কাঙ্ক্ষিত হারে উত্পাদন বাড়ানোর বিষয়টি ঠিক রাখার পরও পণ্য ও সেবার মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় ৬ মাসের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। নতুন এ মুদ্রানীতিতে মুদ্রা সরবরাহ ও ঋণ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা আগের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে রেপো ও বিশেষ রেপো সুদহার কমানো হয়েছে। গত কয়েকটি মুদ্রানীতির প্রকৃতি সংযত হলেও এবারের মুদ্রানীতিকে ভারসম্যমূলক বলে আখ্যায়িত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মুদ্রানীতি ঘোষণা উপস্থাপন করতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেছেন, মুদ্রানীতির মূল লক্ষ্য এ অর্থবছরে মুদ্রা যোগানের প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর মাধ্যমে দেশজ উত্পাদন বাড়ানোর মাধ্যমে সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং গড় বার্ষিক ভোক্তা মূল্যস্ফীতি সাড়ে সাত শতাংশে নামিয়ে আনা। মুদ্রানীতির যোগানে আনা বর্ধিত পরিসর প্রবৃদ্ধিমুখী ও উত্পাদনমুখী উদ্যোগে ঋণ যোগানের পর্যাপ্ততা নিশ্চিতকরণে ব্যবহার করা হবে। একইসঙ্গে সম্পদ মূল্য বুদবুদ সৃষ্টিকারী ঝুঁকি প্রবণ অনুত্পাদনশীল কর্মকাণ্ডে ঋণ যোগান নিরুত্সাহিত রেখে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি নিম্নগামী রাখায় বাংলাদেশ ব্যাংক সজাগ ও সক্রিয় থাকবে। তবে মুদ্রানীতির মূল লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতিমাসে মুদ্রানীতি মূল্যায়ন করা হবে। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির আলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানুয়ারি-জুন মেয়াদের মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়। মুদ্রানীতি ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করেন গভর্নর ড. আতিউর রহমান। গভর্নরের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সিনিয়র পরামর্শক আল্লাহ মালিক কাজেমী ও ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। অনুষ্ঠানে অন্য ডেপুটি গভর্নররা ছাড়াও প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. হাসান জামানসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।
মুদ্রানীতির ঘোষণাপত্রে গভর্নর বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ যাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ সমেত সব উত্পাদনমুখী কর্মকাণ্ডে পৌঁছায় সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সূচিত ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন কার্যক্রম সক্রিয় রয়েছে। দেশের মূলধন বাজারের কার্যক্রমে স্থিতিশীলতা ও গতিশীলতা বজায় রাখার জন্যে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সক্রিয় সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়, বিশ্বমন্দার কারণে চাহিদা কমে যাওয়া পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সব মুখ্য নীতি সুদহার অর্থাত্ রেপো ও বিশেষ রেপো সুদহার দশমিক পাঁচ শতাংশ বা পঞ্চাশ বেসিস পয়েন্ট কমাবে। বর্তমানে রেপোর সুদহার সাত দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং বিশেষ রেপোর সুদহার পাঁচ দশমিক ৭৫ শতাংশ। মুদ্রানীতি প্রোগ্রামে সংশোধনী এনে বেসরকারি খাতে ঋণ যোগানের ঊর্ধ্বসীমা আগেকার ১৮ শতাংশের বদলে সাড়ে ১৮ শতাংশে বৃদ্ধি করা হয়েছে। ব্যাপক মুদ্রার যোগানে প্রবৃদ্ধি সীমা আগেকার সাড়ে ১৬ শতাংশ থেকে ১৭ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। আগের মুদ্রানীতিতে গত জুন নাগাদ অভ্যন্তরীণ ঋণ বাড়ানোর বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ কিন্তু নতুন মুদ্রানীতিতে এ লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ। সরকারি ঋণে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি আগামী জুন নাগাদ ধরা হয়েছে ২০ দশমিক ৩ শতাংশ যা আগের মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কিছুটা কমেছে। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের পূর্বাভাস মোতাবেক অর্থবছর ১৩ তে দেশজ উত্পাদনে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি বিগত দশ বছরের গড় অঙ্কের কম দাঁড়াবে না এবং অনুকূল পরিস্থিতিতে বেশির দিকে থাকবে। গত দশ বছরে গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ছয় দশমিক দুই শতাংশ। এ পরিপ্রেক্ষিতে গবেষণা বিভাগ সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে চলতি অর্থবছরে জিডিপি (মোট জাতীয় উত্পাদন) প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক এক থেকে ৬ দশমিক ৪ এর মধ্যে। কিন্তু মুদ্রানীতিতে বিবৃতিতে লক্ষ্যমাত্রা কেন সাত দশমিক দুই ধরা হলো এমন প্রশ্নের উত্তরে গভর্নর বলেন, সরকার বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকও সেটাই ধরেছে। সরকারের সহযোগী হিসাবে পরিবেশ অনূকুল হলে ওই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চেষ্টা করব।
গভর্নর বলেন, মুদ্রানীতির কার্যকর প্রয়োগ সুষ্ঠুতর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক তার মুদ্রানীতির ট্রান্সমিশন চ্যানেল বা প্রয়োগ পথগুলো সুগম করার প্রচেষ্টা জোরদার করেছে। সরকারি সিকিউরিটিজের সেকেন্ডারি বাজার কার্যক্রম জোরদার করা এজন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই লক্ষ্যে নেয়া বিবিধমুখী পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে সরকারি বন্ড ও বিলের নিলামে উচ্চতর বাজার চাহিদা সম্পন্ন বিল ও স্বল্পতর মেয়াদি বন্ডগুলোর অংশ বৃদ্ধি, বিল ও বন্ডের অনলাইন সেকেন্ডারি ট্রেডিং-এর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে নতুন ইলেক্ট্রনিক ট্রেডিং উইন্ডো চালু করা এবং বিল ও বন্ড নিলামে প্রাইমারি ডিলারদের পাশাপাশি অন্য ব্যাংকগুলোর জন্যও বর্ধিত ভূমিকার নির্দেশনা। সরকারি বিল ও বন্ডের বাজার চাহিদা প্রসারে বীমা আইন সংস্কারের বিষয়ে এবং সর্বস্তরের জনসাধারণের জন্য ফান্ডেড পেনশন স্কীম প্রণয়নের প্রারম্ভিক কার্যক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনায় সক্রিয় রয়েছে।
মুদ্রানীতির সুষ্ঠু বাস্তবায়নে আর্থিক খাত প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ এবং সেজন্য আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে তার মনোযোগ বিশেষভাবে জোরদার করেছে। গৃহীত বিবিধমুখী ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনিং সংক্রান্ত নির্দেশনা কঠোরতর করে বিশ্বমানের সঙ্গে তা ঘনিষ্টতর সঙ্গতিতে আনা, অনসাইট ও অফসাইট সুপারভিশন ব্যবস্থা জোরদারকরণ ও পুনর্বিন্যাস করে আরো সমন্বিত করা, ঋণপত্র স্থাপনা এবং অভ্যন্তরীণ বিল ক্রয়ের মতো বহু বিষয়ে তাত্ক্ষণিক অনলাইন সুপারভাইজরি রিপোর্টিংয়ের আবশ্যকতা আরোপসহ জালিয়াতি ও প্রতারণামূলক কার্যক্রম প্রতিরোধে প্রধান নির্বাহী ও পর্ষদের অডিট কমিটি চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক স্বমূল্যায়ন ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে দাখিলের আবশ্যকতা আরোপ করছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এছাড়া আমানত ও ঋণের সুদহার কমানোর বিষয়েও বাংলাদেশ ব্যাংক নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে।
