‘বড় ভাইয়ের অস্ত্র জমা রাখাই কাল হলো’

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:২৩
স্কুল জীবনে মহল্লার বড় ভাইদের অস্ত্র জমা রাখতে বাধ্য হতাম। কারণ অস্ত্র জমা না রাখলে তারা মেরে ফেলার হুমকি দিত। আর এভাবে জমা রাখতে রাখতে অস্ত্রের প্রতি একটা মায়া ধরে যায়। শত চেষ্টা করেও আর ওই অবস্থান থেকে সরতে পারিনি। অস্ত্র রাখাই জীবনে কাল হলো। কিন্তু বিশ্বাস করুন, অস্ত্র দিয়ে কখনও খারাপ কাজ করিনি। কথাগুলো অস্ত্রসহ মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের হাতে গ্রেফতারকৃত ব্যবসায়ী কাজী আমিনুল ইসলাম শামীমের। গত ১৭ জানুয়ারি পুলিশ তিন সহযোগী জসীম উদ্দিন, সোহেল ও মকবুলসহ তাকে রাজধানীর ফকিরাপুল কাঁচাবাজার এলাকা থেকে গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ২টি বিদেশি পিস্তল, ২টি ম্যাগজিন, ২ রাউন্ড গুলি ও ১টি ধারালো ছুরি। পুলিশ তাদেরকে দুই দফায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করে। ইতিমধ্যে গ্রেফতারকৃতরা নিজেদের দোষ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। আমিনুল ইসলাম শামীমের গ্রামের বাড়ি নড়াইল জেলার লোহাগড়া থানার আজমপুর। তবে বড় হয়েছেন রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর জুরাইনে। স্কুল জীবনে পড়াশুনায় ভালই ছিলেন। কিন্তু মহল্লার বড় ভাইদের অস্ত্র জমা রাখতে গিয়ে শেষটায় দশম শ্রেণীতে ওঠার পর পড়াশুনায় ইতি টানেন। তিন ভাই তিন বোনের মধ্যে শামীম সবার ছোট। অন্য দুই ভাই চাকরিজীবী। বাবা জমি ব্যবসায়ী। শামীম জানায়, পড়াশুনা ছাড়ার কয়েক বছরের মধ্যে সে ব্যবসায় নামে। ব্যবসায় নামার পর দেখে সেখানেও অস্ত্রের গুরুত্ব ‘সর্বাগ্রে’। ঝুঁকে পড়ে অস্ত্রের দিকে। অস্ত্র কেনে সীমান্ত এলাকা থেকে। মাঝে-মধ্যে তা বিক্রি করতো ভাল দামে। তবে কখনও অস্ত্র দিয়ে সে কোন খারাপ কাজ করেনি। বন্ধুরা অনেক সময় অস্ত্র নিয়েছে। অনেক সময় টাকা দিয়েছে। আবার অনেক সময় দেয়নি। আর দীর্ঘদিন অস্ত্র বহন করলেও কখনও পুলিশের হাতে গ্রেফতার হতে হয়নি। সে প্রথম অস্ত্র কেনে ২০০৭ সালে, ২২ হাজার টাকায়। ফকিরাপুল এলাকার একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক শামীম বিবাহিত। এক সন্তানের জনক। স্ত্রী জানে তার অস্ত্র বৈধ। এ কারণে কখনও কোন উচ্চবাচ্চ্য করেনি। তবে গ্রেফতার হওয়ার পর জেনেছে সে অবৈধ অস্ত্র বহন করতো। সে আপেক্ষ করে বলে, সমাজে সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে চাইলেও আমার মতো অনেকের পক্ষে তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। আমার মতে অনেকেই বিপদগামী হয়েছে ‘মহল্লার সেইসব মাস্তান বড় ভাই’দের কারণেই। অস্ত্রবাজ মাস্তানরা টার্গেট করে মহল্লার ভাল ছেলেদের। কারণ তাদের কাছে অস্ত্র জমা রাখলে কেউ সন্দেহ করে না। আর কেউ যদি অস্ত্র জমা রাখতে আপত্তি করে তখন মাস্তানরা হুমকি দেয়, তোর বোনকে অপহরণ করবো অথবা তোর ভাইকে হত্যা করব। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি (পশ্চিম) মশিউর রহমান বলেন, গ্রেফতারকৃত শামীম সাধারণত কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ কয়েকটি সীমান্ত এলাকা থেকে ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি এবং বিদেশি অস্ত্র সংগ্রহ করতো। পরে তা বেশি দামে নগরীর বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে বিক্রি করতো। জসীম উদ্দিন দীর্ঘদিন সৌদি আরব ছিলো। ২০১১ সালের সে দেশে আসে। বিদেশ থেকে আনা টাকায় ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে সে ডাকাতিসহ অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এজন্য গত বছর শামীমের কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকায় একটি অস্ত্র কিনেছিলো। সোহেল বিবিএ-এর ছাত্র এবং মকবুল হোসেন একজন ছোটখাট ব্যবসায়ী। তারা আর্থিক সুবিধা লাভের জন্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এডিসি আরো বলেন, গ্রেফতারকৃতদের দুই দফায় রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারা নিজেদের দোষ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দি শেষে তাদেরকে কারাগারে পাঠানো হয়।