বাঙালির মেধা ও মননের প্রতীক ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র শুরু আজ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ শুক্রবার বিকালে বাংলা একাডেমীর রবীন্দ্র চত্বরে বইমেলার উদ্বোধন করবেন। ভাষা-সংগ্রামের প্রেরণায় উজ্জীবিত এ মেলা মাসব্যাপী চলবে। পাঠক-লেখকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠবে মেলা প্রাঙ্গণ। অকাল প্রয়াত জননন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতির উদ্দেশে এবারের মেলা উত্সর্গ করা হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ। স্বাগত ভাষণ প্রদান করবেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখবেন প্রকাশক প্রতিনিধি ইউপিএলের পরিচালক মহিউদ্দিন আহমেদ। সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমীর সভাপতি প্রফেসর এমেরিটাস ড. আনিসুজ্জামান। অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলা একাডেমীর নতুন ভবনে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে এক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান গ্রন্থমেলা উদযাপনের বিভিন্ন দিক নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৩ উদযাপন কমিটির সদস্য-সচিব শাহিদা খাতুন, চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, ব্র্যাক ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মামদুদুর রশিদ ও স্টেপ মিডিয়া লিমিটেডের পরিচালক মোস্তফা জাহিদ খান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন একাডেমীর সমন্বয় ও জনসংযোগ উপ-বিভাগের উপ-পরিচালক মুর্শিদ আনোয়ার। সাংবাদিক সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমীর সচিব মো. আলতাফ হোসেন এবং হেড অফ কমিউনিকেশন এন্ড সার্ভিস কোয়ালিটি জিসান কিংশুক হক।
শামসুজ্জামান খান বলেন, বাংলা একাডেমী এক নতুন যুগে প্রবেশ করলো। নতুন ভবনে পদাপর্ণ করলো। বাংলা একাডেমী গবেষণা কার্যক্রমকে অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে বিস্তৃত করেছে। সেই সঙ্গে ভাষা-সংগ্রামের চেতনায় লালিত অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে শুধুমাত্র প্রকাশকদের মেলায় রূপান্তরের কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে তা সবার সহযোগিতায় বাস্তবায়ন করেছে। সব অর্থেই এক নতুন অধ্যায় রচিত হলো। যা আগামীতে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
মেলার নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি জানান, এবার যেহেতু রাস্তায় কোন স্টল থাকছে না সে জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সামনের ফাঁকা অংশ টিন দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়েছে। যে কোনবারের চেয়ে এবারের মেলার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার জন্য মেলা প্রাঙ্গণে থাকবে ৬৪টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। মেলায় প্রবেশের জন্য পুষ্টি ভবনের সামনে এবং আণবিক শক্তি কমিশনের সামনে প্রবেশপথ থাকবে। প্রতিটি প্রবেশপথে দুটি করে আর্চওয়ে দিয়ে মেলায় প্রবেশের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মেলার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাব, আনসার, গোয়েন্দা সংস্থাসহ একাডেমীর নিরাপত্তাকর্মীবৃন্দ। গ্রন্থমেলা থাকবে সম্পূর্ণ পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত। বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক আরো জানান, গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠিত হবে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে এবং এবারের মেলায় কেবল প্রকাশকগণ অংশগ্রহণ করবেন। গ্রন্থমেলায় ২৭৪টি প্রতিষ্ঠানকে ৪৬০টি ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৪৬টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ৪১৮টি ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া ২৮টি সরকারি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে ৪২টি ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এবার ৪৫টি লিটল ম্যাগাজিনকে লিটল ম্যাগ কর্ণারে স্থান পেয়েছে। ক্ষুদ্র প্রকাশনা সংস্থা এবং ব্যক্তি উদ্যোগে যারা বই প্রকাশ করেছেন তাদের বই বিক্রির জন্য জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের স্টলে রাখা যাবে। গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমী প্রকাশিত বই ৩০ শতাংশ কমিশনে এবং মেলায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ কমিশনে বিক্রি করবে। এছাড়া শিশুদের নিরবচ্ছিন্ন বই কেনার সুযোগ করে দিতে শিশুপ্রহরের তারিখও মেলা চলাকালীন ঘোষণা করা হবে।
এ বছরও অমর একুশে গ্রন্থমেলা প্রাঙ্গণকে ভাষা শহীদ সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত ও শফিউরের নামে ভাগ করা হয়েছে। এছাড়া নজরুল মঞ্চের সামনে শিশুকর্ণারে থাকবে শিশু-কিশোর বিষয়ক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। প্রতিবারের মতো এবারেও নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা নজরুল মঞ্চে থাকবে। গ্রন্থমেলার প্রচার কার্যক্রমের জন্য তথ্যকেন্দ্র থাকবে বর্ধমান ভবনের পশ্চিম বেদিতে। সাংবাদিকদের মিডিয়া সেন্টার থাকবে তথ্যকেন্দ্রের উত্তর পার্শ্বে। তাত্ক্ষণিকভাবে মেলা সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহের জন্য ফ্যাক্সসহ ই-মেইল সুবিধা থাকবে মিডিয়া সেন্টারে। ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রন্থমেলা প্রাঙ্গণকে ওয়াই-ফাই জোনে রূপান্তরিত করা হবে। এর ফলে মেলায় নিয়ে আসা ল্যাপটপ, ট্যাব, মোবাইলে ব্যবহারকারীরা ফ্রি ব্রাউজিংয়ের সুবিধা পাবেন। বর্তমান সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ পরিকল্পনার অংশ হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই কর্তৃপক্ষ গ্রন্থমেলায় তাদের নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি এবার নজরুল মঞ্চে গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন, তথ্যকেন্দ্রের সর্বশেষ খবর এবং মেলার মূল মঞ্চের সেমিনার প্রচারের ব্যবস্থা করবে। মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার। এছাড়া মেলা প্রাঙ্গণ থেকে চ্যানেল আই, মাছরাঙা টেলিভিশন, বাংলা ভিশন, গাজী টিভি, সময় টেলিভিশন, চ্যানেল একাত্তর, এস এ টিভি মেলার তথ্যাদি প্রতিদিন সরাসরি সম্প্রচার করবে। গ্রন্থমেলার সংবাদ নিয়ে ‘বইমেলা প্রতিদিন’ নামে প্রতিদিন বুলেটিন প্রকাশিত হবে।
২ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল চারটায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে সেমিনার। বিশিষ্ট বাঙালিদের জন্মশত ও সার্ধশতবর্ষ এবং বাংলার বিস্মৃত প্রায় ও সমকালীন মনীষার জীবন ও কর্ম নিয়েও আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া মাসব্যাপী প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৩ উপলক্ষে বাংলা একাডেমী শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, সংগীত, সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে।
অমর একুশে গ্রন্থমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ২০১২ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগতমান বিচারে সেরা গ্রন্থের জন্য প্রকাশককে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’ এবং গ্রন্থমেলায় সর্বাধিক সংখ্যক মানসম্মত বই প্রকাশের জন্য শ্রেষ্ঠ তিনটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান করা হবে। এবারের গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমী প্রকাশিত ৪২টি নতুন বই পাওয়া যাবে। ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড ও চ্যানেল আইয়ের আর্থিক সহযোগিতায় ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি স্টেপ মিডিয়া ও এক্সপ্রেশন্স ব্যবস্থাপনা সহযোগী হিসাবে অমর একুশে গ্রন্থমেলার অবকাঠামো নির্মাণ ও সাজসজ্জার যাবতীয় কাজে বাংলা একাডেমীকে সহায়তা প্রদান করছে।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী
অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৩ উপলক্ষে দেয়া বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান বলেন, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার শেকড় ভাষা আন্দোলনের মধ্যে প্রোথিত।
অমর একুশে গ্রন্থমেলা সম্পর্কে তিনি বলেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চার মূলনীতি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের বিশেষ এক প্রতিফলন বাঙালির প্রাণের উচ্ছ্বাস অমর একুশের গ্রন্থমেলা। এই মেলায় বাংলাদেশের নানা ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণির মানুষের আগমন ঘটে। প্রাণের টানে দেশের সর্বস্তরের মানুষ উত্সবের আমেজে মিলিত হয়। পাঠক, প্রকাশক ও লেখকের ত্রিমুখী সম্মিলনে বাঙালিসহ দেশের অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বুদ্ধিভিত্তিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের পথও সুগম হয়।
তিনি আরো বলেন, অমর একুশে গ্রন্থমেলা এখন কেবল বাঙালির নয়; বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষাভাষী গ্রন্থপ্রেমী মানুষের এক সার্বজনীন উত্সব।
মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৩’র আজ উদ্বোধন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী গতকাল বৃহস্পতিবার এক বাণী দিয়েছেন। দৃঢ় আস্থা প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশের তরুণ প্রজন্মের মাঝে গ্রন্থমেলাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্সাহ-উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হওয়ায় তা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে অবদান রাখছে। তিনি আরো বলেন, মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন উত্সর্গ করা বিশ্ব ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। ভাষা আন্দোলনের সেই অনন্য ঘটনার পথ ধরে আমরা চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, বাষট্টির ছাত্র আন্দোলন, ছেষট্টির ছয়-দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের ঐতিহাসিক নির্বাচন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করেছি কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। অমর একুশে গ্রন্থমেলা সম্পর্কে তিনি বলেন, শুধুমাত্র গ্রন্থকে উপলক্ষ্য করে মাসব্যাপী এমন মেলার দৃষ্টান্ত বিশ্বে বিরল। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলা একাডেমী গ্রন্থমেলা পেয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম বইমেলার স্বীকৃতি। এটি আমাদের জন্য পরম আনন্দ ও গৌরবের।
অমর একুশে গ্রন্থমেলার সময়সূচি
আগামীকাল থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছুটির দিন ব্যতীত প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত অমর একুশে গ্রন্থমেলা চলবে। ছুটির দিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা এবং ২১শে ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
