ভারতের মাটিতে যৌথভাবে বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের রামপালে যেমন যৌথভাবে বিদ্যুত্ কেন্দ্র হচ্ছে, তেমনিভাবে ভারতের ত্রিপুরা, মনিপুর, আসাম কিংবা অন্য কোথাও জলবিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করার কথা বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ-ভারত বিদ্যুত্ সহায়তা স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে এই প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। অপরদিকে আগামী জুলাই মাসে ভারত থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুত্ আমদানি করা শুরু করতে পারবে। গতকাল ভারত ও বাংলাদেশের বিদ্যুত্ সচিবদের যৌথ এক সাংবাদিক সম্মেলনে একথা বলা হয়েছে। বিদ্যুত্ আমদানি করতে যে অবকাঠামো দরকার তা প্রায় শেষ পর্যায়ে। বাংলাদেশ ও ভারতের উভয় পাশে দ্রুততার সাথে এই কাজ হচ্ছে।
ভারতে বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করতে পারে কিনা যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে ভারত-বাংলাদেশ যৌথভাবে তা পরীক্ষা করার জন্য দুই দেশের বিশেষজ্ঞ দিয়ে একটি যৌথ কারিগরি কমিটি (জেসিসি) গঠন করেছে। এই কমিটি ইতিমধ্যেই পর্যালোচনা শুরু করেছে। কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। ভারতের উত্তর- দক্ষিণ অঞ্চলে জলবিদ্যুত্ করা হলে তা বাংলাদেশে আনতে নতুন করে কারিগরি সমস্যায় পড়তে হবে। কারণ বাংলাদেশ ও ভারতে ভিন্ন পদ্ধতিতে বিদ্যুত্ উত্পাদন করা হয়। দুই পদ্ধতি এক করতে ভেড়ামারার মতো সাবস্টেশন স্থাপন করতে হবে, যা অনেক খরচের বিষয়। এজন্য বিকল্প উপায়ে একটি আলোচনা করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের একটি অংশে ভারতের উপযোগী করে ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন লাইন করে আলাদা এলাকা করা অথবা যৌথভাবে ভারতে যে বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে তা প্রথম থেকেই বাংলাদেশের উপযোগী করে করা। কারিগরি কমিটি এগুলো চূড়ান্ত করবে।
বিদ্যুত্ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশের বিদ্যুত্ সচিব মনোয়ার ইসলাম ও ভারতের বিদ্যুত্ সবিচ পি উমা শংকর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যুত্ সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। এ সময় অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। উমা শংকর বলেন, ভারত থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুত্ আনতে খুব দ্রুত কাজ হচ্ছে। ভারতের অংশে ট্রান্সমিশন লাইন, টাওয়ার বসানো, সাবস্টেশন স্থাপন করাসহ সব কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। জুলাই মাসের মধ্যে এর কাজ শেষ হয়ে যাবে। রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করলে পরিবেশের কোন ক্ষতি হবে না বলে তিনি উল্লেখ করে বলেন, আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে এই বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এতে পরিবেশের কোন ক্ষতি হবে না। আশা করি ২০১৭ সালে রামপাল কেন্দ্র থেকে বিদ্যুত্ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের বিদ্যুত্ সচিব মনোয়ার ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের অংশে কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ভারত বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করতে বাংলাদেশের ট্রানজিটের ক্ষেত্রে যে কর সুবিধা চেয়েছে তা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে বিবেচনাধীন আছে বলে সচিব জানান।
সাংবাদিক সম্মেলনে জানানো হয়, চলতি অর্থবছরের মধ্যে ভারত থেকে বিদ্যুত্ আমদানির ক্ষেত্রে সঞ্চালন লাইন ও সাবস্টেশন স্থাপনের কাজ শেষ হবে। এ পর্যন্ত প্রকল্পের ৮৪ দশমিক ২৮ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৭৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দেবে ২৭৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা। ৭০০ কোটি টাকা দেবে এডিবি এবং পিজিসিবি দেবে ১০১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। বাংলাদেশ অংশে ২৭ কিলোমিটার ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন এবং ভেড়ামারায় ৪০০ কেভি হাই ভোল্টেজ সাবস্টেশন করা হবে। এ পর্যন্ত সঞ্চালন লাইনের ৮৪ দশমিক ২৮ ভাগ এবং সাবস্টেশনের ৫৬ দশমিক ৯৫ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে।
ইত্তেফাকের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি মোস্তাফিজুর রহমান মঞ্জু জানান, বিদ্যুত্ খাতে সহযোগিতার লক্ষ্যে বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল বুধবার দুপুরে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় অবস্থিত বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির ‘৫০০ মেগাওয়াট (এইচভিডিসি) ব্যাক টু ব্যাক স্টেশন’ ও সঞ্চালন লাইন নির্মাণ প্রকল্প পরিদর্শন করেন। প্রতিনিধিদলের কর্মকর্তারা জানান, আগামী জুলাই মাসে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ভারত থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুত্ বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
দেশে অব্যাহত বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় সরকার ভারত থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ আমদানির উদ্যোগ নেয়। ভারতের বহরমপুর সাবস্টেশন থেকে ৪০০ কেভি (ডিসি) সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে সরাসরি বিদ্যুত্ আসবে বাংলাদেশের ভেড়ামারাস্থ ৫০০ মেগাওয়াট (এইচভিডিসি) ব্যাক টু ব্যাক স্টেশনে। এখানে ওই বিদ্যুত্ স্টেপ ডাউনের মাধ্যমে ২৩০ কেভিতে (এসি) রূপান্তর করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা ও উত্তরাঞ্চলের ঈশ্বরদী সাবস্টেশনের মাধ্যমে তা সরবরাহ করা হবে জাতীয় গ্রিডে। এজন্য ভেড়ামারায় স্টেশন নির্মাণসহ দৌলতপুর সীমান্ত পর্যন্ত ২৭ কিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে ৮৭টি টাওয়ার স্থাপন সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন শুধু বাকি রয়েছে বিদ্যুত্ সঞ্চালন লাইন টানার কাজ। অপরদিকে ভারতের বহরমপুর সাবস্টেশন থেকে সে দেশের সীমান্ত পর্যন্ত ভারতীয় অংশে ৭০ কিলোমিটারে ১৯৭টি টাওয়ার স্থাপন ও সঞ্চালন লাইনে কেবল টানার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্প পরিদর্শনকালে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গহওর রিজভীর নেতৃত্বে জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী, বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এনামুল হক, বিদ্যুত্ সচিব মনোয়ার ইসলামসহ ১১ সদস্যের টিম এবং ভারতের বিদ্যুত্ সচিব পি উমা শংকরের নেতৃত্বে ভারতের প্রতিনিধিদলে ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণসহ পাঁচজন ছিলেন।
