—মিমি তুই কিন্তু ভার্সিটির বাস ছাড়া বাইরের বাসে চলাচল করবি না।
—কেন মা, বাইরের বাসে চড়লে কী হবে?
—কী হবে মানে? তুই জানিস না রাস্তাঘাটে কত অঘটন ঘটছে। প্রায়ই মেয়েরা হয়রানির শিকার হচ্ছে, বাসে ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটছে।
—মা, বাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ভারতে। তাই বলে বাংলাদেশের মেয়েরা কি বাসে চড়া বন্ধ করে দেবে?
—আমাদের দেশে কি অঘটন ঘটছে না? কবে আবার এ দেশেই সেরকম হয় কে জানে!
আমাদের বাবা-মায়েরা এখন ঠিক তাই ভাবছেন। তাদের মেয়েটি বাসে, রাস্তাঘাটে নিরাপদ তো? তাদের মেয়েটি নিরাপদে বাড়ি ফিরবে তো? না, এই দুশ্চিন্তা আকস্মিক সড়ক দুর্ঘটনার জন্য নয়। এই দুশ্চিন্তার জন্য দায়ী মানুষরূপী কিছু হায়েনা যাদের দ্বারা বাবা-মায়ের আদরের কন্যাটি লাঞ্ছনা, শ্লীলতাহানি বা যৌন হয়রানির শিকার হতে পারে। সবার মনে এখন একটাই প্রশ্ন—কেন ধর্ষণ হয়? কেন ধর্ষণ হঠাত্ করে এত বেড়ে গেলো? আসলে কিন্তু হঠাত্ করে এই ব্যাধি বাড়েনি। এইসব ঘটনা আগেও হয়েছে, হচ্ছে এবং আগামীতেও হতে পারে। গণমাধ্যমে আমরা তার সিকি পরিমাণই কেবল জানতে পারছি। ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার বা ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটবার পেছনের প্রধান কারণগুলো হলো—আইনের সঠিক প্রয়োগ না-হওয়া, অভিযুক্তরা সাজা না-পাওয়া, ভিকটিমের পরিবারের মামলা চালিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে পিছু হটা ইত্যাদি। সেটা হতে পারে সামাজিক চাপ, অর্থনৈতিক অসহায়ত্ব ও সামাজিক সম্মানহানির আশঙ্কা। পত্রিকায় দেখলাম রাজবাড়িতে ধর্ষণ চেষ্টা মামলায় জামিন পাওয়া ব্যক্তি একই শিশুকে ধর্ষণ ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে এবং সেই শিশুটির বয়স মাত্র পাঁচ বছর! প্রশ্ন হলো, এই মামলার আসামি জামিন পেলো কীভাবে যে কিনা যে কোনো নারী বা শিশুর জন্য হুমকিস্বরূপ?
অনেকেই আছেন যারা ধর্ষণের ঘটনায় ভুক্তভোগীকেই বেশি দায়ী করে থাকেন। কারণ হিসেবে বলা হয় মেয়েদের পোশাক-পরিচ্ছদ, চাল-চলনকে। এই ধারণা যে কতটা ভুল তার প্রমাণ পাওয়া যায় ঘটে-যাওয়া ধর্ষণের ঘটনাগুলো অবলোকন করলেই। সাড়ে চার বছর,দশ বছর বা পনেরো বছর বয়সের মেয়েগুলোর পোশাক নয় বরং কিছু বিকৃত, উদ্ধত চরিত্রের মানুষের মানসিকতাই ধর্ষণের কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়।
ধর্ষণের ক্ষেত্রে নতুন সংযোজন(!) ধর্ষণে অন্য নারীর সহযোগিতা। একজন নারী অন্য এক নারীকে ধর্ষণের শিকার হতে সহায়তা করছে। প্রশ্ন হলো কেন? একজন নারী কীভাবে প্ররোচিত হয় অন্য নারীকে ধর্ষণের বলি করতে? সমপ্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো থেকে দেখা যায় যে, ধর্ষণের পরিকল্পনাকারীরা টাকা দিয়ে অন্য একজন নারীকে প্ররোচিত করে। সেই নারী পূর্ব-পরিকল্পনা মতো ভিকটিমকে পরিকল্পনাকারীদের হাতে তুলে দেয়। আর এটাও ঠিক যে একজন নারী অন্য নারীর কথায় আশ্বস্ত হয়ে তার কথা শোনে। টাঙ্গাইলের স্কুলছাত্রীর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। শুধু টাকাই নয়, হতে পারে ঈর্ষান্বিত হয়ে বা সম্ভাব্য ভিকটিমের কোনো ক্ষতি করতে চাইলে বা আগে নিজেরও একই পরিণতি হয়ে থাকলে যা গোপনীয় বা সেই ঘটনা ধামাচাপা দিতেই শত্রুপক্ষের নির্দেশনায় কাজ করে নারী-সহযোগী।
পরিশেষে বলতে চাই, কোনো নারী বা শিশু কখনোই চায় না সমাজে তারা ধর্ষিতা নামে পরিচিত হবে। তবে ভয়ে গুটিয়ে থেকে বা ঘটনা চেপে রেখে সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়। ধর্ষণ নির্মূলে আইনকে হতে হবে বাস্তবিকভাবেই কঠোর; নারী, পরিবার-পরিজন ও সমাজকে সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদী হতে হবে। ঘরের মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে তাকে ঘরছাড়া, সমাজচ্যুত এমনকি দুনিয়া-ছাড়া যেন হতে না হয়। ধর্ষিতার নয় সমাজে ধর্ষকের অবস্থান হোক নিন্দিত, বর্জনীয় এবং প্রত্যাখাত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
