ফুলতলার গামছার সুনাম দেশজোড়া

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৪৫
ফুলতলা উপজেলার আলকা ও দামোদর গ্রাম দুটিতে প্রবেশ করলেই খুটখাট শব্দ কানে ভেসে আসে। একটু উঁকি দিলেই দেখা যায় প্রায় প্রতিটি বাড়ির বারান্দায় বসানো কাঠ-বাঁশে তৈরি ছোট ছোট তাঁত। তাতে তৈরি হচ্ছে নানা নকশার গামছা। বাড়ির আঙিনায় চরকায় রঙবেরঙের সুতা গুটিতে গুছিয়ে দিচ্ছেন বাড়ির বধূ ও শিশুরা। একাজে বৃদ্ধারাও সাহায্য করছেন। এ দৃশ্য প্রতিদিনকার। দুই গ্রামে প্রায় তিনশ দরিদ্র পরিবার শুধু গামছা তৈরি ও বিক্রি করে জীবনধারণ করে চলেছেন যুগের পর যুগ। আড়াইশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই কাজ চলে আসছে। সত্তর বছরের রহিম বিশ্বাস বলেন, ‘গামছা তৈরির কাজ বাপ শিহিলো দাদার কাছেরতে। দাদা তার বাপের কাছেরতে। আমি শিহিছি বাপের কাছেরতে। আমার ছাওয়াল মাইয়েগুলোও গামছা বুনতি পারে।’ এলাকার আরেক বৃদ্ধ রমজান হোসেন জানান, আলকা ও দামোদরের তৈরি গামছার মান উন্নত। সারাদেশেই এই গামছার আলাদা কদর। বিদেশেও এখানকার গামছা বিক্রি হয় বলে জানান তিনি। নগরীর সরকারি বিএল কলেজের অধ্যক্ষ ও আলকা গ্রামের বাসিন্দা শফিউল্লাহ সরদার বলেন, ‘দিন তারিখ বলা কঠিন, তবে আমার জানা মতে প্রায় আড়াইশত বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে গামছা বোনার কাজ চলছে। এই গামছার সুনাম দেশ জুড়ে। দেশের বিভিন্ন বিভাগের ব্যবসায়ীরা এখানে গামছা কিনতে আসে।’ সরেজমিন জানা গেছে, আলকা ও দামোদর গ্রামের মত উপজেলার জামিরা, বরণপাড়া, শিকিরহাট, গাড়াখোলা ও ধোপাখোলা গ্রামেও তাঁতের তৈরি গামছা তৈরি হয়। এই সাত গ্রামে এখনো ৪০০ থেকে ৫০০ কারিগর গামছা তৈরির সঙ্গে যুক্ত আছেন। দুই বছর আগেও এই সংখ্যা ছিলো প্রায় দ্বিগুণ। রবিবার ও বুধবার ফুলতলায় বসে গামছার হাট। দূর-দূরান্ত থেকে অনেক লোক ভিড় করত গামছা কেনার জন্য। সুতা ও রঙের দাম বেড়ে যাওয়ায় গামছা তৈরির খরচ বেড়ে যায়। এদিকে বিক্রি করতে হয় কম দামে। ফলে লাভ আগের মত হয় না। লোকসানের কারণে কয়েক বছর আগেই শিরোমনির কারিগররা তাঁতের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। এছাড়া অন্য গ্রামের শতাধিক কারিগর তাঁত বন্ধ করে দিনমজুরি, রিকশা-ভ্যান চালনাসহ আশপাশের বিভিন্ন পাটকলগুলোতে কাজে চলে গেছে। যারা এখনো এই পেশায় আছেন তারা এনজিওগুলোর ঋণের জালে আটকে পড়েছেন। অথচ একটু নজর দিলেই গামছা তৈরির এই শিল্প এবং এর কারিগরদের ভালভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব বলে অনেকেই দাবি করেছেন। ফিরোজ বিশ্বাস (৪২) নামের এক কারিগর বলেন, ‘শরিল ভাল থাকলি দিনে ৮/৯ ডা গামছা বানাতি পারি। যা বেইচে ২০০-২৫০ টাহা লাভ থাহে। এক বছর আগেও এই লাভ দ্বিগুণ ছেলো। সুতো ও রঙের দাম বেশি। কিন্তু বেচতি অয় কম দামে। এহন সংসার চালাতি এক বেলা ভ্যানগাড়ি চালাতি হয়।’ প্রায় ৪০ বছর ধরে এখানে গামছা কিনতে আসেন রবিশালের গামছা ব্যবসায়ী কামরুল শেখ। তিনি বলেন, ‘আমার এলাকার কিছু খরিদ্দার আছে যারা ফুলতলার গামছা ছাড়া অন্য জায়গার গামছা ব্যবহার করতে চায় না। ফুলতলার গামছা একটু বেশি দামে বিক্রয় করা যায়।’ ফুলতলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ফুলতলার তাঁতের গামছার খ্যাতি দেশ জোড়া। সুষ্ঠু পরিকল্পনাসহ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান ও স্বল্প সুদে ঋণ দেয়া গেলে সম্ভাবনাময় এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।