অন্তুর পড়ালেখা

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:২২
প্রধান শিক্ষক কবির হোসেন ওদের ডাক দিলেন, এই ছেলেরা, তোমরা শোন তো! ওরা ছয় জন দাঁড়ালো। প্রধান শিক্ষক কাছে যেতে ইশারা করায় ওরা পায়ে পায়ে কাছে গেলো। প্রধান শিক্ষক জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা ইস্কুলে পড়ছো না? অন্তু জবাব দিলো, আমাগো জামা নাই ছার। প্রধান শিক্ষক বললেন, আজ তোমরা জামা ছাড়া ক্লাস করো। আমি তোমাদের জামার ব্যবস্থা করবো। জিতু বললো, আমাগো বই নাই স্যার। প্রধান শিক্ষক বললেন, আমি সবাইকে বই দেবো। বাচ্চু বললো, ধান টুকাইতে না গেলে মায় খুব মারবো। প্রধান শিক্ষক বললেন, তোমাদের প্রতিদিন এতোগুলা বিস্কুট দেবো। ছয় শিশু বন্ধু একে অপরকে দেখলো। অন্তু ইশারা করলো। ওরা ক্রিকেট খেলার সরঞ্জাম বিদ্যালয়ের দেয়ালে রেখে প্রধান শিক্ষকের পেছনে ক্লাসে ঢুকলো। প্রধান শিক্ষক দুটো বেঞ্চ দেখিয়ে বললেন, এখানে বস তোমরা। ক্লাসের অপর ছাত্র-ছাত্রীদের দিকে তাকিয়ে প্রধান শিক্ষক বললেন, এই ছয় শিশুর স্কুলে আসার মতো কোনো জামা নেই। তোমরা কে কে পুরোনো জামা দিতে পারো, হাত তোল। প্রথমে সকল ছাত্র-ছাত্রী ওদের একবার দেখলো। তারপর ছেলে শিশুরা সবাই হাত উপরে তুললো। প্রধান শিক্ষক হাসলেন। তিনি বারোজনকে চিহ্নিত করে বললেন, তোমরা একটি শার্ট ও পেন্ট নিয়ে আসবে আগামীকাল। কেমন? সবাই একত্রে জবাব দিলো, জ্বী স্যার। দুপুরে চারটি নতুন বই বগলদাবা করে অন্তু বাড়িতে এলো। তখনো রাবেয়া বাড়ি আসেনি। জমির কালুকে কোলে বসিয়ে বারান্দায় বসে আছে। গুণগুণ করে সে গান গাইছে। অন্তুর বগলে ধানের বদলে বই দেখে বললো, তোর হাতে বই ক্যান? তুই ধান টুকাইতে বন্দে যাছ নাই রে বাজান? অন্তু উত্ফুল্ল কণ্ঠে বললো, আইজ আমি ইস্কুলে গেছিলাম বাবা। ছার আমারে এই বইগুলো দিছে। বিস্কুটও দিছে। খুব মজার বিস্কুট। কাউল্যার লাইগ্যা দুইডা বিস্কুট আনছি। বাম হাত মেলে ধরে দুটো বিস্কুট দেখালো অন্তু। জমির বিস্কুট দুটো নিয়ে একটা কালুর হাতে দিয়ে আরেকটা নিজে মুখে পুড়ে নিলো। বিস্কুটটা চিবিয়ে বললো, কিন্তুক তুই বন্দে যাছ নাই ক্যান? তোর মা আয়া পিঠে কইঞ্চা ভাংবো, তখন মজা বুঝবি! অন্তু বইগুলো বারান্দায় মাটিতে রেখে বললো, আমি আর ধান টুকাইতে বন্দে যাইতাম না বাবা। জমির বিস্কুটটা গিলে বললো, কী করবি তুই? অন্ত বললো, আমি ইস্কুলে যাইবাম। পড়বাম। জমির মুখ ভ্যাংচে বললো, পড়বাম! চারইটা বিস্কুট খাইলে কি পেট ভরবো? ভরবো না। তুই অহনই বন্দে যা! নাইলে আইজ আমিও তোর মারবাম। যা কইলাম! অন্তু কিছুটা গো ধরে বললো, আমি পড়বাম বাবা। পড়ালেখা করলে ভদ্দর লোক হওন যায়। আমরা তো ভদ্দর লোক না। তখন জমির বললো, ঠিকছে পড়িস। এখন বন্দে যা। কিছু ধান টুকায়া লয়া আয়। ইস্কুলের সময় ইস্কুলে যাবি; আর ধান টুকানোর সময় বন্দে যাবি। বাবার এ কথাটা অন্তুর মনে ধরলো। সে খুশি হলো। বইগুলো তুলে ঘরের ভেতর রেখে চুটে বেরিয়ে গেলো বাইরে। মসজিদের আযান শেষ হলে রাবেয়া বাড়ি এলো। ওর শাড়ির আঁচলে ঢাকা একটা থালা। ওতে গতরাতের বাসি ভাত ও তরকারি আছে। মাকে দেখে কালু খুব খুশি হলো। সে বাবার কোল থেকে নেমে ছুটে গেলো মার দিকে। জমিরের হাতে ভাত-তরকারির থালাটা দিয়ে রাবেয়া কালুকে কোলে তুলে নিয়ে মুখমন্ডলে কয়েকটা চুমু খেলো। কালু বললো, ভুখ লাগছে মা। রাবেয়া জমিরকে জিজ্ঞেস করলো, ওরে কিছু খাইতে দেও নাই? জমির বললো, কী খাইতে দিবাম। ঘরে তো কিছুই নাই। কালু বললো, বিস্কুট খাইছি মা। জমির চমকে একটু হাসলো। বললো, ও। অন্ত দুইটা বিস্কুট আনছিলো। রাবেয়া জিজ্ঞেস করলো, অন্তু বিস্কুট পাইলো কই? জমির বললো, ইস্কুল থাইকা আনছিলো। রাবেয়া ফের জিজ্ঞেস করলো, অহন কই গেছে অন্তু? জমির বললো, কামে গেছে। রাবেয়া আর কিছু বললো না। কালুকে নিয়ে ঘরে ঢুকলো। পেছনে ভাতের থালা হাতে রাবেয়া। জমির বললো, আমি আর কালু এই ভাতটুক খায়া ফালাই। তোমার আর অন্তুর লাইগা ভাত বসায়া দেও। রাবেয়া কালুকে চৌকিতে বসিয়ে বললো, আমি খায়া আইছি। তোমরা তিনজন ভাগ কইরা এই ভাতটুক খায়া লও। জমির ম্লান কণ্ঠে বললো, তিনজনের কম পইড়া যাইবো রাবু। রাবেয়া বললো, তুমি একটু কম খাও। চাউলের দাম বাড়তাছে। তোমার মাঝে মইধ্যে কাম থাকে না। ঘরে দুইডা চাউল জমুক। ভবিষ্যতে কামে আইবো। সেদিন অন্তু একটু দেরি করে বাড়ি এলো। বেশ ধান কুড়িয়ে এনেছে সে। রাবেয়া ধান দেখে খুব খুশি হলো। সে অন্তুর হাত থেকে ধানের ব্যাগটা নিয়ে ভেতর দেখে বললো, ধানে মাটি ক্যান রে অন্তু? অন্তু বললো, ইন্দুরের গাথা থাইক্যা ধান বাইর কইরা আনছি। ইন্দুরের গাথায় অনেক ধান মা। রাবেয়া জিজ্ঞেস করলো, আর কেউ দেখছে? অন্তু বললো, না মা। রাবেয়া বললো, তাইলে খাইয়া আবার যা। ইন্দুরের গাথাগুলো হাতায়া সব ধান লয়া আয়। অন্তু বললো, আমি আর যাইতাম না মা। বাবারে পাঠাও। রাবেয়া জিজ্ঞেস করলো, তুই কী করবি? খেলতে যাইব? অহন খেলতে গেলে ঠ্যাং ভাইঙ্গা দিবাম! তখন ঘরের ভেতর থেকে জমির বের হয়ে এলো। একটু ধমক দিয়ে বললো, তুমি খালি আমার বড় বাজানকে বকাবকি করো! ও তো কাম করছে। একটু খেলতে যাউক। আমিই যাইতাছি ধান টুকাইতে। অন্ত বললো, আমি খেলতে যাইতাম না বাবা। জমির জিজ্ঞেস করলো, তাইলে কী করবি? অন্ত বললো, সকালে ইস্কুল থাইকা বই নিয়া আইছি না? আমি পড়ে বসবাম। রাবেয়া চমকে উটে জিজ্ঞেস করলো, কী কইলি তুই? তুই ইস্কুলে গেছিলি? অন্তু বললো, হ মা। ছার কইছে আমারে ইস্কুলে যাওনের লাইগা পিরান দিবো। রাবেয়া বললো, তুই ইস্কুলে গেলে কাম করবো কেডা? জমির অন্তুর কাছে এসে বললো, অন্তু একটু আধটু ইস্কুলে যাউক। আমি ইস্কুলে যাইতে পারি নাই, তুমি যাও নাই। ও যাউক। একটু পড়ালেখা শিকুক। রাবেয়া কড়া গলায় বললো, ও ইস্কুলে গিয়া কী করবো? বড় অফিসার হইবো? তোমারে কামাই কইরা খাওয়াইবো? জমির বললো, আমারে কামাই কইরা খাওয়ানোর দরকার নাই। ও ইস্কুলে যাউক। আমি কামে গেলাম। অন্তু বাবার কথায় খুব খুশি হয়ে ছুটে গেলো পুকুরের দিকে। সাঁতার কেটে কয়েকবার পুকুরটা এপার-ওপার হয়ে গোসল সারলো। বাড়িতে এসে ভাত খেয়ে পায়ে পায়ে বই-এর কাছে গেলো। বইগুলো নিয়ে বারান্দায় এলো। রাবেয়া বারান্দায় বসে ধান থেকে মাটি সরাচ্ছে। ছেলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কয়ডা বই দিছে রে অন্তু? অন্তু একটা বই-এর পাতা উল্টে বললো, তিনটা। রাবেয়া বললো, খোরশেদ ভায়ের বড় পোলাডার এত্তো বই। পোলাডা সারাদিন খালি পড়ে। অন্তু একটা বই নিয়ে মার কাছে এলো। বইটা মাকে দেখিয়ে বললো, আমি তো কিছু জানি না মা। কী পড়বাম। তুই একটু কয়া দেও না। রাবেয়া অন্তুর দিকে তাকিয়ে অসহায় কণ্ঠে বললো, আমিও তো কিছুই জানি না। আমি তোরে কিভাবে পড়াইবাম! এক কাম করি। অন্তু আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কী কাম মা? রাবেয়া বললো, বৈকালে খোরশেদ ভায়ের বড় পোলার কাছে তোরে লয়া যাই। হেরে কয়াম তোরে পড়াইতে। অন্তু খুব খুশি হয়ে বললো, তাইলে তো খুব ভালা হয় মা। অহন আমি তোমার কামে হাত লাগাই। অন্তু বইগুলো ঘরের ভেতর রেখে এলো। মার পাশে বসে ধান থেকে মাটি সরানোর কাজ করতে লাগলো।