সংবাদপত্রে দুইটি দুঃখজনক খবর প্রকাশিত হইয়াছে একদিনের ব্যবধানে। প্রথম খবরটি রাজধানীর একটি স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। প্রতিষ্ঠানটির একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীর সাথে শালীনতাবহির্ভূত আচরণের অভিযোগ উঠিয়াছিল। অভিযোগটি গুরুতর। শুধু তাহাই নহে, তদন্তে সেই অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হইয়াছে। চাকুরিচ্যুত করা হইয়াছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ও শিক্ষকসুলভ আচরণের পরিপন্থি কাজ করায়’ তাহার বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হইয়াছে। দ্বিতীয় খবরটিও কম দুর্ভাগ্যজনক নহে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গৃহকর্মীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে গত শনিবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষককে কারাগারে পাঠাইয়াছেন আদালত। অভিযুক্ত শিক্ষককে চাকুরিচ্যুত করার দাবিতে মানববন্ধনও করিয়াছেন উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা। সমাজে—বিশেষ করিয়া শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনে— এইসব ঘটনার প্রতিক্রিয়া কী হইতে পারে তাহা অনুমান করা কঠিন নহে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ইতঃপূর্বে রাজধানীর অপর একটি স্বনামধন্য বালিকা বিদ্যালয়েও অনুরূপ ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়াছিল। সেই ঘটনায় সারা দেশ তোলপাড় হইয়াছিল। আমাদের সম্মানিত শিক্ষকদের এই ধরনের অশিক্ষকসুলভ আচরণের দৃষ্টান্ত একেবারে কম নহে।
পাশাপাশি ইহাও সত্য যে, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, নারী নির্যাতন কিংবা অ্যাসিড নিক্ষেপের মতো ঘটনা সমাজে অহরহই ঘটিতেছে। কেন ঘটিতেছে তাহা লইয়া যেমন নানা মত আছে, তেমনি এই ধরনের অপরাধপ্রবণতা সত্যি সত্যিই বাড়িতেছে কিনা— তাহা লইয়াও রহিয়াছে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। অনেকে মনে করেন যে, প্রায় ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে এই ধরনের কিছু কিছু ঘটনা ঘটিতেই পারে। তদুপরি এই ধরনের ঘটনা যে হঠাত্ করিয়া ঘটিতেছে তাহাও নহে। তবে গণমাধ্যমের বিস্তৃতি ও সরব ভূমিকার কারণে এখন প্রতিটি ঘটনাই দেশবাসীর নজরে আসিতেছে। ভিন্নমতও অত্যন্ত প্রবল। নাগরিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলি মনে করে যে, নারীর উপর সব ধরনের নির্যাতনই শুধু বাড়িতেছে না, সেই সাথে বৃদ্ধি পাইতেছে নৃশংসতার মাত্রাও। আমরা সেই বিতর্কে যাইব না। বাস্তবতা হইল, যৌন হয়রানি ও নারীর উপর সহিংসতা আগেও ছিল, এখনও আছে। ঘরে-বাহিরে প্রতিনিয়তই নারীরা যে নানাভাবে নিগৃহীত হইতেছে— এই বাস্তবতা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। এমনকী প্রতিবেশী ভারতের চিত্রও ভিন্ন নহে। দিল্লির লোমহর্ষক ঘটনার রেশ কাটিতে না কাটিতেই এই সেইদিন মানিকগঞ্জেও চলন্ত বাসে নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়াছে। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, শিক্ষকরাও সমাজ-বহির্ভূত কেহ নন। আমাদের মধ্যযুগের খ্যাতনামা এক কবির ভাষায় বলিতে হয়— নগর পুড়িলে দেবালয় রক্ষা পাইবে কী করিয়া?
কবির এই বক্তব্যকে শিরোধার্য করিয়াও বলিতে হয় যে, শিক্ষক আর দশজনের মতো নহেন। অন্তত ঐতিহ্যগতভাবে আমরা তাহা ভাবিতে অভ্যস্ত নহি। আমাদের চোখে শিক্ষক হইলেন মানুষ গড়ার কারিগর— পরম শ্রদ্ধেয়, আদর্শ ও নীতিনিষ্ঠ এবং সর্বোপরি অনুসরণযোগ্য এক মানুষ। পরিতাপের বিষয় হইল, শিক্ষক নিজে নীতি বা পথভ্রষ্ট হইলে দেশ ও সমাজকে তিনি পথ দেখাইবেন কী ভাবে? তবে ভুলিলে চলিবে না যে, দ্রুত পরিবর্তনশীল এক পৃথিবীতে আমাদের বসবাস। বিশ্বায়নের বদৌলতে পৃথিবী এখন পরিণত হইয়াছে এক বৈশ্বিক গ্রামে। প্যাসিফিক ও আটলান্টিক মহাসাগর পার হইয়া প্রতিনিয়ত পশ্চিমা সংস্কৃতির বিশাল বিশাল সব ঢেউ আসিয়া আছড়াইয়া পড়িতেছে আমাদের এই ক্ষুদ্র বৃত্তাবদ্ধ জনপদে। অত দূরে যাওয়ারও প্রয়োজন পড়ে না। বলিউড নামে খ্যাত মুম্বাইয়ের যৌনতাসর্বস্ব চোখ-ধাঁধানো বিনোদন জগতের প্রভাবইবা কম কী! ইহার অভিঘাতে আমাদের সমাজ এবং জীবনও দ্রুত বদলাইয়া যাইতেছে। ইহার ভালোমন্দ দুইটি দিকই রহিয়াছে। তবে বিশ্বায়নের এই প্রভাবকে থামাইয়া রাখিবার সাধ্য কাহারও নাই। অতএব, পছন্দ হউক না হউক, এই বাস্তবতার সাথেই আমাদের বসবাস করিতে হইবে। জাতিগতভাবে যতদূর সম্ভব ভালোকে গ্রহণ এবং মন্দকে বর্জন করিবার মতো শক্তি অর্জন করিতে হইবে নিজের ভিতরে। এই ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকাই যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না।
