তাকওয়া অর্জনের মাস রমজান

আপডেট : ০২ মে ২০১৯, ২২:২৫

রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের পয়গাম নিয়ে শাবান মাস বিদায়ের সাথে সাথে উদিত হবে রমজানের চাঁদ। রমজান মাসে রোজা পালন করা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক জ্ঞানসম্পন্ন সুস্থ নর-নারীর ওপর ফরয। শরয়ী কোন ওজর ছাড়া রোজা ভঙ্গ করা যাবে না, ভঙ্গ করলে গোনাহগার হতে হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা ইরশাদ ফারমান- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববতীদের ওপর তা ফরয করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়াবান হতে পারো।’ (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)। এ আয়াত থেকে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারছি, আল্লাহ বলছেন- যারা রোজা রাখবে তারা মুত্তাকী হতে পারবে, তাকওয়াবান হতে পারবে। রোজা মানুষের মাঝে তাকওয়ার গুণ সৃষ্টি করে, আর কুরআন সে তাকওয়াসম্পন্ন ব্যক্তিদেরকে সঠিক পথের দিশা দেয়। আল্লাহ রাব্বুল পবিত্র কুরআনের শুরুতে সূরা বাকারার প্রথমেই বলেছেন- ‘এই সে কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই; মুত্তাকীদের জন্য রয়েছে এতে পথের দিশা।’ তাই আল-কুরআনের হেদায়ত পেতে হলে আগে আমাদেরকে মুত্তাকী হতে হবে; আর সেই মুত্তাকী হওয়ার জন্য বিশেষভাবে আল্লাহ আমাদেরকে দান করেছেন এই মহিমান্বিত রমজান।

এবার আমরা জেনে নেব- তাকওয়া অর্থ কি এবং কেন আমাদেরকে এ গুণ অর্জন করতে হবে। ‘তাকওয়া’ শব্দের অর্থ হচ্ছে- আত্মরক্ষা করা, বেঁচে চলা, নিষ্কৃতি লাভ করা। আল্লাহর ভয় ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যাবতীয় অন্যায় অপরাধ এবং আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলার নামই হচ্ছে তাকওয়া। একবার হযরত উবাই ইবনে কা’ব রাযি. কে হযরত উমার রাযি. জিজ্ঞেস করলেন- তাকওয়া কাকে বলা হয়। হযরত উবাই ইবনে কা’ব বললেন- হে উমার! পাহাড়ের দুই ধারে কাঁটাবন, মাঝখানে সরু পথ এমতাবস্থায় আপনি কিভাবে পথ চলবেন? উমার রাযি. বললেন- গায়ে যেন কাঁটা না লাগে, সাবধানে চলতে হবে। হযরত উবাই ইবনে কা’ব বললেন- এটাই হচ্ছে তাকওয়া।

আজকের এই পাপ পঙ্কিলতাপূর্ণ পৃথিবী, যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে পাপাচার, অনাচার, শিরক, কুফর, বিদআত, যেখানে অক্টোপাসের মতো ছড়িয়ে আছে দুর্নীতির কাঁটা। সেখানে একজন মুমিন নিজেকে বাঁচিয়ে কিভাবে জীবন-যাপন করবেন সে শিক্ষা দিয়েছে মাহে রমজান। এছাড়া আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে সাদা-কালো, ধনী-গরিব, আরব-অনারব, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য এর ভিত্তিতে মর্যাদার মূল্যায়ন হবে না। বরং মূল্যায়নের ভিত্তি হবে তাকওয়া। সূরা হুজুরাতে ১৩ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে- ‘হে মানব সম্প্রদায়! অবশ্যই আমি তোমাদেরকে এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর আমি তোমাদের জন্য জাতি ও গোত্র বানিয়েছি, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো। কিন্তু আল্লাহর কাছে তোমাদের মাঝে সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হচ্ছে সে, যে আল্লাহকে বেশি ভয় করে।’

বিদায় হজের ভাষণেও নবী করীম স. এ কথাটি স্পষ্ট করে বলে গেছেন। তিনি বলেন- ‘হে লোকসকল, সাবধান! তোমাদের আল্লাহ এক। কোনো অনারবের ওপর আরবের এবং কোনো আরবের ওপর অনারবের, কোনো কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের এবং শ্বেতাঙ্গের ওপর কোনো কৃষ্ণাঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব নেই আল্লাহভীতি ছাড়া। তোমাদের মধ্যে যে বেশি তাকওয়াবান সে-ই আল্লাহর কাছে সর্বাধিক মর্যাদাবান। (বায়হাকী) মুসলিম শরীফের অপর এক হাদীসে এসেছে, নবী করীম স. বলেন- ‘আল্লাহ তাআলা তোমাদের চেহারা-আকৃতি ও সম্পদ দেখেন না, বরং তিনি দেখেন তোমাদের আমল ও অন্তরের তাকওয়া।’

এই খোদাভীতি তথা তাকওয়া অর্জনের সর্বোত্তম সময় হচ্ছে পবিত্র মাহে রমজান। নবী করীম স. বলেছেন- ‘আস-সাওমু জুন্নাহ্’- রোজা হচ্ছে ঢাল স্বরূপ। রোজাই কেবল পারে আমাদেরকে সকল কুকর্ম ও ফাহেসা কাজ থেকে বিরত রাখতে। রাসূলে কারীম স. বলেছেন- ‘অনেক রোজাদার আছে যাদের রোজা উপবাস ছাড়া আর কিছুই হয় না।’ এর কারণ হচ্ছে- যারা রোজা রেখে পাপ কাজ বর্জন করতে পারে না, তাদের রোজা তাদেরকে কোনো উপকার করতে পারে না। তাই রোজা হচ্ছে তাকওয়া অর্জনের একটি প্রশিক্ষণ।

 

লেখক: আজিমপুর দায়রা শরীফের বর্তমান

সাজ্জাদানশীন পীর ও মুতাওয়াল্লী