জিএসপি সুবিধা :নিজ অবস্থানে অনড় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:২৬
বাংলাদেশকে দেয়া অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা বা জিএসপি প্রত্যাহারের বিষয়ে অনড় অবস্থানে আছে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ শ্রম অধিকার সংগঠন এএফএল সিআইও (আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার এন্ড কংগ্রেস অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল অর্গানাইজেশন্স) এ বিষয়ে তাদের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছে। সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি এলানজো সুসোন গতকাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, কাল বৃহস্পতিবারের মধ্যে শ্রমকিদের অধিকার রক্ষায় সরকার ও শিল্প মালিকদের পক্ষ থেকে কোন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা না হলে জিএসপি প্রত্যাহার করা হবে। এদিকে বাংলাদেশকে দেয়া জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহারে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য দপ্তরের (ইউএসটিআর) কাছে এএফএল সিআইও যে আবেদন দিয়েছে তার চূড়ান্ত শুনানি হবে কাল। সেখানে নির্ধারণ হবে বাংলাদেশের ভাগ্য। যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহারের বিষয়ে হুমকি দিলে বাংলাদেশও শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের ইতিমধ্যে এএফএল সিআইওর অভিযোগগুলোর জবাব তৈরি করেছেন। তবে আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন বহুদিন ধরে ঝুলে থাকা টিকফা চুক্তি স্বাক্ষরের পর পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের গতরাতে ইত্তেফাককে বলেন, ‘জিএসপি সুবিধার বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে অনলাইনে দেয়া হবে। বাংলাদেশ তার অবস্থানপত্রে এএফএল সিআইওর বিভিন্ন অভিযোগ খণ্ডনের পাশাপাশি বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে শ্রমমান উন্নয়নে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করবে। ইতিমধ্যে জবাবের খসড়া তৈরি শেষ করা হয়েছে।’ উল্লেখ্য, জিএসপি সুবিধার আওতায় বাংলাদেশ কিছু পণ্যে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা পায়। এসব পণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-টোব্যাকো, সিরামিকস, ফার্নিচার, প্লাষ্টিক দ্রব্য, বিভিন্ন ধরনের খেলনা। তবে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি এ সুবিধার আওতার বাইরে রয়েছে। এএফএল সিআইওর বাংলাদেশ প্রতিনিধি এলানজো সুসোন গতকাল এক অনুষ্ঠানে বলেন, জানুয়ারির মধ্যে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় সরকার এবং শিল্প মালিকদের পক্ষ থেকে কোন কর্মপরিকল্পনা না নিলে যুক্তরাষ্ট্রে জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করা হবে। তিনি বলেন, তাজরীন ফ্যাশনসে আগুনের ঘটনায় ১১২ শ্রমিকের প্রণহানির ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদদের ক্ষেপিয়ে তুলেছে। বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে অগ্নিকাণ্ড নিরোধ ব্যবস্থা কার্যকরভাবে রাখার জন্য একাধিকবার তাগিত দেয়া হলেও তা করা হয়নি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় জানুয়ারির মধ্যে শুধু কর্মপরিকল্পনা দিলেই হবে না, তার বাস্তবায়নও করতে হবে। এসব কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা মার্চের মধ্যে পর্যালোচনা করা হবে। রিপোর্টে ইউএসটিআর সন্তুষ্ট হলেই জিএসপি সুবিধা বহাল থাকবে। অন্যথায় এ সুবিধা বাতিল করা হবে। এদিকে, ইউএসটিআর এর কাছে এএফএলসিআইও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে আবেদন করেছে তার অধিকাংশই সত্য নয় বলে মনে করে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি সুবিধার বিষয়ে একটি অবস্থানপত্র তৈরি করেছেন। তাতে তিনি এএফএল সিআইওর বিভিন্ন অভিযোগ খণ্ডন করেছেন। এতে তিনি লিখেন, বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহারের বিষয়ে এএফএল সিআইও ২০০৭ সালে ইউএসটিআর এর কাছে পিটিশন দাখিল করে। সংগঠনটির অভিযোগ ছিলো বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রমিকদের অধিকারগুলো মানছে না। এসবের মধ্যে রয়েছে শ্রমিকদের সংগঠিত হবার এবং যৌথ দর কষাকষির অধিকার না দেয়া, শিশু শ্রম, ন্যূনতম বেতন কাঠামো এবং শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ। এ অভিযোগের ব্যাপারে ২০০৭ এবং ২০১২ সালে দুদফা শুনানি হয়েছে। এসব শুনানিতে ইউএসটিআর সন্তোষ প্রকাশ করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। আকরামুল কাদের তার লেখায় এএফএল সিআইওর অভিযোগগুলোকে তিনটি খাতে ভাগ করেছেন। তৈরি পোশাক খাতে সংগঠনটির অভিযোগের মধ্যে রয়েছে শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের তদন্তভার সিআইডির হাতে ন্যস্ত করা, শ্রমিক নেতা কল্পনা আক্তার ও বাবুল আক্তারের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করা, যোগ্যতা থাকার পরও ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে রেজিস্ট্রেশন না দেয়া, শিশু শ্রমিকদের দিয়ে উত্পাদিত আফগানিস্তানের তুলা আমদানি করা প্রভৃতি। এসব বিষয়ে আকরামুল কাদের বলেন, শ্রমিক নেতা আমিনুল হত্যাকাণ্ড মামলা তদন্ত করার জন্য ইতিমধ্যে গোয়েন্দা বিভাগকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আর বাবুল আক্তার এবং কল্পনা আক্তারকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন সম্পর্কে বলা হয়, কেবলমাত্র মোট শ্রমিকের ৩০ শতাংশ লিখিত আকারে আবেদন করলেই ট্রেড ইউনিয়নের অনুমোদন দেয়া হয়। এটা বাংলাদেশের শ্রম আইনেই বলা আছে। এছাড়া উজবেকিস্তানের শিশু শ্রমিকের বিষয়ে এএফএল সিআইও গণমাধ্যমের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে অভিযোগ তুলেছে। ইপিজেডগুলোর বিষয়ে এএফএল সিআইওর অভিযোগ হচ্ছে শ্রমিক ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনগুলোকে তাদের কাজের স্বাধীনতা দেয়া হয় না, এসব ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতি ইত্যাদি। এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে-কোন ইপিজেডে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। আর সুনির্দিষ্ট অভিযোগে যাদের চাকরি গেছে তাদেরকে আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।