আলুর গুদাম পুড়লে আলুপোড়া খাওয়া লোকের অভাব হয় না। আমাদের ডাক্তারদের কিছু কিছু ঝামেলায় এমন আলুপোড়া খাওয়া লোকের প্রচুর আনাগোনা দেখা যায়। ডাক্তারি পাশ করার পরে কখনো ডাক্তারি করে নাই বা ক্লিনিকাল, বেসিক বা একাডেমিক এমন কোনো দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কও নাই; এমনকি পেশাগত রাজনীতির সঙ্গেও কখনো সংশ্লিষ্ট না—এমন অনেককেই ফেসবুকে এসে জ্বালাময়ী একটা স্ট্যাটাস দিয়ে চলে যেতে দেখা যায়। ক্যারিয়ার নিয়ে, চাকুরি নিয়ে, সংসার নিয়ে হিমশিম খাওয়া আমাদের তরুণ ডাক্তারদের আরো হতাশ ও ডিমোরালাইজড করে দেয় এসব জ্বালাময়ী স্ট্যাটাস। তারা ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে পড়ে। যুদ্ধক্ষেত্র বলতে ফেসবুক আর যুদ্ধের অস্ত্র বলতে কী-বোর্ড! বর্তমান নিয়ে হতাশা আর ভবিষ্যত্ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে তরুণ ডাক্তাররা অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন। সেকারণেই তাদের ভাষা কখনো-সখনো মার্জিত হওয়ার মার্জিন থেকে বাইরে চলে যায়। আবার এই হতাশার কারণেই কিছু কিছু যৌক্তিক ক্ষেত্রে আন্দোলন বা দাবি আদায়ের জন্য জুনিয়র বা ইয়াং ডাক্তারদের যতটুকু ডেডিকেশন দরকার ততটুকুও থাকে না।
যেটা বলছিলাম, আলুপোড়া খাওয়া স্ট্যাটাস নিয়ে। আলু পোড়া খেতে আসা স্ট্যাটাসজীবীদের কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি ‘ডাক্তারিতে না থেকে খারাপ করেছি কী! অতো কষ্ট করে ক্যারিয়ার গড়ে সারাদিন সারা রাত রোগী দেখতে হতো। তাতে লাইফ বলে কি কিছু থাকত?’ আমার কাছে আলুপোড়া খাওয়া স্ট্যাটাসের চারটি উদ্দেশ্য মনে হয়েছে। এক. প্রকৃতপক্ষেই নিজের ডাক্তার সতীর্থদের, জুনিয়রদের বিপদে এগিয়ে এসে সাহায্য করা; দুই. যারা ক্লিনিকাল পেশায় আছেন বা আসার চেষ্টায় আছেন তাদের পরোক্ষভাবে বোঝানো যে, দেখে যাও ‘আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকার ’পরে / তুমি কত কষ্ট পাও রোদ বৃষ্টি ঝড়ে’; তিন. বন্ধুবান্ধব বা সিনিয়র-জুনিয়র যারা পেশাগত রাজনীতি করে ভাবটাব নিয়ে আছে, কারো কারো মতে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি, তারা যে কোনো কাজেই আসে না নিজের পেশার লোকের জন্য; তা বোঝানো; চার. নিজেরাও একটু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা অনলাইনে আলোচনায় থাকা।
হঠাত্ করে এসে জ্বালাময়ী স্ট্যাটাস দেওয়া ডাক্তারদের অনেকেরই প্রচলিত পেশাগত রাজনীতির সঙ্গে বিন্দুমাত্র সম্পর্কও নাই। সম্পর্ক না থাকার কারণে জুনিয়র বা সিনিয়র কারো কাছে কোনো দায়বদ্ধতাও নাই। এরকম দায়বদ্ধতা ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বক্তব্য বা স্ট্যাটাস শ্রেণিতে শ্রেণিতে অবিশ্বাস ছড়ায়। ডাক্তারদের কখনো সাংবাদিক, কখনো পুলিশ বা কখনো প্রশাসনের বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে দেয়। এমনকী কোনো কোনো ক্ষেত্রে জনগণেরও বিপক্ষে চলে যায় ডাক্তার সমাজ। অথচ ডাক্তারি পেশা কিন্তু জনগণ থেকে আইসোলেটেড কোনো পেশা নয়। যেমনটি হয়ে থাকে বিচারপতিদের ক্ষেত্রে, তাদেরকে সাধারণ পাবলিকের সংস্পর্শে না-আসার জন্য বাজারে যেতেও নিরুত্সাহিত করা হয়। ডাক্তাররা জনগণের ভেতর থেকে তৈরি হয় জনগণের জন্যই। তাই ভিন্ন শ্রেণি বা পেশার সঙ্গে বৈরী মনোভাব ডাক্তারদের জন্য কখনোই মঙ্গল বয়ে আনবে না।
ছোটবেলায় একটা জিনিস দেখতাম, মনে হয় ব্যাপারটা এখনো একই। ফরিদপুরের ওপর দিয়ে বরিশালের বাসকে ঢাকায় বা যশোরে যেতে হয়। তাই ফরিদপুর বাসস্ট্যান্ড সবসময় একটা আপারহ্যান্ড নিয়ে থাকে বরিশালের ওপর। উল্টাপাল্টা কিছু করলেই ওরা বরিশালের বাস বন্ধ করে দেয়। তখন বরিশালের বাস সমিতি কিন্তু ফরিদপুরকে ধরে না, ওরা গিয়ে লিয়াজোঁ করে রাজবাড়ির সঙ্গে। কারণ ঢাকাগামী ফরিদপুরের বাসগুলো যায় রাজবাড়ির উপর দিয়েই। রাজবাড়ির বাস সমিতি তখন যেকোনো অজুহাতে ফরিদপুরের ঢাকাগামী বাস দেয় বন্ধ করে। তখন তিন পক্ষ মিলে সমস্যার সুরাহা করে। জামালপুরে রোগী মারা গেলে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চলে আসেন বা নড়াইলে ডাক্তার না থাকলে এলাকার এমপি হাসপাতাল পরিদর্শনে আসেন, ব্যাপারটা অনেকটা সেরকম। সেজন্য আমার মনে হয় ডাক্তারদের আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে হবে।
সৃষ্টির আদি থেকে ডাক্তারি একটা মহান পেশা। ডাক্তারি সেবামূলক পেশা, সামরিক বা প্রশাসনিক পেশা নয়। এ পেশায় ক্ষমতা না, আছে ডিগনিটি। এটা জেনে ও বুঝে এবং মেনে নিয়েই মানুষ ডাক্তারিতে আসে। ডাক্তার সেবাপ্রদান করবে আর সরকার ও নিয়োগকর্তা ডাক্তারদের সেবার পরিবেশ ও সম্মান নিশ্চিত করবে। ভয়ভীতি বা বন্দুক ঠেকিয়ে কারো কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেওয়া যায়, কাউকে সারাদিন টেবিলে বসিয়ে রাখা যায়—কিন্তু যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত না করে কারো কাছ থেকে প্রকৃত সেবা আশা করা দুষ্কর। আশা করি যথাযথ কর্তৃপক্ষ এ দিকে নজর দেবেন। দায়িত্বশীল লোকজন ঢালাওভাবে ডাক্তারদের দোষারোপ না করে সমস্যার গভীরে ঢুকে প্রকৃতই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করবেন—এ বিশ্বাস রাখি।
n লেখক : চিকিত্সক, গবেষক ও রাজনীতিক
