ব্লগ নিয়ে দুটি লেখা ইতোমধ্যে আমরা লিখেছি। ‘ব্লগ নব যুগের নব মাধ্যম’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশিত হয় গত বছরের জানুয়ারিতে। অপর লেখাটি গত ২ জানুয়ারি ছাপা হয় দৈনিক ইত্তেফাক-এ, যার শিরোনাম ছিল ‘অপপ্রচারে প্রশ্নবিদ্ধ ব্লগিং ও কিছু বাংলা ব্লগ’। এসব লেখার সূত্র ধরেই বলছি, একগুয়ে-একতরফা সবকিছুরই বিকল্প খুঁজে পেতে সদাসচেষ্ট বিকল্প মাধ্যম হিসেবে ব্লগের প্রচার ও প্রসার আমরাই চেয়েছি। কিন্তু এখন আর এই প্রচার ও প্রসার যাচ্ছেতাইভাবে বেড়ে উঠতে দেয়া যায় না। একজন হাঁতুড়ে ডাক্তারকে দিয়ে যেমন অপারেশন করানো নির্বুদ্ধিতার কাজ, তেমনি কিছু পেইড বা নিয়োগপ্রাপ্ত ব্লগারের হাতে ব্লগের ব্যবহার ও ব্লগের উন্নয়নকে ছেড়ে দেওয়া একই পর্যায়ের নির্বুদ্ধিতা। বিভিন্ন উদ্দেশ্য প্রণোদিত ব্লগ ও ব্লগারের অসাধু আচরণের কারণে যে অন্যায় ও ব্লগের নীতিবিরুদ্ধ কার্যক্রম পরিলক্ষিত হচ্ছে, তার দায় আমাদেরও নিতে হচ্ছে। আজকের যারা লেখক, পাঠক ও সমালোচক, তাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে এই কপি-পেস্ট মার্কা ব্লগার ও আইডিয়া চোরদের প্রতিহত করতে। সময়োচিত জবাব দিয়েই ব্লগ ও ব্লগিং বিতর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোর মধ্যে ফেসবুকের জনপ্রিয়তা যেভাবে বাড়ছে, তাতে প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা ধারণা করেন, ব্যবহারকারীর সংখ্যায় ৫০০ মিলিয়ন পেরিয়ে যাওয়া ফেসবুকের পক্ষে খুবই সম্ভব। আবার বিশ্লেষকরাই আশংকা প্রকাশ করে থাকেন, ফেসবুকের আইডিধারী যারা থাকবেন, তার প্রায় সমপরিমাণই থাকবে ফেইক আইডি। পাশাপাশি এসব আইডির ভার্চুয়াল মালিক ও উত্তরাধীকার নিয়েও নতুন বিষয় ও সমস্যারও আবির্ভাব হতে পারে। যদিও এতে ফেইসবুকের সামান্য ক্ষতিও হবেনা বরং তাদের লাভই হবে। ফেসবুকের মতো অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোর জন্যও এ কথা প্রযোজ্য। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও এককথায় সবচেয়ে জনপ্রিয় সাইটের নাম ফেসবুক। এর ব্যবহারও আমাদের সকলেরই জানা। কেউ হয়ত একটু কম জানে, কেউ বেশি। তবে অনেকের ক্ষেত্রে এতই বেশি যে তার প্রোফাইলে তাকেন বা তার পরিচয় দেখে আমাদের আশ্চর্য হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। যদিও অনেক ক্ষেত্রে এসব সত্য নয়। যেমন, অনেকে লিখেই রাখেন ফেইসবুক সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ, পেইজ বিশেষজ্ঞ এসব। যদিও এসব মিথ্যাচারের কারণে দেশে-বিদেশে নানা বিড়ম্বনার সৃষ্টি হচ্ছে। অপপ্রচারের কারণে পুলিশি ঝামেলার মধ্যেও জড়াতে হচ্ছে। পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে মত প্রকাশের দোহাই দিয়ে অনেকে বির্তকের জন্ম দিয়ে বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় নিচ্ছেন, যা সত্যিই হাস্যকর। আবার অনেকে বিদেশে থেকে দেশের বিষয়ে অনেক বেশি সচেতনতার পরিচয় দিচ্ছেন ব্লগ বা সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতে মত প্রকাশ করে।
উল্লেখ্য, আমাদের দেশে মানুষের রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ মাত্রাতিরিক্ত। রাজনীতি একটি ওপেন ফিল্ড, তাই নাগরিক হিসেবে এ নিয়ে সবাই মতপ্রকাশের অধিকার রাখে। আমাদের সংবিধানে মতপ্রকাশের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে বলা রয়েছে।
ব্লগগুলো মতপ্রকাশের জন্য অনন্য এক মাধ্যম। কিন্তু এর মাত্রা কী পর্যায়ে, তা নিয়ে আমরা আজ দ্বিধান্বিত। মতপ্রকাশের নামে ব্লগগুলোতে চলছে নির্জলা মিথ্যাচার আর ইতিহাস বিকৃতি। এমনকি প্রকাশ্য অযোগ্য ভাষার ব্যবহারও অতিমাত্রায় লক্ষ করা যাচ্ছে। আগে যেখানে প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে জায়গা বা সময়ের অভাবে বক্তব্য বা মতপ্রকাশ বা খবর প্রকাশ সীমিত ছিল, তার এক বিকল্প মাধ্যম এখন ব্লগ। এখানেও সুবিধা নিচ্ছেন অর্ধসচেতন বা অচেতন লোকজন যারা ঘরের মধ্যে বসে নিজেদের জ্ঞানী ভাবছেন কিন্তু বলতে কষ্ট হচ্ছে বাস্তবতা থেকে তাদের অবস্থান অনেক দূরে। আর সাথে থাকা সেই স্বাধীনতাবিরোধীদের উত্তর প্রজন্ম যারা নানা কৌশলে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।
আমাদের ব্লগগুলোতে সঠিক ইতিহাস নিয়ে ব্লগিং কমই হয়ে থাকে, বলা চলে হয়ই না। অন্যদিকে ইতিহাস বিকৃতি কিন্তু চলছে পুরোদমে। দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বাঙালি জাতির উন্মেষের ইতিহাস এবং আমাদের উত্তরণের ইতিহাস নিয়ে গবেষণামূলক ব্লগিং কম। কয়েকজন মাত্র এসব নিয়ে কাজ করছেন কিন্তু অনুপাতে স্বাধীনতাবিরোধীরা বেশী অপপ্রচার করছেন। সঠিক ইতিহাসের পাঠ ব্লগে আরও বেশি হওয়া জরুরি।
বিকল্প মিডিয়া না হয়ে ব্লগ হাঁটছে কপি-পেস্টের দিকে। নিজের মতপ্রকাশের চেয়ে ফেক বা নিক ব্যবহার করে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গণমাধ্যমের বক্তব্য হুবহু ব্লগে চলে আসছে এবং এখানে বিরূপ বিষয়গুলোই বেশি আসছে। মিডিয়া যেমন মন্দ কিছুকে বেশি হাইলাইট করে, ব্লগ এবং ব্লগিং এ ক্ষেত্রে আরও একটু এগিয়ে সাথে গালিগালাজসহ তা কপি করে ব্লগে পেস্ট করে থাকে। কপি-পেস্টেই আটকে আছে অনেকের ব্লগিং। এমনকি কপি করে অনেকে তা আবার নিজের নামে প্রকাশ করছেন যা সত্যি মতপ্রকাশের নামে এ অধিকারের অপব্যবহার। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা অভিজ্ঞানের প্রকাশ তাই ইদানিং ব্লগে সীমিত হয়ে এসেছে। মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে শুদ্ধচর্চার মাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অপরের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে উভয়ের অনুপ্রেরণার মোহনা হতে পারে ব্লগ, সে বিষয়টি নিয়ে তেমন কর্মপ্রয়াস সীমিত হয়ে এসেছে। কয়েকটি ব্লগ এসব নিয়ে কাজ করলেও সদস্য ও ব্লগার কম হওয়ার কারণে তাদের অবস্থা নাজুক এবং দুই-তিনটি ব্লগ ইতোমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে।
তবে একটা কথা না বললেই নয়, যেমন আমাদের দেশে নতুন যেকোনো মাধ্যমের গ্রহণযোগ্যতা খুব দ্রুতই প্রসারলাভ করে। এর সঠিক ব্যবহার আমাদের সচেতন করে তুলতে পারে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলোতে। ব্লগার এবং ব্লগার পাঠক এখন খুব সচেতনভাবে যাচাই-বাছাই করেই তথ্য-তত্ত্ব গ্রহণ করে। শুদ্ধ ব্লগ চর্চাকারীরা প্রতিনিয়তই এর প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করতে পারছেন এবং তার ফলেই ইতিহাসভিত্তিক সত্যনির্ভর ব্লগিংয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছেন। ইতিহাস বিকৃতিকারীকে চিহ্নিত করে তাকে প্রতিহত করতে অধিকতর সচেষ্ট হওয়ার প্রবণতা তাই এখন লক্ষণীয়। বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে এখন বহুল পরিচিত অনেক ব্লগই তাই ভাগাড়-আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে, সেই ভাগাড়ে কিলবিল করে বেড়ায় ছাগুদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ইতিহাসবিকৃত লাশ।
মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির অসীম আগ্রহ, সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা, জাতীয়-মানবিক ইস্যুতে একাত্বতা এবং ইতিহাসের সঠিক সংরক্ষণের তাগিদ অনুধাবন করেই শুরু হয়েছে ব্লগের ভিন্ন মাত্রিক উন্নয়ন। সে লক্ষকে সামনে রেখেই চলছে বিষয়ভিত্তিক ব্লগিং, যেখানে লেখার মান নিশ্চিতকরণ, ব্লগিং পরিপন্থী বিষয় পরিহার, তদুপরি লেখার সাহিত্যিক মান নিশ্চতকরণের মতো উন্নত মানসিকতার মত বিষয়সমূহ। শুধু তাই নয়, ব্লগের ব্যবহার হচ্ছে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা, টেকভিত্তিক তথ্য, মেডিকেশনাল, মানবিক আবেদনে সাড়া দেওয়ার মতো মহত্ কাজে।
যারা ব্লগের প্রকৃত ব্যবহারকে বুঝতে পেরেছেন, তারা জানেন, ব্লগ কীভাবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রমনা মানুষগুলোকে তাদের অধিকার ও দায়িত্ববোধ বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। সচেতনার ক্ষেত্র তৈরিতে ব্লগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ব্লগ পারে মানুষের সাথে মানুষের আত্মিক সম্পর্ককে জোরদার করে পারস্পারিক যোগাযোগের মাধ্যমে পরিণত হতে। শুধু ইতিহাস বিকৃতি, অপপ্রচার ও ছাগুগিরি ব্লগের বিষয় হতে পারে না। বরং ইতিহাসকে সমুন্নত রাখতে, সত্যকে সমুন্নত রেখে সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে ব্লগ। ব্লগের এই উদ্দেশ্য সফল করতেই আহ্বান সকলের প্রতি।
লেখক: আশরাফ সিদ্দিকী বিটু, ব্লগার ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক; এনায়েত হায়দার শাওন, ব্লগার, www.pechabolg.com।
