মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী ও আব্দুল কাদের মোল্লার বিচারের রায়ের আগেই ঢাকায় বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা করেছে জামায়াত-শিবির। যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করাসহ দেশে অরাজকতা সৃষ্টির জন্য জামায়াত শিবিরের লক্ষাধিক প্রশিক্ষিত ক্যাডার সারাদেশে রণ প্রস্তুতি নিয়েছে। এসব ক্যাডার নানা বেশে অবস্থান নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। এ বিষয়ে মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে এবং বিভিন্ন স্থানে গোপন বৈঠক করে দলটির নেতাকর্মীরা এ পরিকল্পনা করেছে। প্রশিক্ষিত ক্যাডারদের ওপর নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাদের আক্রমণের টার্গেট এখন ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। বিশেষ করে ঢাকার বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি, পুলিশ বক্স, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, সচিবালয়সহ অন্যান্য স্থাপনা। ঢাকা আক্রমণের আগেই সারাদেশ থেকে শিবির ক্যাডারদের ঢাকায় জড়ো করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামায়াত-শিবির। গত এক সপ্তাহে ঢাকায় গ্রেফতার হওয়া শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য জানতে পেরেছে গোয়েন্দা পুলিশ। অপরদিকে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, নাশকতার পরিকল্পনাকে আমরা উড়িয়ে না দিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। তবে জামায়াত-শিবিরের শক্তির অনেকটাই ক্ষয় হয়ে গেছে। এ অবস্থায় সামনে জামায়াত-শিবির কতটুকু শক্তির মহড়া দেখাতে পারবে এই বিশ্লেষণই এখন করা হচ্ছে। এরপরও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সবসময় প্রস্তুত রয়েছে। দেশ জুড়ে গোয়েন্দা তত্পরতা আরো বাড়ানো হয়েছে।
সূত্র জানায়, গোয়েন্দা সদস্যরা রাজধানীর বিভিন্ন থানা, ওয়ার্ড ও শাখা ইউনিটভিত্তিক জামায়াত-শিবির ক্যাডারদের চিহ্নিত করে। তাদের বাসার ঠিকানা, মোবাইল ফোন নম্বর পদবিসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর ভিত্তিতেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ধরপাকড় অভিযান অব্যাহত রেখেছে। জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা ঢাকার বাইরের জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে নাশকতার চেষ্টা করতে পারে এই আশঙ্কায় পুলিশ হেড কোয়ার্টার্স থেকে মৌখিকভাবে দেশব্যাপী ধরপাকড় করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
নাশকতার ব্যাপারে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে জামায়াত-শিবির ঢাকায় বিক্ষিপ্তভাবে বড় ধরনের হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিবর্তে তারা একের পর এক চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ৩ মাস ধরে তারা এই হামলা চালিয়ে আসছে। জামায়াত-শিবিরের এসব ক্যাডারদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে বেশ কয়েকটি নিষিদ্ধ ইসলামী জঙ্গি সংগঠনের পালিয়ে থাকা নেতাকর্মীরা। তারা পুলিশের সঙ্গে দাঙ্গা এবং বোমাবাজির বিশেষ কৌশল শিখিয়েছে। এ কারণে শিবিরের নাশকতার গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে মাঠে গিয়েও পুলিশ শিবিরের কৌশলের কাছে পরাস্থ হচ্ছে এবং পুলিশ দ্রুত তাদের প্রতিহত করতে পারছে না বলে মন্তব্য এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার।
খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গেছে, গত তিন মাসের চোরাগোপ্তা হামলাকালে সারাদেশে জামায়াত-শিবিরের সাড়ে তিন হাজার নেতা-কর্মী গ্রেফতার হয়েছে। কিন্তু এখনও তাদের তিন লাখ প্রশিক্ষিত কর্মী গ্রেফতারের বাইরে রয়েছেন। তারা গোপনে কেন্দ্রের নির্দেশে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার আগে এবং রায় ঘোষণার দিন ঢাকায় ভয়াবহ হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত-শিবির। বিশেষ করে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে যেদিন রায় ঘোষিত হবে, সেদিনই ঢাকায় নারকীয় তাণ্ডব চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। হামলার জন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্যাডাররা ঢাকার বিভিন্ন মাদ্রাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ধরনের মেসে গত এক দুই মাস থেকে বসবাস শুরু করেছে। অনেকেই জামায়াত কর্মীদের বাসায় ভাই পরিচয়ে বসবাস করেছে। এমনকি নিজেদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ক্যাডারদের কেউ কেউ ছোট এনজিও ও বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেছে।
গত সোমবার ঢাকার মতিঝিল ও সচিবালয়ের সামনে পুলিশের ওপর হামলাকালে গ্রেফতারকৃত শিবির নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদে ভয়াবহ এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। গ্রেফতারকৃতরা পুলিশে জানিয়েছেন, ঢাকায় একযোগে হামলা চালানোর জন্য কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের লাঠিসোঁটার পাশাপাশি অস্ত্র-বোমারও মজুদ গড়তে বলা হয়েছে। সামনের দিনগুলোয় শক্তির জানান দিতে বোমা হামলার পাশাপাশি জামায়াত-শিবির ক্যাডার আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারে বলে গোয়েন্দাদের আশঙ্কা। আজ জামায়াতের দেশব্যাপী প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের কথা রয়েছে। এই কর্মসূচিকালেও ঢাকায় ব্যাপক হামলার আশঙ্কা করছে পুলিশ। এটা প্রতিহত করতে গতরাত থেকে পুলিশ সদস্যরা বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে।
এদিকে গোয়েন্দা পুলিশের রিমান্ডে ইসলামী ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আবু সালেহ মো. ইয়াহইয়া গোয়েন্দা পুলিশকে বলেছেন, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে যেকোন ধরনের রায় ঠেকাতে তাদের প্রশিক্ষিত ক্যাডাররা সারাদেশে সর্বাত্মক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এটা জামায়াত-শিবিরের কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত। আর এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জিহাদি জোশে তাদের প্রশিক্ষিত কর্মীরা রণ প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি খোন্দকার নূরুন্নবী বলেছেন, জামায়াত-শিবিরের যেকোন ধরনের হামলা, নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে পুলিশের পূর্ব প্রস্তুতি রয়েছে। এজন্য গোয়েন্দা তত্পরতা বাড়ানো হয়েছে।
