সন্ত্রাসী, অপরাধী, পলাতক আসামিদের হস্তান্তরে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ ও ভারত। ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করতেও দুই দেশ চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। গতকাল সোমবার বিকালে ঢাকায় দুই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চুক্তি দুইটি স্বাক্ষর করেন। সফররত ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীল কুমার সিন্দে ও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর রাজধানীর একটি হোটেলে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর চুক্তি স্বাক্ষর ও সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন।
সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের হস্তান্তরে স্বাক্ষরিত বহিঃসমর্পণ চুক্তির আওতায় ফৌজদারি মামলা আছে বা অভিযোগ গঠন করা হয়েছে এমন অপরাধীদের চাহিদা অনুযায়ী অন্য দেশে ফেরত দেয়া হবে। সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি বা সাজা ভোগ করেছেন এমন আসামি অপর দেশে হস্তান্তর করা যাবে। সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী কোন আসামির কমপক্ষে এক বছরের সাজা হতে হবে। রাজনৈতিক কারণে পালিয়ে থাকা ব্যক্তিদের এই চুক্তির আওতায় হস্তান্তর করা যাবে না। তবে কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি যদি ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত হন, তাকে হস্তান্তর করা যাবে।
ভিসা সহজীকরণ চুক্তির আওতায় দুই দেশ রিভাইজড ট্র্যাভেল এরেঞ্জমেন্ট বা আরটিএ স্বাক্ষর হয়। এর ফলে বাংলাদেশি রোগীদের এক বছরের জন্য মাল্টিপল ভিসা দেয়া হবে। দীর্ঘ মেয়াদে চাকরি ভিসা, ব্যবসায়ীদের জন্য পাঁচ বছরের ভিসা, গবেষক, সাংবাদিক, শিক্ষার্থীদের জন্য এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত মাল্টিপল ভিসা দেবে ভারত।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আলমগীর যৌথ বিবৃতি পড়ে শোনান। বিবৃতিতে বলা হয়, নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থা, চোরাচালান প্রতিরোধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে আরো গভীরভাবে কাজ করবে। বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপের তত্পরতা দমনে বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকার প্রশংসা করে ভারতীয় পক্ষ। ভারতে পালিয়ে থাকা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই খুনিকে খুঁজে বের করে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেবে ভারত।
সাংবাদিক সম্মেলনে ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীল কুমার সিন্দে বলেন, আজ আমরা ঐতিহাসিক চুক্তি সই করলাম। অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত, নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজনে হস্তান্তর করতে দুই দেশ একসাথে কাজ করব। নিরাপত্তা ইস্যুতে সহযোগিতা আরো জোরদার হবে। পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ভারত সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে পদক্ষেপ নেবে। ভিসা ক্ষেত্রে বর্তমান সিস্টেম আরো সহজ হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সীমান্তে হত্যার ঘটনা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এ ধরনের ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেজন্য কড়া নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র যেসব সীমান্ত এলাকায় ব্যবহূত হচ্ছে সেখানে হত্যার ঘটনা অনেক কমে এসেছে। আমরা আরো আলোচনা করে সীমান্ত হত্যা কিভাবে কমানো যায় সে ব্যাপারে করণীয় ঠিক করব।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, বহিঃসমর্পণ চুক্তির ফলে বাংলাদেশ বেশি লাভবান হবে। কারণ বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে অবস্থানরত আসামি বা অপরাধীর সংখ্যা অনেক বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশে অবস্থানরত ভারতের অপরাধী খুবই কম। রাজনৈতিক কারণে বন্দী বা পলাতক ব্যক্তিরা বহিঃসমর্পণ চুক্তির আওতায় আসবে না।
দুইদিনের সফরে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীল কুমার সিন্দে সোমবার সকালে ঢাকা আসেন। হজরত শাহজালাল(রঃ) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে তাকে স্বাগত জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর। ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আজ মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির সঙ্গে সাক্ষাত্ করবেন।
দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পক্ষে আরো ছিলেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট শামসুল হক টুকু, প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার তারিক এ করিমসহ ১৮ সদস্যের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমন্বয়ে প্রতিনিধি দল। ১৫ সদস্যের ভারতীয় প্রতিনিধি দলে ছিলেন বিএসএফ-এর মহাপরিচালক সুভাষ যোশী, বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আলমগীর গতরাতে ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্মানে স্থানীয় একটি হোটেলে নৈশ ভোজের আয়োজন করেন।
