শ্লীলতাহানি, অ্যাসিড নিক্ষেপ ও শিশু অপহরণ

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৪০
বর্তমান সময়ে অ্যাসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণ আর যৌতুকের শিকার হচ্ছে অসংখ্য নারী। শিশু অপহরণ ও গৃহপরিচারিকার উপর অমানুসিক নির্যাতন প্রতিদিন বেড়েই চলছে। ধর্ষণ ছাড়াও নারীরা প্রতিনিয়ত নিঃগৃহীত হচ্ছে। তারা তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। নারী জাতির এক বৃহত্ অংশ গার্হস্থ্য জীবনের চৌহদ্দিতে থাকে আবদ্ধ। নারীরা অনেক সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদহীন ও নির্লিপ্ততার পথ বেছে নেয়। মান-সম্ভ্রম হারিয়েও মুখ খোলে না কারো কাছে। অনেক সময় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় নীরবে। চার-পাঁচ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৫০ বছরের বৃদ্ধাও শিকার হয় ধর্ষকের হাতে। ২০১২ সালে এককভাবে অথবা গণধর্ষণের শিকার হয় ১৯০ শিশু-কিশোরী। তাছাড়াও ৫০ জন শিশু-কিশোরী যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন হয়রানির পর আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। ঢাকার কাছে মানিকগঞ্জ। মানিকগঞ্জ ঘিওর উপজেলা কলেজের ছাত্র সুজন ও তার তিনবন্ধু প্রথমে অটোরিক্সায়, পরে ভুট্টাখেতে ধর্ষণ করতে নিয়ে যায় এক তরুণীকে। মেয়েটির চিত্কারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে তারা পালিয়ে যায়। শেষতক ধরা পরে সে। সুজনের রিমান্ড শেষে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সাক্ষ্যর অভাব ও টাকার জোড়ে ছাড়া পেয়ে যাবে সুজন একদিন। গার্মেন্টস কর্মী সাভার থেকে ফরিদপুরের গ্রামের বাড়িতে যাবার পথে আরিচাগামী বাসে উঠে। পথে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখিয়ে অন্যান্য যাত্রীদের নামিয়ে দেয় এবং আংশিক ভাড়া ফেরত দেয়। মেয়েটি বিকল্প বাসের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। অকস্মাত্ বাসটি সেরে উঠে এবং তাকে পুনরায় উঠতে বলে। পালাক্রমে গাড়ি চালাতে চালাতে মানিকগঞ্জের রাস্তায় ধর্ষণ শেষে বাস থেকে ফেলে দেয়া হয় তরুণীকে। এটা যেন দিল্লির মেডিক্যাল পড়ুয়া ছাত্রী দামিনির বিকল্প কাহিনী। ঢাকার দক্ষিণ খানের আমতলা ব্রাক ক্লিনিকে প্রতিশ্রুতিশীল ডাক্তার সাজিয়া আফরিন ইভা সম্ভ্রম রক্ষা করতে খুন হয়েছেন একই ক্লিনিকের কেয়ারটেকার ফয়সাল (২২) এর হাতে। ঐ ভবন মালিক পুত্র বাবুও নানাভাবে উত্যক্ত করতো ডাক্তার ইভাকে। ঢাকা ডেন্টাল কলেজের ছাত্রীরা ইভটিজিং এর প্রতিবাদে ফুঁসে উঠছে, নেমেছে রাস্তায়। গাজীপুর সদরের এমপি সিমিন হোসেন রিমির এপিএস সাইফুল হাকিম মোল্লা গরিবের মেয়েকে কাজ দেয়ার নামে ধর্ষণ করে। পরে তার স্ত্রী নিরীহ মেয়েটিকে খুন্তিস্যাকা দিয়ে লুকিয়ে রাখে। খবর পেয়ে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক কৃষিবিদ মো: নুরুল ইসলাম এবং জেলা পুলিশ সুপার সশরীরে হাজির হয়ে নির্যাতিতাকে উদ্ধার ও সুচিকিত্সার ব্যবস্থা করেন। ভোলা জেলার বোরহান উদ্দিনের এক বধির মেয়েকে জোর করে ধর্ষণ করে সেই গ্রামের মেম্বার মাতুব্বর। বোবা মেয়েটি এখন পুরুষ মানুষ দেখলেই ভয় পায়। হতদরিদ্র পরিবারটি বিচার চেয়ে ফিরছে বাড়ি বাড়ি। সাভারে গার্মেন্টস কর্মী বিউটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা আসামির মৃত্যুদণ্ড রায় হয়েছে। আসামি পলাতক থাকায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন বছরে নীলফামারীতে এক যুবতীকে নির্যাতন করার পর তাকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ আছে আসামির খোঁজে। খাগড়াছড়িতে স্কুল ছাত্রীকে যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের দায়ে কলেজ ছাত্রকে ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক দেয়া হয়েছে মাত্র তিন মাসের কারাদণ্ড। মারমা কিশোরীকে ধর্ষণ করেছে দুর্বৃত্তরা। রাজধানীর পাইকপাড়ায় ২ গার্মেন্টস কর্মীকে ধর্ষণের পর একজনকে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে ২ জনের ফাঁসির আদেশ এবং প্রত্যেককে ১০ লাখ টাকা করে জরিমানা করেছে আদালত। বিবেকবান মানুষ অপেক্ষায় আছে যেন আপিলে ছাড়া না পায় অপরাধীরা। রাজবাড়ী ব্রাক স্কুলের প্রথম শ্রেণীর ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে রইস উদ্দিন। গ্রেফতারের পর টাকা ও স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে ছাড়া পেয়ে যায় রইস উদ্দিন। স্থানীয় বাসিন্দারা ফাঁসির দাবিতে আন্দোলন করছে। অনেক দিন অ্যাসিড মারা বন্ধ থাকার পর ২০১৩ সালে নতুন বছরে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং কৃষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষকদের গায়ে অ্যাসিড ছোঁড়ে ছাত্রলীগের কর্মীরা। তারা যেন অ্যাসিড মারার পুনঃযাত্রা শুরু করে। জোড় করে বিয়ে করার চেষ্টা প্রতিহত এবং কাজী অফিসে কবুলত নামায় স্বাক্ষর না করায় ইডেন কলেজে পড়ুয়া ছাত্রীকে ছুরিকাঘাত ও অ্যাসিড দগ্ধ করে মনির নামের এক সন্ত্রাসী। সরকারের এরূপ নির্লিপ্ততা দেখে একজন মানবাধিকার কর্মী মন্তব্য করেছেন এর থেকে জঘন্য শাসন ব্যবস্থা আর হতে পারে না। মনে হয় সাম্প্রতিক সময়ের খুন, ধর্ষণ, অ্যাসিড নিক্ষেপ ও শিশু হত্যার দেখভালের কেউ নেই। কেরানীগঞ্জে শিশু পরাগ অপহরণ, পার্বত্য জেলার কল্পনা চাকমাসহ দুই ভাইকে অপহরণ করে দুর্বৃত্তরা। শিশু পরাগের পরিবার এবং স্থানীয়রা বলছে, ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে তাকে ছাড় করানো হয়েছে। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের আইজিপি বলেছেন, পরাগের মুক্তির পূর্বে কোন প্রকার মুক্তিপণ দেয়া হয় নাই। কিন্তু মূল অপহরণকারী মোক্তার হোসেন আমীর স্বীকার করেছে মুক্তিপণের টাকা পেয়ে তিনি টঙ্গীতে জায়গা কিনে গৃহ নির্মাণ কাজ শুরু করেছেন। বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার ছবিতেও নির্মাণ কাজের ছবি ছাপা হয়েছে। কথিত আছে কল্পনা চাকমা এবং তার দুই ভাইকে যারা অপহরণ করেছিল তাদের মধ্যে ছিলেন একজন মেজর এবং দুইজন বিডিআর সদস্য। শিশু-নারী অপহরণসহ রাজনৈতিক অপহরণও দিন দিন বেড়েই চলেছে। নারী সমাজের কল্যাণে দেশে অনেক আইন প্রচলিত আছে। যেমন-যৌতুক বিরোধী আইন, নারী পাচার রোধ আইন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ আইন। তাছাড়াও রয়েছে আরো কিছু কঠোর ও দ্রুত আইন। শুধু প্রয়োগ ব্যবস্থায় রয়েছে দুর্বলতা। ভারতের দিল্লী ও পশ্চিমবঙ্গে ধর্ষণের বীভত্সতা দেখে উত্তর খণ্ডের রাজ্য সরকার সন্ধ্যার পর সবধরনের নারীদের চলাফেরায় সতর্কতা জারি করেছে। এদিকে বাংলাদেশে ছাত্রীরা আন্দোলন করে “সূর্যাস্ত আইন” গুলোকে বাতিল করেছে। অতি উত্সাহী বাঁধনের ন্যায় কিছু নারী ও সমাজ বিজ্ঞানী এবং মৌলবাদের কিছু ভুলের কারণে ধর্ষণ, খুন, নির্যাতন, অত্যাচার, অনাচার দিন দিন বেড়েই চলেছে। মুসলিম ও হিন্দু আইনে বাবার সম্পত্তিতে ছেলে ও মেয়ের অসম অধিকার। পারিবারিক আইন এবং জাতীয় সম্পদে অসম অধিকার, ভাই কর্তৃক বোনের সম্পদ নামে মাত্র মূল্যে গ্রাস, নারী সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার অবহেলা ইত্যাদি সমাজকে আরো বেশি কলংকিত ও কলুষিত করছে। ধর্ষক, এ্যাসিড নিক্ষেপ ও শিশু অপহরণকারীরা সমাজের চোখে অন্যায়কারী, আইনের চোখে অপরাধী, এদের অপরাধ আইনের দৃষ্টিতে অবশ্যই দণ্ডনীয়। বিবেকবান মানুষ হিসাবে এ জাতীয় অন্যায়ের প্রতিবাদ অবশ্যই করতে হবে। ধর্ষক, অ্যাসিড নিক্ষেপকারী, অপহরণকারী, যেই হোক না কেন দিনে দিনে তার শক্তি ও সাহস বাড়তে দেয়া কখনো কাম্য হতে পারে না। সমাজের মানুষ যখন প্রীতিহীন, মমতাহীন, মনুষ্যত্বহীন হয়ে অন্ধ থাকে তখন স্বজন হয়ে পড়ে অসহায় ও অবহেলিত। এরূপ অবস্থা চলতে থাকলে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বাড়তেই থাকবে এবং থমকে যাবে আন্তর্জাতিক নারীদিবস (৮ মার্চ), নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। আমাদের মনে রাখতে হবে নারীর উন্নতি মানে সমাজের উন্নতি এবং অগ্রগতি। নারীজাতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা, ভক্তি, সৌজন্য ও অধিকারের দাবিদার। প্রায় ৬০ লাখ নারী দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রধান খাত গার্মেন্টস শিল্পে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কাজ করছে। কাজ করতে গিয়ে তাজরীন গার্মেন্টস ও মোহাম্মদপুরে স্মার্ট গার্মেন্টসে আগুনে পুরে শতাধিক নারী জীবন দিয়েছে। নারীকে দিতে হবে পূর্ণাঙ্গ মর্যাদা, ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং যথাযথ সম্মান। কেননা বিশ্বের মেধা, দক্ষতা, প্রতিভা, সংসার/সমাজ নির্মাণে অর্ধেক ভান্ডার সঞ্চিত আছে নারীর হাতে। যুগ যুগ ধরে প্রথিবীতে সকল বড় বড় কাজের মূলে রয়েছে নারী ও পুরুষের যৌথ ভূমিকা ও অবদান। রাজনীতি, অর্থনীতি এমনকি প্রশাসনযন্ত্র কাঠামোতে নারী সমাজের অংশগ্রহণ ছাড়া প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নয়। দিন আসছে যে দিন শোষক ও অত্যাচারিত স্বরূপ প্রকাশ হয়ে পড়বে এবং তার পতন হবে অনিবার্য। লেখক-সাবেক সিনেট সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সাবেক ট্রেজারার শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন