মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা আদায়ে বাংলাদেশ জোর লবিং করলেও এখনো এ বিষয়ে অগ্রগতি হয়নি। এ নিয়ে মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরেও কোন আলোচনা নেই। এর মধ্যে বাংলাদেশকে দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা—জিএসপি প্রত্যাহারের ঘোষণায় শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্রে নতুন মোড় নিয়েছে। জিএসপি সুবিধা ধরে রাখতেই এখন বাংলাদেশকে লবিং করতে হচ্ছে। অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে নানা কারণে ঝুলে থাকা টিকফা অর্থাত্ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা কাঠামো চুক্তিতে স্বাক্ষর করে হলেও জিএসপি সুবিধা বহাল রাখতে চায় বাংলাদেশ। খোদ বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদের সমপ্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি সুবিধা বহাল রাখতে দেশটির সঙ্গে টিকফায় স্বাক্ষর করতে হবে। ইতিমধ্যে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার না করতে কয়েকজন প্রভাবশালী সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করে তাহলে পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা আদায়ে আগে দেনদরবার করার সময় বহুল আলোচিত টিকফায় বাংলাদেশের স্বাক্ষর দানের বিষয়টি আসতো। এখন জিএসপি সুবিধা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে টিকফায় স্বাক্ষরের বিষয়টি আসছে। যোগাযোগ করা হলে বাণিজ্য সচিব মাহবুব আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘টিকফার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’ তবে বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদের কয়েকদিন আগে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, দুদেশের মধ্যে টিকফা নিয়ে আলোচনায় অনেক অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের কাজের মানের ইস্যুতে চুক্তিটি স্বাক্ষর হয়নি। এখন বাংলাদেশের শ্রমমানের উন্নতি হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, জিএসপি সুবিধা টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টিকফা চুক্তিতে স্বাক্ষর করার এখন উপযুক্ত সময়।
প্রসঙ্গত, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকাসহ বিশ্বের ৮৬টি দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র টিকফা চুক্তি করেছে। বাংলাদেশ টিকফায় স্বাক্ষর করলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিনিয়োগসহ বাণিজ্য সুবিধা নিয়ে আলোচনা করতে পারবে। টিকফায় চারটি মূল বিষয় রাখা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- কারখানার নিরাপত্তা, বিনিয়োগে নিরাপত্তা, মেধাস্বত্ব আইন এবং শ্রমিকদের অধিকার। এসব বিষয়ে দুই দেশের সরকারের প্রতিনিধিদের বছরে এক থেকে দুবার বৈঠকে বসার কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) অফিসের একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা আদায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও পরে বিষয়টি আর এগোয়নি। বাংলাদেশের পক্ষে আগে এ বিষয়ে লবিষ্ট নিয়োগ করা হলেও তারাও এখন নিষ্ক্রিয়। আর শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রাপ্তির বিষয়টি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। এ বিষয়ে এখন কাজ করা হচ্ছে না। ওই সূত্র জানায়, শুল্কমুক্ত সুবিধার বিষয়ে বাংলাদেশ ইউএসটিআর-এর সাথে বিচ্ছিন্নভাবে যোগাযোগ করেছে। সমন্বিত কোন উদ্যোগ এর মধ্যে ছিলো না।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা আদায়ে সরকার এবং তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ দুটি আলাদা লবিষ্ট ফার্ম নিয়োগ দিয়েছিলো। এ খাতে ইতিমধ্যে মোটা অংকের টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
ইউএসটিআর সূত্রে জানা গেছে, ল্যাটিন আমেরিকার দেশ পানামার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যে কোন সময়ে বাণিজ্য উন্নয়ন চুক্তি সম্পাদন করবে। ইতিমধ্যে দুপক্ষের মধ্যে ব্যাপক আলাপ আলোচনার পর চুক্তির খসড়া তৈরি করা হয়েছে। ‘ইউএস-পানামা’ ট্রেড প্রমোশন এগ্রিমেন্ট’ নামক ওই চুক্তির অধীনে উভয় দেশই বিনা শুল্কে দু’দেশে পণ্য রপ্তানি করতে পারবে। পানামা সরকার বহুল আলোচিত পানামা খাল সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর চুক্তির বিষয়টি অনেক এগিয়ে গেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র চায় তাদের বন্দরে আসা জাহাজগুলো পানামা খাল দিয়ে চলাচল করুক। এতে দেশটির পরিবহন ব্যয় অনেক কমে যাবে এবং বিভিন্ন গন্তব্যে দ্রুত পণ্য পৌঁছে যাবে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে বিশ্বের ২০টি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সহায়তা চুক্তি করেছে। দেশগুলো হচ্ছে- অস্ট্রেলিয়া, বাহরাইন, কানাডা, চিলি, পানামা, কলাম্বিয়া, কোস্টারিকা, ডোমিনিকান রিপাবলিক, এল সালভেদর, গুয়েতেমালা, হন্ডুরাস, ইসরাইল, জর্ডান, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো, মরক্কো, পেরু, নিকারাগুয়া, ওমান, সিঙ্গাপুর।
