ব্যক্তিগত অস্ত্র ব্যবহারে রাশ টানিয়া ধরিবার আইন তৈরির দাবিতে অবশেষে রাস্তায় নামিয়া আসিয়াছে মার্কিনীরা। শনিবার এই দাবি লইয়া সারা দেশ হইতে আগত বিপুল সংখ্যক মানুষ সমবেত হইয়াছে ওয়াশিংটন ডিসিতে। সামপ্রতিক বত্সরগুলিতে ব্যক্তিগত অস্ত্রের ব্যবহারে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাইকারি হারে নরহত্যার ঘটনা বন্ধ করিবার লক্ষ্য হইতেই সরকার বরাবরে নূতন আইনের দাবি উত্থাপিত হইয়াছে। প্রসঙ্গত, ব্যক্তিগতভাবে অস্ত্র সংরক্ষণ করিতে পারাটা মার্কিনীদের সাংবিধানিক অধিকার। সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীতে প্রত্যেকটি ব্যক্তিকে অস্ত্র ধারণ ও বহন করিবার অধিকার দেওয়া হইয়াছে।
সাংবিধানিক সুরক্ষার সুযোগে মার্কিন নাগরিকেরা নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার নামে অস্ত্র ক্রয় করিয়া থাকে। নিরাপত্তা রক্ষার অজুহাতে সামরিক বাহিনীতে ব্যবহার হইয়া থাকে এমন অনেক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রও বাজার হইতে ক্রয় করিতে পারে মার্কিনীরা। এইসব অস্ত্র একজন দুইজন হামলাকারী বা গৃহে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ঠেকাইবার প্রথাগত ব্যক্তিগত ব্যবহার্য অস্ত্র নহে। বরং এইসব অস্ত্র যুদ্ধক্ষেত্রে সম্মুখসমরে সামরিক বাহিনীর দ্বারা ব্যবহূত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। এইসব স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের মারণক্ষমতা প্রথাগত অস্ত্রের তুলনায় অনেকগুণ বেশি। ব্যক্তিগত ব্যবহারের সাবেকি অস্ত্রগুলির সহিত এইগুলির ক্ষিপ্রতাও তুলনীয় নহে। সামপ্রতিককালে যুক্তরাষ্ট্রের নানান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, বিপণি বিতানে কিংবা অন্যকোন জনসমাগম স্থানে কোন একজন ব্যক্তির গুলিবর্ষণে পাইকারিভাবে মানুষ মারিবার যত ঘটনা ঘটিয়াছে তাহার প্রত্যেকটিতেই স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহূত হইয়াছে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় এই যে, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র কিনিবার পিছনে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার যুক্তিই যে কেবল কাজ করে তাহা কিন্তু নহে। আগ্নেয়াস্ত্রের প্রতি অমোঘ আকর্ষণবশতঃ অপ্রয়োজনেও নানাবিধ অস্ত্র ক্রয় করিয়া থাকে বহু ব্যক্তি। ইহাছাড়াও রহিয়াছে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাজনিত অপ্রয়োজনীয় মাত্রার ভীতি ও হলিউডের মারদাঙ্গা মুভিগুলির প্রভাব।
পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তরের একটি সমাজে এহেন বিকার অবধারিত কিনা তাহা লইয়াও কথাবার্তা হইতেছে। তবে একটি ব্যাপারে শুভবোধসমপন্ন মার্কিনীরা একমত যে, অস্ত্রের সহজলভ্যতা আলোচ্য দুর্যোগের অন্যতম কারণ। তাই দাবি উঠিয়াছে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ করিবার আইন প্রণয়নের। অস্ত্র ব্যবহারের জন্য সাংবিধানিক সুরক্ষা তৈরি করিয়া রাখা একটি সমাজে এহেন বোধ তৈরি হওয়াটা বড় ধরনের অগ্রগতি বটে। এই বোধ নূতন আইন প্রণয়নে মার্কিন আইন বিভাগের উপরে নূতন চাপ তৈরি করিবে বলিয়া মনে করা হইতেছে।
কিন্তু, প্রশ্ন হইতেছে জনসমাজের চাপের মুখে মার্কিন আইন সভাতে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ করিবার আইন প্রণয়ন চটজলদি সম্ভব হইবে কি? ভুলিয়া গেলে চলিবে না যে, এই ধরনের একটি আইনের সহিত বহু-বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা জড়িত। অস্ত্রব্যবসা কেবলমাত্র সামরিক বাহিনীকে অস্ত্র যোগানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নহে; যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশে এই ব্যবসার মুনাফার একটি অংশ আসে সাধারণ মানুষের নিকট বৈধভাবে অস্ত্র বিক্রয় করিয়া। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিষিদ্ধ হইবার অর্থ হইবে অস্ত্র ব্যবসায়ীদের আয়ের বড় একটি রাস্তা বন্ধ হইয়া যাওয়া। মার্কিন সরকারের উপরে সর্বোচ্চমাত্রায় প্রভাব বিস্তারে সক্ষম লবিগুলির একটি হইতেছে অস্ত্র ব্যবসার লবি। এই লবি স্বাভাবিকভাবে নিজেদের স্বার্থ দেখিতে চাহিবে। এইদিকে, দৃশ্যত, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ব্যক্তিগত অস্ত্র ব্যবহারে পাইকারিভাবে মনুষ্যহত্যার পুনরাবৃত্তি বন্ধে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এমতাবস্থাতে, নিজেদের প্রণীত সংবিধানের সুরক্ষা দ্বারা নিয়মিতভাবে হত্যাকাণ্ড হইতে মার্কিনীরা রক্ষা পাইতে সমর্থ হইবে কিনা তাহা নির্ভর করিবে জনসমাজ কর্তৃক সরকারের উপরে চাপ জারি করিয়া রাখার সক্ষমতার উপরে।
