ব্যবসায়ী চান মিয়া। সাভারের আশুলিয়ার কাঁঠাল তলায় রয়েছে তার দুটি রেস্টুরেন্ট। রয়েছে অন্যান্য ব্যবসাও। তিনি ছিলেন অত্যন্ত শান্তিপ্রিয় মানুষ। কারো সঙ্গে গায়ে পড়ে কখনো ঝগড়া করেছেন এমনটি কেউ বলতে পারবেন না। অথচ তাকেই সন্ত্রাসীরা অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করে। ‘স্বামীকে জীবিত অবস্থায় ফিরে পাওয়ার জন্য মুক্তিপণের টাকাও পরিশোধ করার চেষ্টা করেছি। শেষ রক্ষা হয়নি। সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, তাকে হত্যা করাই ছিল সন্ত্রাসীদের মূল টার্গেট। আর মুক্তিপণ ছিল তাদের বাড়তি পাওয়া। হত্যার ধরন দেখে মনে হয়, অপহরণের পরই তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়’— কথাগুলো নিহত ব্যবসায়ী চান মিয়ার স্ত্রী ডলি আক্তারের। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছেন, ‘স্বামীকে ফিরে পাব না। তবে ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের গ্রেফতার ও কঠোর বিচার দাবি করছি।’
গত ২২ জানুয়ারি রমনা থানা পুলিশ বড় মগবাজার আকসা হোটেলের চতুর্থ তলার ৩০৬ নম্বর রুম থেকে চান মিয়ার (৩৮) লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় নিহতের ভাগ্নী জামাই শেখ মোহাম্মদ মন্টু আশুলিয়া এলাকার সেলিম, নূরুল ও ডাক্তার মতিনসহ কয়েকজনকে আসামি করে রমনা থানায় মামলা করেন। পুলিশ সেলিম, সুমন ওরফে মগা, আকাশ, জলিল ও টিটু নামে ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে। পুলিশ তাদের রিমান্ডে নিয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রমনা থানার সাব-ইন্সপেক্টর সফিউল আজম বলেন, গ্রেফতারকৃতদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সেলিম মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। তাকে ঘটনার পর আশুলিয়া থেকে গ্রেফতার করা হয়। অপর চারজনকে গ্রেফতার করা হয় মোবাইল ফোনের কললিস্টের সূত্র ধরে।
তিনি আরো বলেন, ধারণা করা হচ্ছে অপহরণের পরপরই তাকে হোটেল কক্ষে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার দিন ১৯ জানুয়ারি আশুলিয়া থেকে চান মিয়াকে রমনা হোটেলে আনার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে ঘোরানো হয়েছিল। মোবাইল কললিস্টে এমনটাই প্রমাণ মিলেছে।
হত্যার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, চান মিয়া প্রচুর বিষয়-সম্পত্তির মালিক। এ কারণেই সন্ত্রাসীরা মোটা অংকের মুক্তিপণের দাবিতে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কললিস্ট মোতাবেক যে চার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের মধ্যে আকাশ ও জলিলের বাড়ি বরিশালে। তবে এর পেছনে অন্য কোন কারণ আছে কীনা তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। মামলার এজাহারে যে সব তথ্য দেয়া হয়েছে সেগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই চলছে। গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। খুব শিগগিরই হত্যার রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা। নিহতের স্ত্রী ডলি আক্তার বলেন, একটি হার্ডওয়্যার দোকানের পজেশন নিয়ে প্রতিবেশী সেলিমের সঙ্গে কিছুটা বিরোধ চলছিল। অপর দিকে একটি জায়গা নিয়ে বিরোধ ছিল ডাক্তার মতিনের সঙ্গে। জায়গার বিরোধ মীমাংসার জন্য গত ১৯ জানুয়ারি বেলা ১২টার দিকে আশুলিয়ার বাড়ি থেকে বের হন। কিন্তু বাড়িতে না ফেরায় বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করা হয়। পরের দিন ২০ জানুয়ারি চান মিয়ার মোবাইল ফোন দিয়ে তার কাছে ৫০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। ঐ দিনই তিনি পোস্ট অফিসের মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকা প্রদান করেন। এরপর দুই দফায় পাঠান এক লাখ। সর্বশেষ পাঠান বিকাশের মাধ্যমে আরো এক লাখ টাকা। আর এ অবস্থার মধ্যেই ২২ জানুয়ারি বিকালে বড় মগবাজার আকসা হোটেল থেকে তার হাত-পাঁ বাঁধা অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এদিকে চান মিয়ার হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবিতে গত শনিবার সকালে আশুলিয়ার বাইপাইল বাসস্ট্যান্ড এলাকার নবীনগর-কালিয়াকৈর মহাসড়কের পাশে এক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে অংশ নেন পরিবারের সদস্যরাসহ এলাকার সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ ।
