শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ স্কুলগুলোতে নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী গ্রন্থাগারিকদের এমপিও (বেতন-ভাতার সরকার প্রদেয় অংশ) ছাড়ের ঘোষণা দিলেও ঘুষ ছাড়া তা মিলছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শিক্ষাভবন নামে পরিচিত মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে এসে একশ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রকাশ্য ঘুষ বাণিজ্যের শিকার হচ্ছেন এমপিও প্রার্থীরা। বিশেষ করে অধিদপ্তরের মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন তারা। গত কয়েকদিন অধিদপ্তরে সরেজমিনে ঘুরে ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আলাপ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টাঙ্গাইলের একটি মাধ্যমিক স্কুলের সহকারী গ্রন্থাগারিক জানান, গত সপ্তাহে শিক্ষামন্ত্রী দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাওয়া সহকারী গ্রন্থাগারিকদের এমপিও ছাড়ের ঘোষণা দিলে অন্যদের সঙ্গে তিনিও অধিদপ্তরে আসেন। কিন্তু শিক্ষাভবনে এসেই হয়রানির শিকার হন। তাকে জানানো হয়, ৫৫ হাজার টাকা না দিলে তালিকায় নাম উঠবে না। এমপিও পাওয়ার আশায় তিনি সংশ্লিষ্ট শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে কথা বলেন। ওই কর্মকর্তা (সেকশন অফিসার পদমর্যাদার) এক পিয়নকে দেখিয়ে দিয়ে তাকে বলেন, এর হাতে ৫৫ হাজার টাকা দেন, এমপিও মিলে যাবে। অনেক অনুরোধ করেও টাকার পরিমাণ কমাতে পারেননি তিনি। ওই কর্মকর্তার কথা অনুযায়ী, অধিদপ্তরের বাথরুমে গিয়ে এক অফিস পিয়নের হাতে ৫৫ হাজার টাকা তুলে দেন এই এমপিও প্রার্থী। আরো দুই প্রার্থী অনেক অনুরোধ করে অর্থের পরিমাণ কমিয়ে ৯০ হাজার টাকা তুলে দেন ওই পিয়নের হাতে। চলতি সপ্তাহ জুড়েই শিক্ষাভবনে ছিল এই চিত্র। শুধু টাঙ্গাইল নয়, দেশের প্রতিটি জেলা থেকে আগত এমপিও প্রার্থীদের কাছ থেকে এভাবেই ঘুষ নিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট এমপিও শাখার কর্মকর্তারা। আর তাদের সহযোগিতা করছেন সংশ্লিষ্ট শাখা পিয়ন। জানা গেছে, এমপিও দেয়ার জন্য জেলা অনুযায়ী শাখা কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের হাতে টাকা দিলেই নাম উঠে যায় এমপিও খাতায়। পরে সারা হয় অন্যান্য প্রক্রিয়া।
প্রসঙ্গত, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রাক্তন মহাপরিচালক অধ্যাপক নোমান উর রশীদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ বাণিজ্য বন্ধে প্রতিটি কক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছিলেন। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ছাড়াও পরিচালকের (কলেজ ও প্রশাসন) কক্ষ থেকে এগুলো মনিটরিং করা হয়। তবে এমপিও প্রার্থীদের অভিযোগ, এমপিও শাখার ভেতরে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকায় ঘুষ বাণিজ্য হয় বাথরুমের ভেতরে কিংবা শিক্ষাভবনের বাইরে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সরকার দেশের প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণীর পদমর্যাদার ৮ হাজার টাকা স্কেলে সহকারী গ্রন্থাগারিক পদে নিয়োগের জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করে। এই পদে নিয়োগের শর্ত ছিল স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী ও গ্রন্থাগারিক বিজ্ঞানে ডিপ্লোমা। ওই প্রজ্ঞাপন জারির পর স্কুলগুলো সহকারী গ্রন্থাগারিক পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সে সময় প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকলেও স্কুল পরিচালনা কমিটিকে অবৈধ আর্থিক সুবিধা দিয়ে এই পদে নিয়োগ পান অনেকে। ফলে নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকায় ও কিছুক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তাদের এমপিও আটকে যায়। সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী এমপিও ছাড়ের ঘোষণা দিলে অনেক প্রার্থীই ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে শিক্ষা অধিদপ্তরে জমা দেয়। অবশ্য নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এমপিও প্রার্থী এই প্রতিবেদককে জানান, তাদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকার পরও কোন প্রক্রিয়ায় যাতে বাদ দেয়া না হয়, সে কারণে সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের হাতে টাকা তুলে দিয়েছেন।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য
এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি অনেকের কাছে ঘুষের বিষয়ে জানতে চেয়েছি। কিন্তু কেউ ঘুষ দেয়ার কথা স্বীকার করেননি। কেউ স্বীকার না করলে কীভাবে ব্যবস্থা নেব। কেউ যদি আমার কাছে এসে ঘুষ দাবি করেছে এমন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেব।’ তিনি বলেন, ‘মঙ্গলবার আমি শিক্ষাভবনে ৩/৪ ঘন্টা অবস্থান করেছি। শিক্ষকরা কোন অভিযোগ দিচ্ছে না। অভিযোগ দিলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
