সাতক্ষীরায় ২৫০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ!

আপডেট : ০২ মে ২০১৯, ২২:২৬

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বিভাগ-১ ও ২ এর আওতাধীন ৮০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ। সিডর ও আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত এসব বেড়িবাঁধে ব্যাপক ভাঙন ও ফাঁটল থাকার পরও গত কয়েক বছরে তা সংস্কার না হওয়ায় চরম ঝুঁকিতে আছে এ এলাকার মানুষ। এদিকে বর্তমান সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ফণীর সংবাদে আরো অতঙ্কিত হয়ে পড়েছে এ উপকূলীয় জনপদের মানুষ।  এ ছাড়া নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করায় সিডর ও আইলা বিধ্বস্ত সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি, কালিগঞ্জ ও দেবহাটা উপজেলার ভাঙন কবলিত এলাকার লক্ষাধিক মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। কয়েকদিন আগে প্রতাপনগর ইউনিয়নের খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।  আগামী বর্ষা মৌসুমের আগেই এসব এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ সংস্কার করা না হলে জোয়ারের তীব্র স্রোতে আশাশুনি, শ্যামনগর, কালিগঞ্জ ও দেবহাটা উপজেলার কপোতাক্ষ নদ, খোলপেটুয়া, ইছামতি ও বেতনা নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ-১ ও ২ এর অধীনে ১১টি পোল্ডারে ৮০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে প্রায় ৭০টি পয়েন্টে ২৫০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ২০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। বেড়িবাঁধে ভাঙন শুরু হওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ।                                 

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভাগ- ১ ও ২ এর আওতাধীন আশাশুনি উপজেলার জেলেখালী, দয়ারঘাট, কেয়ারগাতি, চাকলা, বিছট, কাকবসিয়া, কোলা, হাজারাখালী, ঘোলা ত্রিমোহনী, হিজলিয়া, চন্ডিতলা ও বুধহাটার তেঁতুলতলা, দেবহাটা উপজেলার সুশীলগাতী, চরকোমরপুর, খারাট, টাউনশ্রীপুর ও ভাতশালা এবং শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর, গাবুরা, কাশিমাড়ি, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ ও রমজাননগর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি পয়েন্টে পাউবোর বেড়িবাঁধে মারাত্মক ভাঙন দেখা দিয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে বেড়িবাঁধ ভেঙে এই তিন উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে লক্ষাধিক লোক পানিবন্দি হয়ে পড়বে। পানিতে তলিয়ে যাবে হাজার হাজার বিঘা চিংড়ি ঘের ও ফসলের ক্ষেত।  উত্পাদন ব্যাহত হবে দেশের সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ি।

একইভাবে মারাত্মক ভাঙনের মুখে পড়েছে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার সীমান্ত নদী ইছামতি। সম্প্রতি উপজেলার সুশীলগাতী, চরকোমরপুর, টাউনশ্রীপুর ও ভাতশালা এলাকায় ইছামতি নদীর বেড়িবাঁধে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। ফলে ওই এলাকায় বসবাসরত মানুষজন চরম আতঙ্কে দিন কাঠাচ্ছে বলে জানা গেছে।

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের জানান, ঘূর্ণিঝড় ফণী নিয়ে নিয়ে বেশ আতঙ্কিত। যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ  বিভাগের অধীনে ৩৮০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে কমপক্ষে ১০টি পয়েন্টে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের পরিমাণ প্রায় ৮ কিলোমিটার এবং ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ ৩০ কিলোমিটারের মতো। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এসব বেড়িবাঁধ মেরামতের জন্য সম্প্র্রতি ২ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে।  অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ-২ এর নির্বাহী  প্রকৌশলী আরিফ উজ্জামান খান জানান, ফণী মোকাবিলায়  তার বিভাগে সকল প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ বিভাগের আওতাধীন ৪২০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ৬০টি পয়েন্টে ১২ কিলোমিটার বাঁধ অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রায় ২০০ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ না আসায় এসব বেড়িবাঁধ তেমনভাবে মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় টেকসই বাঁধ নির্মাণের লক্ষ্যে পাউবো বিভাগ-২ এর অধীনে ৭/১, ৭/২ ও ১৩-১৪/১ এবং ১৩-১৪/২ নং পোল্ডারের ভাঙনকবলিত ৩৪টি পয়েন্টে বাঁধ সংস্কারের জন্য ইতোমধ্যে চার কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দের পরিমাণ এতই নগণ্য যে, তা দিয়ে যতসামান্য কিছু করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। আরো প্রয়োজনীয় বরাদ্দ চেয়ে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধসমূহ মেরামত করা হবে বলে তিনি জানান।

কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য বেলাল হোসেন বলেন, দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের ১৪/১ পোল্ডারে গোলখালী গ্রামে কপোতাক্ষ নদের মোহনায় ওয়াপদা বেড়িবাঁধ খুবই নড়বড়ে। ইতোমধ্যে অনেক জায়গায় নদীভাঙন শুরু হয়েছে। তার উপর আসছে ঘূর্ণিঝড়। বাড়ছে কপোতাক্ষ নদের জোয়ারের পানির চাপ। কয়রা সদর ইউনিয়নের গোবরা, হরিণখোলা ও গোবরা পূর্বচক গ্রামের বাসিন্দারা রয়েছেন আতঙ্কে। অনেকটা নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন ওই এলাকার মানুষ।

ইত্তেফাকের কয়রা সংবাদদাতা হুমায়ুন কবির জানান, কয়রা উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ২১ কিলোমিটার  বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাতে বাঁধগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ দিকে, ঘূর্ণিঝড় আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত দাকোপ উপজেলায় এখনো বেশ কয়েকটি বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এরমধ্যে বানিশান্তা বাজার সংলগ্ন বেড়িবাঁধ ও কামিনীবাসিয়া বেড়িবাঁধ সংলগ্ন বেড়িবাঁধ চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। এছাড়া আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত ছুতারখালী ইউনিয়নে নলিয়ান বাজার সংলগ্ন বেড়িবাঁধটির মেরামত কাজ চলছে। তবে, ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাতে আবার বেড়িবাঁধটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।