দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গতকাল সোমবার থেকে নতুন সূচক ডিএসই ব্রড ইনডেক্স (ডিএসইএক্স) ও ডিএস ৩০ সূচক চালু হয়েছে। সূচক দুটি তৈরি করেছে এসঅ্যান্ডপি (স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওর) ডো জোন্স। আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুযায়ী সূচক দুটি প্রস্তুত করা হয়েছে। নতুন সূচক চালু উপলক্ষে গতকাল ডিএসই কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএসই’র সভাপতি রকিবুর রহমান।
এসঅ্যান্ডপি ডো জোনসের ইক্যুইটি ইনডেক্স প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্টের প্রধান অলকা ব্যানার্জী বলেন, ১৯৯টি কোম্পানি নিয়ে ডিএসইএক্স গণনা করা হয়েছে। এখন থেকে এ কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দামের ওঠা-নামার ভিত্তিতে ডিএসইএক্স সূচক ওঠা-নামা করবে।
সূচকে কোম্পানিগুলোকে কিসের ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সূচকে কোম্পানির অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে দুটি বিষয়কে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। প্রথমত, কোম্পানির ফ্লোট অ্যাডজাস্টেড মার্কেট ক্যাপিটাল (লেনদেনযোগ্য শেয়ারের সমন্বিত মূলধন) ১০ কোটি টাকার উপরে হতে হবে। তবে বিদ্যমান কোম্পানির ক্ষেত্রে ৭ কোটি টাকা হলেও বিবেচনা করা যেতে পারে যদি অন্য শর্ত পূরণ করে। দ্বিতীয়ত, কোম্পানির ৬ মাসের দৈনন্দিন গড় লেনদেন হতে হবে ১০ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে কোনো কোম্পানির গড় লেনদেন ৭ লাখ টাকা হলেও সূচকে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে যদি প্রথম শর্তটি পূর্ণভাবে পালন হয়। সূচকে অন্তর্ভুক্ত কোন কোম্পানি যদি বন্ধ হয়ে যায় বা দেউলিয়া হয়ে যায় কিংবা তালিকাচ্যুত হয়ে যায় সেক্ষেত্রে ওই কোম্পানি সূচক থেকে বাদ পড়বে। তবে কোনো কোম্পানি লাভজনক হচ্ছে কিনা তা ডিএসইএক্সে অন্তর্ভুক্তির গণ্য হবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অলকা ব্যানার্জী বলেন, ডিএসইএক্স সূচক গণনার ক্ষেত্রে ডিএসই’র সাধারণ মূল্যসূচকের ২০০৮ সালের ১৭ জানুয়ারির অবস্থানকে ভিত্তি ধরা হয়েছে। এদিন ডিএসইর সাধারণ মূল্যসূচক ছিল ২৯৫১.৯১ পয়েন্টে। এরপর থেকে ৫ বছরে কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে ডিএসইএক্স সূচক ৪ হাজার ৫৫ দশমিক ৯০ পয়েন্টে এসে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি ডিএসই-২০ সূচকের ১০০০ পয়েন্টকে ভিত্তি ধরে ডিএস ৩০ সূচক চালু করা হয়েছে। গতকাল লেনদেন শুরুতে এ সূচকটি ১ হাজার ৪৬০ দশমিক ৩০ পয়েন্ট দিয়ে যাত্রা শুরু করেছে।
ডিএসই ৩০ সূচক সম্পর্কে অলকা ব্যানার্জী বলেন, ডিএসই ৩০ সূচক মানে এই নয় যে, এ ৩০টি কোম্পানি বাজারের সবচেয়ে লাভজনক কোম্পানি। বরং এ কোম্পানিগুলো হলো বিনিয়োগযোগ্য কোম্পানি। যাদের বাজার মূলধন মোট বাজার মূলধনের ৫১ শতাংশ। ডিএসই ৩০ সূচকে কোম্পানির অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়কে দেখা হয়েছে। যে কোম্পানির ফ্লোট অ্যাডজাস্টেড মার্কেট ক্যাপিটাল ৫০ কোটি টাকার উপরে, যে কোম্পানির অন্তত তিন মাসের দৈনন্দিন গড় লেনদেন ৫০ লাখ টাকার উপরে এবং যে কোম্পানিগুলোর সর্বশেষ চার প্রান্তিকে মুনাফা হয়েছে সেগুলো এখানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কোনো কোম্পানির দৈনন্দিন গড় লেনদেন ৩০ লাখ টাকা হলেও বিবেচনায় নেয়া যাবে যদি অন্য শর্তগুলো পূরণ করে।
অলকা ব্যানার্জী বলেন, প্রতি বছরে একবার ডিএসইএক্স সূচক পুনর্বিবেচনা করা হবে। কোনো কোম্পানি নতুন করে শর্ত পূরণ করলে সূচকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে আর শর্ত পূরণে কোনো কোম্পানি ব্যর্থ হলে তাকে সূচক থেকে বাদ দেয়া হবে। প্রতি বছর ৩১ ডিসেম্বরের তথ্য নিয়ে জানুয়ারির তৃতীয় বৃহস্পতিবার নতুন সূচক বাস্তবায়ন করা হবে। যা কার্যকর হবে পরবর্তী কার্যদিবস থেকে। আর ডিএসই ৩০ সূচক প্রতি ছয় মাস পর পর পুনর্বিবেচনা করা হবে। এক্ষেত্রে ৩০ জুন ও ৩১ ডিসেম্বরের তথ্য নিয়ে পরবর্তী মাসের তৃতীয় বৃহস্পতিবার নতুন ডিএসই ৩০ সূচক বাস্তবায়ন করা হবে। যা কার্যকর হবে পরবর্তী কার্যদিবস থেকে। আর নতুন আইপিও বাজারে আসলে তা কখন সূচকে অন্তর্ভুক্ত হবে এমন এক প্রশ্নের জবাবে জানানো হয়, যদি কোনো কোম্পানির মূলধন বাজারের গড় মূলধনের চেয়ে বেশি হয় তাহলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই তা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। অন্যথায় সূচক পুনর্বিবেচনার সময়ই তা অন্তর্ভুক্ত হবে।
সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এসঅ্যান্ডপি ডো জোন্সের দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যবসা সমপ্রসারণ বিষয়ক পরিচালক কোয়েল ঘোষ, ডিএসই’র জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি আহমেদ রশিদ লালী, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফায়েকুজ্জামান এবং ডিএসইর ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রধান অর্থ কর্মকর্তা শুভ্রকান্তি চৌধুরী।
নতুন সূচক সম্পর্কে আহমেদ রশিদ লালী বলেন, নতুন সূচক চালুর ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সূচক নিয়ে আর বিভ্রান্তি থাকার সুযোগ নেই। তাছাড়া আন্তর্জাতিক মানের সূচক হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাজারে আস্থা পাবেন। আর নতুন সূচক ডিমিউচুয়ালাইজেশনের অন্যতম একটি ধাপ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রসঙ্গত, গতকাল ডিএসইএক্স সূচক ৪ হাজার ৫৫ দশমিক ৯১ পয়েন্ট ও ডিএসই ৩০ সূচক ১ হাজার ৪৬০ দশমিক ৩০ পয়েন্ট দিয়ে লেনদেন শুরু হয়। ডিএসই-৩০ সূচকে অন্তর্ভুক্ত কোম্পানিগুলো হলো স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, গ্রামীণফোন, বেক্সিমকো, পূবালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ন্যাশনাল ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, তিতাস গ্যাস, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট, ইউনাইটেড কমার্সিয়াল ব্যাংক, লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিকেলস, সামিট পাওয়ার, ইউনাইটেড ওয়ারওয়েজ, ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো, লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্স, যমুনা অয়েল, বিএসআরএম স্টীল, পদ্মা অয়েল কোম্পানি, পাওয়ার গ্রীড, আরএন স্পিনিং মিলস, ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, আফতাব অটোমোবাইলস, স্কয়ার টেক্সটাইল, খুলনা পাওয়ার কোম্পানি, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, এমজেএল বাংলাদেশ, পিপলস্ লিজিং ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং কেয়া কসমেটিক্স।
