা করেন। ‘টিমোথি পেনপোয়েম’ ছদ্মনামে ইংরেজিতে লিখতে থাকেন। এছাড়া ‘ক্যাপটিভ লেডি’ (১৮৪৯) কাব্য রচনা করেন। পিতামাতার মৃত্যুর পর কলকাতায় চলে আসেন। এসময় বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয় এবং বাংলা ভাষার সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। পাশ্চাত্য রীতিতে রচনা করেন ‘শর্মিষ্ঠা’ (১৮৫৮) নাটক।
ইংরেজি শিক্ষিত ইয়ং বেঙ্গলদের উচ্ছৃঙ্খলতা ও অনাচারকে ব্যঙ্গ করে লিখেন ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ (১৮৫৯) এবং প্রাচীনপন্থি রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের গোপন লাম্পট্যকে পরিহাস করে লেখেন ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ (১৮৫৯) প্রহশন দু’টি। তিনি প্রথম বাংলা সাহিত্যে ‘কৃষ্ণকুমারী’ নামে ট্র্যাজেডি নাটক রচনা করেন। এছাড়া ‘তিলোত্তমাসম্ভব’, ‘ব্রজাঙ্গনা’, ‘বীরাঙ্গনা’, ‘পদ্মাবতী’, ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’ প্রভৃতি রচনা করেন। মাইকেল মধূসুদন দত্তের সাহিত্য সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ (১৮৬১)। এটি সাহিত্যিক অসুস্থতার কারণে, ঋণের বোঝায় শেষ জীবন অশান্তিময় হয়ে ওঠে এবং কপর্দকহীন অবস্থায় কলকাতা জেনারেল হাসপাতালে পরলোক গমন করেন ২৯ জুন ১৮৭৩।
