দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীতে নির্বিচারে পোনা শিকার

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:১৭
দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীতে অবাধে শিকার করা হচ্ছে পোনা মাছ। পোনা মাছ ধরার জাল হিসাবে পরিচিত বেহেন্দি ও মশারি জাল দিয়ে ইলিশ, রিডা, আইড়, পাঙ্গাস, কাঁচকি, চাপিলা, বাটা, বায়লা, পুঁটি, বাইন ও চিংড়ির পোনা নির্বিচারে শিকার করছে জেলেরা। এগুলো ‘গুঁড়া মাছ’ হিসাবে কেজি দরে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। একটু বড় মাছগুলো সাচরা মাছ হিসাবে ভাগ দিয়ে বিক্রি হচ্ছে স্থানীয় বাজারগুলোতে। এসব সুস্বাদু মাছ বড় হওয়ার আগেই জেলেরা ধরে ফেলায় বিগত কয়েক বছর ধরে মাছের বংশবিস্তার কমে গেছে। এভাবে অবাধে পোনা নিধন হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে নদ-নদীর সুস্বাদু মাছের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন সরকারি বিএম কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মতিয়ার রহমান। তিনি প্রায় অর্ধশত প্রজাতির মাছ উপকূলের নদ-নদী থেকে হারিয়ে যাওয়ার তথ্য দিয়ে বলেন, মত্স্য আইনে আছে ৩০ সেন্টিমিটারের নিচে কোনো মাছ ধরা যাবে না। কিন্তু এ আইনটি শুধু মাত্র ইলিশের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ হচ্ছে। মত্স্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ছোট মাছ বেশি পরিমাণে শিকার হওয়ার কারণেই এ অঞ্চলের মানুষ মৌসুমী মাছ পাচ্ছে না। সরেজমিনে নগরীর তালতলী খেয়াঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, ভোরের আলো ফোটার আগেই প্রায় অর্ধশত নৌকা বোঝাই করে গুঁড়া মাছ নিয়ে হাজির হয়েছে জেলেরা। বর্তমানে জাটকাবিরোধী অভিযানের কারণে ইলিশ নেই বললেই চলে। শুধু গুঁড়া মাছের নামে নানা প্রজাতির লাখ লাখ টাকার পোনা বিক্রি হচ্ছে। এ বাজারে প্রতিদিন কয়েক মণ পোনা মাছ বিক্রি হয় বলে মত্স্য ব্যবসায়ীরা জানান। অনুসন্ধানে তালতলী খেয়াঘাট ছাড়াও বাবুগঞ্জ, উজিরপুর, মুলাদী, হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জ, চরমোনাই, চন্দ্রমোহন ও বুখাইনগর এলাকার ঘাটগুলোতে ভোরে সূর্য ওঠার আগেই পাইকারদের কাছে জেলেরা এ ধরনের মাছ বিক্রি করছে বলে জানা গেছে। সেখান থেকেই পাইকাররা স্থানীয় বাজার ও নগরীতে এনে এসব মাছ বিক্রি করছে। জেলেরা জানায়, উপকূলের নদ-নদীতে শীত মৌসুমে সাধারণত চাপিলা, কাঁচকি ও দগরি মাছ ধরার জন্য জেলেরা শিকারে নামে। কিন্তু এসব মাছের সাথে অবাধে বেহেন্দি জাল, মশারি জাল দিয়ে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে নানান প্রজাতির মাছের পোনা। এখানকার মেঘনা, তেঁতুলিয়া, আড়িয়াল খাঁ, বলেশ্বর, জয়ন্তী, নয়া-ভাংগুলী, সুগন্ধা, সন্ধ্যা, কালাবদর, কীর্তনখোলা ও বুড়া গৌরগঙ্গা নদীতে প্রতিনিয়ত জেলেরা পোনা শিকার করে যাচ্ছে। প্রবীণরা জানান, আগে নদীর মাছ ছাড়াও শীতের মৌসুমে এ অঞ্চলের পুকুর, ডোবা, খাল-বিলে শীত মৌসুমে শিং, মাগুর, কই, বাছা, পুঁটি ও ভেদা মাছ পাওয়া যেত। নদ-নদীতে কাজলী, রানী, বাইম, পাটা বাইম, মহাশোল, বাঘা আইড়, বোয়াল, রিটা, পিপলা, চিতলসহ কয়েকশ’ প্রজাতির সুস্বাদু মাছ পাওয়া যেতো। ধীরে ধীরে এসব প্রজাতির অধিকাংশ মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। শিং ও মাগুরসহ কিছু মাছ আগে পাওয়া গেলেও এখন তাও মিলছে না। ছোট ডিঙ্গি নৌকায় পোনা মাছ ধরা হয় যা অভিযানের সময় আটক হয় না। মত্স্য কর্মকর্তা ও কোস্টগার্ড জাটকা ইলিশ মাছের শিকার ঠেকাতে ব্যস্ত সময় পার করছে। জেলা মত্স্য কর্মকর্তা ওয়াহিদুজ্জামান ইত্তেফাককে জানান, নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত ইলিশ মাছ ধরা নিষেধ। এছাড়াও উপকূলের নদ-নদীতে সাড়ে ৪ সেন্টিমিটারের জাল দিয়ে মাছ শিকার করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। রেণু পোনা থেকে শুরু করে ছোট জাতের সকল মাছ শিকার বন্ধে কোস্টগার্ডের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কোস্টগার্ডের পাশাপাশি নৌবাহিনী অভিযান শুরু করবে।