শিক্ষা

আলোকিত সমাজ গঠনে শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৪৮
আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানীরা শিক্ষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘শিক্ষা হলো আচরণের ইতিবাচক স্থায়ী পরিবর্তন’। বার্ট্রান্ড রাসেল বলেন,‘ শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীর উত্তম চরিত্র গঠন’। মহামতি সক্রেটিস বলেছেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য হল সত্যের লালন ও মিথ্যার অপনোদন। এককথায় পরিপূর্ণ শিক্ষা শুধু জ্ঞানের স্তরেই সীমাবদ্ধ নয়, জ্ঞানার্জনের পর তা কার্যকরীভাবে ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগই হলো শিক্ষা। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীকে পাঠবুঝিয়ে দিলেই শিক্ষকের দায়িত্ব শেষ নয়, পাঠ্যবিষয়ের বাইরে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধের আলোকে শিক্ষার্থীর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা শিক্ষকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এ অর্থে বিদ্যালয়কে ‘সমাজের ক্ষুদ্র সংস্করণ বলা হয়’। অনেক সময় পরিবারের দীর্ঘদিনের লালিত সংস্কারেও আঘাতহানে শিক্ষকের উপদেশ। হ্যামিলনের বাঁশির মতো সব কিছু ভুলিয়ে দিয়ে ভাবতে শেখায় নতুন কিছু যা কিছু বাঞ্ছিত, মার্জিত ও ইতিবাচক। একজন শিক্ষক শুধুই শিক্ষক নন তিনি একজন প্রশিক্ষকও বটে। শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের কোন বিষয় বুঝিয়ে দেন বা শিখিয়ে দেন তখন তিনি শিক্ষক; যখন সৃজনশীলতা,সততা,দক্ষতা, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা,শিষ্টাচার,দেশপ্রেম, নেতৃত্ব ,কষ্টসহিষ্ণুতা,গণতন্ত্রীমনষ্কতা ও পরমতসহিষ্ণুতা ইত্যাদি সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের বিষয়গুলো নজরদারিতে রাখেন ও নিয়ন্ত্রণ করেন তখন ঐ শিক্ষকই একজন প্রশিক্ষক। এ জন্য বোধ হয় আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট তার পুত্রের প্রধান শিক্ষকের কাছে লিখেছিলেন— ‘..তাকে শেখাবেন পাঁচটি ডলার কুড়িয়ে পাওয়ার চেয়ে একটি উপার্জিত ডলার অধিক মূল্যবান।.......আমার পুত্রের প্রতি সদয় আচরণ করবেন কিন্তু সোহাগ করবেন না, কেননা আগুনে পুড়ে ইস্পাত খাঁটি হয়। আমার সন্তানের যেন অধৈর্য হওয়ার সাহস না থাকে’। তাহলে আমরা বলতে পারি পাঠ্যপুস্তকের বাইরে শিক্ষকের নিকট থেকেও শিক্ষার্থীর অনেক কিছু শেখার আছে। কিন্তু আজকাল শিক্ষকগণ প্রশিক্ষক হতে চান না। এমনকি অভিভাবকও শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকের নজরদারিকে প্রতিষ্ঠানের বাড়াবাড়ি বলে মনে করেন। একারণেই আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে শ্রমবিমুখতা,স্বার্থপরতা, দুর্নীতি, অনিয়ম। বলা যায় অনিয়মই নিত্য দিনের নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার ঘোষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১১টি শাস্তি বিষয়ক নীতিমালা ও একে কেন্দ্র করে শিক্ষকদের যেভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে তাতে শিক্ষক সমাজে আজ ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। আমরা অভিভাবকগণ আমাদের সন্তানকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাচ্ছি পাঠ্যবিষয় আত্মস্থ করতে, অন্যদিকে শিক্ষকগণও শিক্ষার্থীকে পাঠ বুঝিয়ে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন। ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক আমরা সবাই ভাল জিপিএ সমৃদ্ধ সনদ অর্জন করার চেষ্টায় ঘর্মাক্ত হচ্ছি কিন্তু মনুষত্ব সম্পন্ন একজন সুনাগরিক হওয়ার স্বপ্ন কেউ দেখছি না। সময়ের পরিক্রমায় আমরা শুধু নই আমাদের সমাজ,রাষ্ট্র ভুলতে বসেছে পাঠ্যবিষয়ের বাইরে শিক্ষকের নিকট থেকে অনেক কিছু অর্জন করার আছে। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছেন—‘ ইস্কুল বলিতে আমরা যাহা বুঝি সে একটা দিবার কল। মাস্টার এই কারখানার একটা অংশ। সাড়ে দশটার সময় ঘণ্টা বাজাইয়া কারখানা খোলে। কল চলিতে আরম্ভ হয়, মাস্টারের মুখ চলিতে থাকে। চারটের সময় কারখানা বন্ধ হয়, মাস্টার-কলও তখন মুখ বন্ধ করেন;.........তবু মানুষের কাছ হইতে মানুষ যাহা পায় কলের কাছ হইতে তাহা পাইতে পারে না। কল সম্মুখে উপস্থিত করে, কিন্তু দান করে না; তাহা তেল দিতে পারে, কিন্তু আলো জ্বালাইবার সাধ্য তাহার নাই’। দুঃখজনক হলেও সত্য, যে আজও আমরা ছাত্র- শিক্ষক-অভিভাবক এমনকি রাষ্ট্র এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারিনি। দক্ষ মানবসম্পদ ও সুনাগরিকতা সম্পন্ন সোনার বাংলা তৈরির জন্য এ সত্যটি উপলব্ধি করা উচিত। লেখক : অধ্যক্ষ, ন্যাশনাল কলেজ, ঢাকা [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন